শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ২০ মে, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৯ মে, ২০১৯ ২৩:২৫

একটি মুড়ির আত্মকথা

রাফিউজ্জামান সিফাত

একটি মুড়ির আত্মকথা

আমার জন্ম হয়েছিল সাধারণ খেটে খাওয়া ধান পরিবারে। ছোটকাল থেকেই খুব তেজ ছিল। খাদ্য শৃঙ্খলে কোনো অসঙ্গতি দেখলেই মাথাটা গরম হয়ে  যেত। রাগে ফেটে পড়তাম। এভাবেই ফুটতে ফুটতেই হয়ে গেলাম মুড়ি।

গায়ের গাড় গৌড় বর্ণ এবং সুস্বাস্থ্যের অধিকারী বলে খাদ্য মহল্লায় আমার বেশ জনপ্রিয়তা। সেই হিংসে  থেকেই হয়তোবা প্রতিবেশী গম আর চিঁড়া আমার সে চানাচুরকে জড়িয়ে আড়ালে নানান কানকথা রটায়। আমি শুনেও না শোনার ভান করি।     

খোলা বাজারে কিংবা প্যাকেট আকারে, দুভাবেই আমাকে কিনতে পাওয়া যায়। দামে সস্তা বলে আমার অধিকাংশ ক্রেতাই হয় বেকার  প্রেমিকগণ। বেকার প্রেমিকদের বুক পকেটে টাকা থাকে না কিন্তু বুকের  ভিতর মস্ত বড় একটা হৃদয় থাকে। তারা পকেটের সব পয়সা খরচ করে আমায় ভর্তা বানিয়ে ঠোঙায় ভরে পার্কের বেঞ্চে বসা প্রেমিকার হাতে তুলে দেয়। দশ টাকার মুড়ি তারা কয়েক ঘণ্টা ধরে চিবোয়। মুখে মুড়ি তুলে তারা রঙিন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে। আমার বেঢপ পেটের ক্ষুদ্র মস্তিকে কত বেকার প্রেমের কতশত গল্প যে জমা আছে তার ইয়ত্তা নেই।

অনেকে আবার জিলাপির সঙ্গে আমার মাখামাখি নিয়ে ফেসবুকে ঝগড়াও করে। একদল ছোলা, বেগুনি দিয়ে বানানো মুড়ি ভর্তার সঙ্গে জিলাপি  দেওয়ার পক্ষে, আরেকদল জিলাপি দেওয়ার বিপক্ষে। এই নিয়ে দুদল বিবাদে জড়ায়। ফেসবুক পুল ভোটের মাধ্যমে জনমত তৈরির চেষ্টা করে। আমি ওদের  দেখি আর হাসি। মানুষের কতই না আজাইরা সময়!

একবার এক বৃদ্ধ দাদু আমাকে খেতে বসেছিল কিন্তু  খেতে পারছিল না। খাবে কীভাবে? দাদুর তো দাঁত  নেই। আমি এমনিতে স্বভাবে বেশ নরম-শরম। দাদুর কষ্ট দেখে আমার মনটা আরও নেতিয়ে গেল। দাদু তখন দুধ-কলা দিয়ে ভিজিয়ে আমায় গিলে খায়। 

কিছু দুষ্টু ছেলেমেয়ে মশকরা করে বলে, ‘মুড়ি খা’। যদিও অন্যের উদরপূর্তিতে আমার সার্থকতা তথাপি ‘মুড়ি খা’ কথাটি আমার জন্য বেশ অস্বস্তিকর। মূলত কাউকে অকর্মা বোঝাতে কথাটি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু আমি তো মোটেও অকর্মণ্য নই। প্রতিদিন হাজারো মানুষের খুদা মিটাই আমি। স্কুল গেটে মামার হাতে বানানো ঝালমুড়ি ভর্তা প্রতিটি শিক্ষার্থীর স্কুল জীবনের অমূল্য স্মৃতি। তাহলে কেন ‘মুড়ি খা’ বলে আমাকে তুচ্ছ করা হয়? কই কেউ তো কখনো বলে না, ‘সুজি খা’!  

তবে যে যাই বলুক, দুপেয়ে মানুষ যখন মুঠ ভরে আমায় মুখে পুরে মচমচিয়ে চিবোয় তখন খুশিতে আমার ভিতরটা কুড়মুড়িয়ে নেচে ওঠে।


আপনার মন্তব্য