শিরোনাম
৬ ডিসেম্বর, ২০২৩ ১৯:১৩

ডা. এস এ মালেকও মুক্তিযোদ্ধা নন!

ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন

ডা. এস এ মালেকও মুক্তিযোদ্ধা নন!

ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন

দেশে আসবো শোনার পর থেকেই আব্বার একটাই প্রশ্ন, খুলনায় কবে আসবো? খুলনায় গেলে প্রতিবার দু-তিনদিনের বেশি থাকা হয় না। এবার যাবার আগেই আব্বা বলেছেন, খুলনায় আমি যেন পাঁচ দিন থাকি। মা মারা যাবার পরে আমার প্রতি আব্বার নির্ভরতাটা অনেক বেশি দৃশ্যমান হয়েছে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে আব্বা অনেকটা শিশুর মত হয়ে গেছেন। গতবার দেশে দিয়ে প্রথম দিকে আমি মূলত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জীবনীগ্রন্থ লেখার কাজ করেছি। স্বভাবতই অধিকাংশ সময় লেখার কাজেই ব্যস্ত থাকতাম। এর মধ্যে ঠিক করলাম সাতই ডিসেম্বর সকালে খুলনা যাব। এখন পদ্মা সেতু হয়েছে। ঢাকা এয়ারপোর্টে গিয়ে বিমানে করে যশোরে পৌঁছে সেখান থেকে খুলনা যাওয়া বা মাওয়া হয়ে ফেরিতে চড়ে পদ্মা নদী পার হবার হ্যাপা নাই। ঢাকা থেকে যে কোন একটা ভাল কোচে উঠলেই চার-সাড়ে চার ঘণ্টায় খুলনার বাসায়। ছয় ডিসেম্বর সারা দিনজুড়ে মাঝেমধ্যেই আব্বার ফোন, কাল কখন রওয়ানা দেবো?

