শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৭ জানুয়ারি, ২০২১ ২২:১৬

বিদেশি পিঁয়াজ ও দেশি গল্প

ইকবাল খন্দকার

বিদেশি পিঁয়াজ ও দেশি গল্প
♦ ডায়ালগ : তানভীর আহমেদ ♦ কার্টুন : কাওছার মাহমুদ

আমার এক বড়ভাইয়ের প্রচন্ড মন খারাপ। এগিয়ে গিয়ে কথা বলতে চাইলাম, তিনি পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন। আবার এগিয়ে গেলাম। এবারও তিনি পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেন। তবে তার চেষ্টা সফল হলো না। আমি তাকে থামিয়ে দিলাম। জিজ্ঞেস করলাম কী হয়েছে। বড়ভাই, কিছুক্ষণ ঝিম মেরে দাঁড়িয়ে থেকে বললেন, আমার সব আশা, সব স্বপ্ন শেষ। একদম ধুলোয় মিশে গেছে। আমি মাটির দিকে তাকিয়ে বললাম, ধুলোতে মিশে থাকলে তো চোখে পড়ার কথা। কই, কিছু তো দেখতে পাচ্ছি না। না স্বপ্ন, না আশা। বড়ভাই খেঁকিয়ে উঠলেন, অ্যাই, একদম ইয়ার্কি মারবি না বলে দিচ্ছি। আমি হালকা ‘সরি’ বলে অনুরোধ করলাম কী হয়েছে একটু ভেঙেচুরে বলার জন্য। বড়ভাই আরও কিছুক্ষণের জন্য ঝিম মারলেন। তারপর সেই ঝিম কাটিয়ে ওঠে বললেন, আমার স্বপ্ন ছিল আমার বাসায় সব বিদেশি জিনিস থাকবে। দেশি কোনো জিনিসই থাকবে না। কিন্তু গতকাল বিবাহবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে যারা গেস্ট হিসেবে এসেছিলেন তারা আমার স্বপ্ন ভেঙে খানখান করে দিয়ে গেছে। বলে কিনা বিদেশি পিঁয়াজ টেস্ট না। এখন থেকে তরকারি রান্না করলে যাতে দেশি পিঁয়াজ দিয়ে করি। এই যদি হয় অবস্থা, তাহলে বাসায় সবকিছু বিদেশি থাকবে, এমন একটা স্বপ্ন যে আমি দেখেছিলাম, তার কী হবে? আমি বড়ভাইয়ের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে উল্টো প্রশ্ন করলাম, কদিন আগে আপনার বাসায় গিয়ে যে দুটি টিকটিকি দেখেছিলাম, ওইগুলোও কি বিদেশি? ওরা কি ইংরেজিতে ‘টিকটিক’ করে? আমার প্রশ্ন শুনে বড়ভাই রাগে টিকটিকির কাটা পড়া লেজের মতো লাফাতে লাফাতে চলে গেলেন। আর আমি দাঁড়িয়ে রইলাম আগের জায়গায়। একটু পরেই মুখোমুখি হলাম আমার এক প্রতিবেশীর। কথায় কথায় তিনিও পিঁয়াজের প্রসঙ্গ তুললেন। বললেন, এইটা কিন্তু মানতেই হবে, বিদেশি পিঁয়াজের টেস্ট নাই। আমি বললাম, ‘টেস্ট’ নাই, তাহলে কি ‘ওয়ান ডে’ আছে? প্রতিবেশী বিরক্ত হলেন। চলে যাওয়ার চেষ্টাও করলেন। কিন্তু আমি তাকে যেতে দিলাম না। বললাম, ভাবী তো বিদেশি শাড়ি ছাড়া পরেন না, আপনি বিদেশি ব্র্যান্ডের জিনিস ছাড়া ইউজ করেন না। তাহলে বিদেশি পিঁয়াজ খাবেন না কেন? প্রতিবেশী বললেন, প্রথম সমস্যা হচ্ছে খেতে মজা লাগে না। দ্বিতীয় সমস্যা হচ্ছে, রেগে গেলে হাতের কাছে যা পায় তাই ছুড়ে মারার অভ্যাস আছে আপনার ভাবীর। এমনকি পিঁয়াজও। দেশি পিঁয়াজ আকারে ছোট। ছুড়ে মারলেও সেভাবে ব্যথা পাওয়া যায় না। আর বিদেশি পিঁয়াজের সাইজ দেখেছেন? নাকে লাগলে নাকের জায়গায় নাক থাকে না। একদিকে হেলে পড়ে। আমার এক ছোটভাই মেসে থাকে। সে বলল তাদের মেসের বুয়া নাকি একটা সিস্টেম চালু করেছে।  মেস মেম্বাররা বাধ্য হচ্ছে দেশি পিঁয়াজ কিনতে। আমি বললাম, নিয়মটা কী, একটু শুনি। ছোটভাই বলল, বুয়া বলেছে যদি দেশি পিঁয়াজ দিয়ে রান্না করানো হয় তাহলে তাকে নরমাল বেতন দিলেই চলবে। আর যদি বিদেশি পিঁয়াজ দিয়ে রান্না করানো হয়, তাহলে নাকি ১০০ টাকা বাড়িয়ে দিতে হবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, বাড়িয়ে দিতে হবে কেন? ছোটভাই বলল, বিদেশি পিঁয়াজ কাটা আর কুমড়া কাটা নাকি সমান কথা। মানে হচ্ছে, একেকটা বিদেশি পিঁয়াজের ওজন বেশি হওয়ায় কাটতে গিয়ে নাকি তার বাড়তি এনার্জি খরচ হয়। তাই ১০০ টাকা বাড়িয়ে দিতে হবে যাতে সে ভিটামিন ওষুধ কিনে খেয়ে এনার্জির ঘাটতি পূরণ করতে পারে। আমি তাজ্জব হয়ে গেলাম বুয়ার অজুহাত শুনে। আর তখনই শুনতে পেলাম রাস্তা খুঁড়তে থাকা এক শ্রমিক হেরে গলায় গান ধরেছে, ‘যখন তোমার কেউ ছিল না তখন ছিলাম আমি, এখন তোমার সব হয়েছে পর হয়েছি আমি।’ গানটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই আমার মনে হলো, এই গানটাই হতে পারে বিদেশি পিঁয়াজের ‘থিম সং’। যারা এর পক্ষে আছেন তারা ‘হ্যাঁ’ বলুন, আর যারা বিপক্ষে আছেন তারা এক মিনিট নীরবতা অবলম্বন করুন।


আপনার মন্তব্য