শিরোনাম
প্রকাশ : ৬ মে, ২০২১ ১৩:৪৪
প্রিন্ট করুন printer

কভিডের সংক্রমণ, আউটডোর বনাম ইনডোর: বিজ্ঞান কী বলে?

ড. মুহাম্মদ মোর্শেদ

কভিডের সংক্রমণ, আউটডোর বনাম ইনডোর: বিজ্ঞান কী বলে?
Google News

ঢাকার পত্রিকায় “ঈদগাহে নয়, ঈদুল ফিতরের নামাজ হবে মসজিদে” শিরোনামটি দেখে  প্রাথমিকভাবে আমি ভেবেছিলাম কোথাও বোধহয় ভুল হয়েছে। ভেবেছিলাম হয়তো হবে “মসজিদে নয়, ঈদুল ফিতরের নামাজ হবে ঈদগাহে”। পুরো সংবাদটি পড়ে ভীষণ খটকা লাগলো। কভিড কী করতে পারে বা করতে পারে না সে সম্পর্কে আমার নতুন করে বলার আর দরকার নেই।এই মুহূর্তে আমরা বাংলাদেশ, ভারত এবং বিশ্বজুড়ে অনেক হৃদয়বিদারক কাহিনী প্রত্যক্ষ করছি। 

আমি সব সময়েই বলেছি, বিজ্ঞানের বিষয়ে বিজ্ঞানের ওপর ভিত্তি করেই আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়া বা দেয়া দরকার, আবেগ বা অন্য কোনো বিষয়ের ভিত্তিতে নয়। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বিজ্ঞানকে প্রতিটি সাধারণ মানুষের কাছে সহজভাবে ব্যাখ্যা করা গেলে তারা তা বুঝতে পারবে। আমি জানি, বাংলাদেশে গবেষণার অনেক  প্রতিবন্ধকতা রয়েছে এবং এই ভাইরাস কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে বা সংক্রামিত হয় সে সমন্ধে তেমন বেশি গবেষণা হয়নি। তবে, বিশ্বব্যাপী  প্রতি সপ্তাহে শত শত প্রকাশনা প্রকাশিত হচ্ছে এবং আমরা সেখান থেকে সহজেই জ্ঞান অর্জন করতে পারি। SARS coV-2 সংক্রমণ সম্পর্কিত গবেষণা ভাইরাসটি সনাক্ত করার  দিন থেকেই শুরু হয়েছে । আমি "SARS CoV-2 and Transmission” কী-ওয়ার্ড সহ একটি সাধারণ গুগল অনুসন্ধান করি এবং তাতে লাখ লাখ নিবন্ধের ঠিকানা চলে আসে। তারপরে আমি একটি বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান ইঞ্জিন PubMedএ অনুসন্ধান করেছি এবং সেখানেও ১৪,৮৫০টি বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ পেয়েছি । সুতরাং বর্তমান যুগে, বৈজ্ঞানিক প্রমাণগুলি খুঁজে পাওয়া এবং অর্থবোধক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য বা কার্যকর নীতি গ্রহণের জন্য একটি বৈধ বিজ্ঞান সম্মত ফলাফল খুঁজে বের করা খুব কঠিন বিষয় নয়। 

আসুন SARS CoV-2 কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে সে সম্পর্কে আমরা একটু জানতে চেষ্টা করি। এটি সর্বজনস্বীকৃত যে , SARS CoV -২ সংক্রামিত ব্যক্তির নিঃশ্বাস থেকে বের হওয়া অ্যারোসোল (ছোট ফোঁটা) এর মাধ্যমে অন্যের কাছে ছড়িয়ে পড়ে অথবা যখন কোনও সংক্রামিত ব্যক্তি কথা বলে বা গান করে, চেঁচামেচি করে বা কাশি বা হাঁচি করে তখন তার মাধমেও ছড়াতে পারে। SARS CoV-2 ভাইরাস রয়েছে এমন কোনও কিছু ছুঁয়ে, তারপরে হাত না ধুয়ে মুখ, নাক বা চোখ স্পর্শ করলে সেখান থেকেও সংক্রামিত হতে পারে। আবার সংক্রামিত ব্যক্তির লক্ষণ পরিলক্ষিত হওয়ার আগে বা কখনও লক্ষণ বিকাশ না করা ব্যক্তিদের (asymptomatic people) দ্বারাও  COVID-19 সংক্রামিত হতে পারে। আমি SARS CoV-2 স্প্রেড বা সংক্রমণ সম্পর্কে পড়াশোনা করতে গিয়ে দেখলাম, বেশিরভাগ বৈজ্ঞানিক নিবন্ধের তত্ত্ব অনুযায়ী আউটডোরের চেয়ে বদ্ধ জায়গায় (inddor) ঝুঁকি অনেক বেশি।

মসজিদের অভ্যন্তরে মাস্ক পরে এবং দূরত্ব বজায় রেখে ঈদ নামাজ পড়ার পরামর্শ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এখন পর্যন্ত আমরা যা পর্যবেক্ষণ করছি তা হলো বাংলাদেশে মাস্ক পরার বিষয়টি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না  এবং শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা অসম্ভব। এমনকি অতীতে বিশেষ বিশেষ দিনে মসজিদে প্রবেশের জন্য প্রতিযোগিতার  লড়াই করতেও দেখা গেছে। এব্যাপারে  যদি কেউ প্রমাণ করে আমি ভুল তাহলে আমি খুশিই হবো। 