২.
ছয় ডিসেম্বর রাত বারোটার দিকে লেখক-রাজনীতিবিদ রুদ্র সাইফুলের ফোন, মালেক চাচা আর নেই। আমি যেন খবরটা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেই। আমার একটু খটকা লাগল। আগের দিনই স্যারের ছেলে, বন্ধু ও রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ডা. মামুনের সাথে কথা হল। মামুন বললো, ‘আব্বার অবস্থা এখন একটু ভালর দিকে।’ আর পরেরদিনই স্যার নেই! ডা. মালেক স্যারের মৃত্যুর ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে আমি তখনি আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া এবং আরো দুজনকে জানালাম, যাতে তারা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে এই খবরটা পৌঁছে দেন। কিছুক্ষণের মধ্যে বিপ্লব বড়ুয়া এসএমএস করে জানায়, তারাও খবরটা জেনেছেন। 
৩.
সাত ডিসেম্বর সকালে খুলনা যাওয়া হল না। বরং ডা. এস এ মালেক স্যারের জানাযায় অংশগ্রহণ করতে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় চত্ত্বরে গেলাম। আমাদের নেতা ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন ভাই, ভিসি শারফুদ্দিন আহমেদ ভাই, ডা. রোকেয়া সুলতানা আপা, রুদ্র সাইফুলসহ বঙ্গবন্ধু পরিষদের অনেক নেতাকেই দেখলাম। মামুন তসবিহ হাতে দোয়া পড়ছে। ওর শোকাচ্ছন্ন মুখটা দেখে আমার খুব কান্না পাচ্ছিল। আমার বন্ধুদের মধ্যে যে কজন সাহসী মানুষ রয়েছে, মামুন তাদের মধ্যে অন্যতম। ওকে আমি কখনো এতটা বিমর্ষ অবস্থায় দেখিনি। শেষদিনগুলোতে ও যেভাবে স্যারের যত্ন নিয়েছে, তা রীতিমত অবিশ্বাস্য! স্যারের কোভিড হলে সকল স্বাস্থ্য বিধি-নিষেধ ভেঙ্গে যেভাবে সে স্যারের সাথে সারাক্ষণ হাসপাতালে পড়ে থাকতো, তা দেখার মত ছিল। ওই বয়সে কোভিডাক্রান্ত হয়ে হাসপাতাল থেকে বেঁচে বাসায় ফেরার সংখ্যাটা হাতে গোনা ছিল, তারপরও সবার সম্মিলিত চেষ্টায় আল্লাহ সেবার স্যারকে সুস্থ করে বাসায় ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। স্যারের চিকিৎসার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে আমেরিকা থেকে মনোক্লোনাল এন্টিবডি ইঞ্জেকশন আনিয়েছিলেন। উল্লেখ্য, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কোভিড হলে এই ইঞ্জেকশন দিয়ে চিকিৎসা করা হয়েছিল। 
৪. 
বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদে জানাযা শেষে শ্বেতশুভ্র কাফনে মোড়া মালেক চাচার মৃতদেহটা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হল। এখান থেকে স্যারকে কলাবাগানের বাসায় নিয়ে যাওয়া হবে। কলাবাগান মাঠে বাদ জোহর দ্বিতীয় জানাযা শেষে স্যারের শেষ ইচ্ছানুযায়ী মীরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে সমাধিস্থ করা হবে। 
খুলনা থেকে আব্বা ফোন করে জানতে চাইলেন, আমি কখন রওয়ানা দেব। মালেক স্যারের মৃত্যুর কথা শুনে আব্বা চুপ করে গেলেন। ব্যক্তিগতভাবে আব্বা মালেক স্যারের খুব ভক্ত ছিলেন। আব্বা বঙ্গবন্ধু পরিষদের খুলনা বাংলাদেশ ব্যাংক শাখার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। সেইসব দিনগুলোতে প্রকাশ্যে বঙ্গবন্ধুর নাম বলার লোক খুব কমই পাওয়া যেতো। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সাথে ছাত্রজীবন থেকেই আব্বার পরিচয়। বঙ্গবন্ধু খুলনায় গেলে প্রতিবারই আব্বা দেখা করতেন। পাকিস্তান আমলে একবার বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক সফরে খুলনা গেলে সদ্য চাকুরিতে যোগ দেওয়া আব্বা বেতনের জমানো টাকা থেকে আড়াইশো টাকা খামে ভরে বঙ্গবন্ধুর হাতে দিয়েছিলেন। সেই গল্প আব্বার মুখে অনেকবার শুনেছি। এই গল্পটা বলার সময় আব্বার চোখ-মুখ কেমন উজ্জ্বল হয়ে উঠতো। 
বন্ধু মামুন আগে থেকেই জানতো আজ আমার খুলনা যাবার কথা। ব্যক্তিগত শোকের মুহূর্তেও ও আমাকে বললো, তোর থাকতে হবে না, তুই এখনি খুলনা যা। চাচাকে বেশি করে সময় দিস। 
৫.
মালেক চাচাকে আমি খুব কাছ থেকে পেয়েছি স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে। তিনি স্বাচিপের অনুষ্ঠানগুলোতে প্রায়শই প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দিতেন। তিনি আমার করা পোস্টারের স্লোগানগুলো খুব পছন্দ করতেন। তখন জালাল ভাইয়ের নির্দেশে কেন্দ্রীয় স্বাচিপের সব অনুষ্ঠান আমি সঞ্চালনা করতাম। মামুনের কাছে স্যার আমার সঞ্চালনারও খুব প্রশংসা করতেন। 
কোভিড মহামারী চলাকালিন মালেক স্যার বঙ্গবন্ধু পরিষদ ও অস্ট্রেলিয়া আওয়ামী লীগের অনেকগুলো অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দিয়েছেন। প্রতিটি অনুষ্ঠানে তিনি তাঁর দেওয়া সময়ে যোগ দিতেন এবং পুরো অনুষ্ঠানের বক্তৃতা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। তার বক্তৃতাগুলো একদিকে ছিল স্মৃতিতে ভরপুর, আরেকদিকে গভীর চিন্তাভাবনা প্রসূত। এই বয়সেও কথা বলার সময় তাঁর ভেতরে তারুণ্যের উদ্দীপনা এসে ভর করত। তিনি নিয়মিত রাজনৈতিক জার্নাল প্রকাশ করে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে দেবার কথা বলতেন। তিনি বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণপূর্বক একটি সমৃদ্ধ সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখতেন। সেই সাথে তিনি নিয়মিত পত্রিকায় লিখতেন। তার লেখা শক্তিশালী কলামগুলো বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নের রাজনীতিতে নেতা-কর্মীদের মনে সাহস যোগাতো। 
ইংরেজিতে বঙ্গবন্ধু শেখ হাসিনার জীবনী লিখতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরবর্তীতে ডা. এস এ মালেকের প্রতিবাদী ভূমিকার কথা জেনে বিস্মিত হয়েছি। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিশোধ নিতে গিয়ে তিনি আরো অনেক আওয়ামী লীগ নেতার সাথে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। জীবন ধারণের জন্য কোলকাতায় অবস্থানকালীন তিনি ডা. বোস নামে হোমিওপ্যাথি ডাক্তার হিসেবে প্রাক্টিসও করতেন। তিনি তখন দিল্লিতে অবস্থানরত বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। মাঝেমধ্যেই তিনি দিল্লী গিয়ে নেত্রীর সাথে দেখা করতেন এবং বাংলাদেশের রাজনীতির বিভিন্ন খবর দিতেন। পচাত্তর পরবর্তী তার এই সাহসী ভূমিকা জননেত্রী শেখ হাসিনা বরাবরই কৃতজ্ঞতার সাথে স্বীকার করেন। 
৫.
ডা. এস এ মালেক স্যারের মৃত্যুর পরে অস্ট্রেলিয়া আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের পক্ষ থেকে আমরা কয়েকজন মীরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে তাঁর সমাধিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পন করতে গিয়েছিলাম। যাবার আগে আমি আর অস্ট্রেলিয়া যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক নোমান শামীম শাহবাগের একটা ফুলের দোকানে গেলাম। দোকানে কর্মরত লোকটা ফুলের মালা বানাতে বানাতে জিজ্ঞেস করলেন, কার জন্য এই পুষ্পাঞ্জলি? বললাম, বঙ্গবন্ধু পরিষদের সদ্য প্রয়াত সভাপতি ডা. এস এ মালেকের জন্য। স্যারের নাম শোনার সাথে সাথে ভদ্রলোক একের পর এক স্যার সম্পর্কে বলে গেলেন। এবং পরম মমতায় মালার কাঠামোতে নানা বর্ণের গোলাপ বসাতে লাগলেন। আমরা যার অর্ডার দিয়েছিলাম, তার চেয়ে অনেক বেশি ফুল দিয়ে তিনি মালাটা তৈরি করে দিলেন। তারপর লেখার জন্য যত্ন করে কাগজ ও সাইন পেন এনেদিলেন। আমি অবাক বিস্ময়ে দেখলাম, সাধারণ মানুষের কতটা ভালবাসা ও শ্রদ্ধায় স্যারের বসবাস ছিল। 
আমরা মীরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে পৌছাতে মীরপুর থেকে এসে যোগ দিল অস্ট্রেলিয়া যুবলীগের আরেক নেতা বীর খান। নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ পূর্বনির্ধারিত অনুষ্ঠান বাতিল করে এসেছিলেন অস্ট্রেলিয়া আওয়ামী লীগের তৎকালিন আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ মুনীর হোসেন ও সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক, লেখিকা আইভি রহমান। আসার সময় মামুনকে সাথে করে নিয়ে এসেছিলাম। 

মীরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কবর দেবার জন্য আলাদাভাবে স্থান সংরক্ষিত করা আছে। আমরা এতক্ষণ এখানেই অপেক্ষা করছিলাম। সবাই এলে সেদিকে পা বাড়াতেই মামুন বললো, আব্বাকে সংরক্ষিত স্থানে কবর দেওয়া হয়নি। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, মানে? কী বলিস তুই? মামুন আরো সংকুচিত হয়ে বললো, ‘আব্বার মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট নাই, তাই সংরক্ষিত স্থানে কবর দেওয়া যায়নি।’ 
সবাই মিলে অনেকখানি হেঁটে ভেতরের দিকে আমজনতার মাঝে চিরনিদ্রায় শুয়ে থাকা বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট সহচর, সাবেক এমপি, বঙ্গবন্ধু পরিষদের সদ্য প্রয়াত সভাপতি, বিশিষ্ট চিকিৎসক ও বুদ্ধিজীবী ডা. এস এ মালেকের সমাধির সামনে এসে দাঁড়ালাম। চাচার আত্মার শান্তির উদ্দেশ্যে আমরা পবিত্র কোরান থেকে সুরা পাঠ করলাম ও মুনীর ভাইয়ের নেতৃত্বে আল্লাহর কাছে হাত তুলে মোনাজাত করলাম। মালেক চাচা হলেন সেই বিরল প্রজন্মের একজন, যারা গর্বভরে বলতেন, বঙ্গবন্ধুর ডাকে দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছি, কোন সার্টিফিকেট বা স্বীকৃতির জন্য নয়। 
মালেক চাচা হয়তো স্বীকৃতি চাননি, কিন্তু আমাদের কি কোন দায়িত্ব ছিল না। আমার সাধ্য থাকলে আমি চাচার কবরটা স্থানান্তরিত করে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সংরক্ষিত স্থানে নিয়ে যেতাম। শুনেছি, এই ঘটনা শুনে মাননীয় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীও ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়েছেন। মালেক চাচার সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে এসে চোখে জল আর বুকে তীব্র ক্ষোভ নিয়ে ফিরে এসেছিলাম। 

এই বিভাগের আরও খবর

সর্বশেষ খবর