যে কোনও ধরনের গণজমায়েতেই কভিড সংক্রমণের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, সেটি এটি অন্দর (inddor) বা খোলা জায়গা (outdoor) কিনা তা বিবেচ্য নয়। এখন আসুন আমরা দেখি আমাদের সেরা বিকল্পটি কী হবে এবং বিজ্ঞান কী বলে। সাম্প্রতিক গবেষণাগুলির মধ্যে একটিতে আমি জোর দিতে চাই যা "The Journal of Infectious Diseases" নামে একটি খুব নামি জার্নালে প্রকাশিত হয়। গবেষণার শিরোনাম ছিল "Outdoor Transmission of SARS-CoV-2 and Other Respiratory Viruses: A Systematic Review" এখানে তারা একাধিক স্টাডি বিশ্লেষণ করে একটি সিদ্ধান্তে এসেছে। এই গবেষণার লেখকরা  প্রায় ১০ হাজার ৯১২টি দলিল পর্যালোচনা করে এবং তার মধ্যে ১২টি বিজ্ঞানিক প্রবন্ধ নির্বাচন করেছেন যা আউটডোর বনাম ইনডোর থেকে ছড়িয়ে পড়ার বা সংক্রমণের ঝুঁকি বিশ্লেষণ করতে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ছিল। ১২টি নিবন্ধের মধ্যে তার মধ্যে ৫টি SARS  CoV-2; ৫টি ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো এবং ২টি অ্যাডেনোভাইরাস নিয়ে বিশ্লেষণ করেছে। SARS CoV -২ এর উপর পাঁচটি গবেষণায় দেখা গেছে যে ১০% এরও কম সংক্রমণ আউটডোরে হয়েছে এবং আউটডোর এর তুলনায় ইনডোর ট্রান্সমিশনের  মাত্রা খুব বেশি ছিল। লেখকগণ  হিসাব করে দেখেছেন আউটডোরে চেয়ে  ইনডোরে ১৮.৭ গুণ বেশি সংক্রমণ হয়েছে।  

আমরা লকডাউনের মতো কঠোর সিদ্ধান্তের ফলাফলও দেখেছি। সঠিকভাবে লকডাউন করা  গেলে এবং মানুষ সেগুলো মেনে চললে ভালো ফল পাওয়া যায়। কিন্তু সিস্টেমটি শিথিল হয়ে গেলে এটি ব্যর্থ হয়। আমি বুঝতে পারি লকডাউন অর্থনীতিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। অনেকে তাদের পরিবারের খাবার আনার জন্য প্রতিদিনের কাজের উপর নির্ভর করে। এটি একটি খুব জটিল পরিস্থিতি। তবে আমাদের এটিও মনে রাখতে হবে, হাসপাতালে রোগীদের জন্য জায়গা হচ্ছে না, অক্সিজেন নেই, যখন রোগীর সর্বাধিক প্রয়োজন হয় তখন কোনও যত্ন নেই । সুতরাং এ অবস্থায় আমাদের সকলের এই মহামারীকে কাটিয়ে উঠার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করা উচিত।

আমি আবারও বলছি, উল্লেখযোগ্য বৈজ্ঞানিক নিবন্ধগুলিতে জানতে পেরেছি যে, SARS CoV-2 সংক্রমণ এর হার অভ্যন্তরের (inddor) চেয়ে বাইরে ((outdoor) কম। তবে এটি লক্ষণীয় গুরুত্বপূর্ণ যে সংক্রমণ বাইরেও সম্ভব। আমার জানা মতে, মহামারী বা এই ধ্বংসাত্মক মহামারী চলাকালীন জনসমাবেশ এড়ানো বাঞ্ছনীয়। SARS-CoV-2 সংক্রমণের প্রথম ধাক্কায় আমরা যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি তার চেয়ে এখন  কিন্তু আমরা আরো কঠিন সময় অতিক্রম করছি । সুতরাং, আমরা যদি মসজিদে গিয়ে ঈদ নামাজ পড়ি, তবে আমরা নিজেকেও ঝুঁকিতে ফেলছি এবং আরও কয়েক শতাধিক লোককে আমরা ঝুঁকির মধ্যে ফেলছি। সেক্ষেত্রে পরিবারের সাথে একত্রে বাড়িতে ঈদ নামাজ করা যেতে পারে এবং বিজ্ঞান আমাদেরকে তাই বলে। 

আমি বলছি না, আমি একজন নিখুঁত মুসলমান, তবে আমি এটা বলতে পারি যে আমি একজন মুসলিম। আমি আল্লাহ তায়ালার উপর বিশ্বাস করি, আমি আমার প্রতিদিনের নামাজ (এক দুবার  হয়তো বাদ যায়) আদায় করি, পবিত্র রমজান মাসে রোজা রাখি, আমি আমার হজ করেছি, এবং সাধ্যমত জাকাত দেই এবং দান করি। আমার সিদ্ধান্ত আমি আমার পরিবারের সাথে ঘরেই ঈদ এর নামাজ পড়ব।  আমি আশা  করবো, আপনারাও আপনাদের পরিবারের ও প্রতিবেশীর কথা চিন্তা করে বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিবেন।

লেখক: প্রবাসী ফেলো, বাংলাদেশ একাডেমি অফ সায়েন্সেস, ক্লিনিকাল মাইক্রোবায়োলজিস্ট
প্রোগ্রাম প্রধান, জুনোটিক ডিজিজ এবং এমারজিং প্যাথোজেনস, বিসি সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল
ক্লিনিকাল প্রফেসর, প্যাথোলজি বিভাগ এবং ল্যাবরেটরি মেডিসিন বিভাগ, ব্রিটিশ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়

ইমেল: [email protected]

(এটি লেখকের নিজস্ব মতামত; দয়া করে মনে রাখবেন যে বিসিসিডিসি বা ইউবিসি এই নিবন্ধে প্রকাশিত মতামতকে সমর্থন করে না)

বিডি প্রতিদিন/ফারজানা