ইতালি এবার বিশ্বকাপে নেই। আরেক চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে চূড়ান্ত পর্বে সুযোগ পেলেও গ্রুপ খেলেই বিদায়। দুর্ভাগ্য চারবারের চ্যাম্পিয়ন জার্মানিরও। গেল দুই আসরে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিয়েছিল। সেই কুফা কাটিয়ে এবার নকআউটে জায়গা পেলেও বেশি দূর এগোতে পারেনি। টপ বত্রিশেই মিশন শেষ। জার্মানির বিদায়ে বিশ্বকাপের সৌন্দর্য কিছুটা হলেও ম্লান হয়ে গেল। তবে বিশ্বকাপের উন্মাদনা যে এখনই শেষ হয়ে যায়নি ফুটবলপ্রেমীদের ভাগ্য বলতে হয়। এমনি শঙ্কা জেগেছিল হিউস্টন স্টেডিয়ামে।
নকআউট পর্বে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল তাদের প্রথম ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল জাপানের বিপক্ষে। এ ম্যাচ ঘিরে কত তর্কবিতর্ক। কেউ বলছিল হলুদ জার্সিধারীরা নিশ্চিত হারবে। কেঁদে নেইমারদের দেশে ফিরতে হবে আরও কত কি? অন্যদিকে ব্রাজিল সমর্থকরাও টেনশনে ছিল কি যেন না ঘটে যায়। গ্রুপের শেষ দুই ম্যাচে ব্রাজিল সহজ জয়ই পেয়েছিল। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে তো সোনালি দিনের দেখা মিলেছিল। ব্রাজিলের ম্যাচ দেখে মনে হয়েছে সত্যিই ব্রাজিল। ভিনিসাস যেভাবে খেলে দলকে এগিয়ে নিচ্ছিলেন এক কথায় তা অসাধারণ।
পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নরা ফর্মে ফিরেছে। তারপরও আবার বড় স্বস্তি আগের ম্যাচে দলের প্রাণভোমরা নেইমার জুনিয়ার মাঠে ফিরেছেন। ফল কি হবে তা পরের ব্যাপার। কিন্তু ব্রাজিলের খেলা হবে আর হলুদ উৎসব হবে না। তা কি মানায়। সত্যিই গোটা দুনিয়া যেন কয়েক ঘণ্টার জন্য হলুদে পরিণত হয়েছিল। যে দিকে থাকায় শুধু হলুদ আর হলুদ। বাংলাদেশে তো হলুদের সমুদ্র। তাই বলে কি ব্রাজিল-বিরোধীরা নীরব ছিল। ঠিকই মনে প্রাণে চাচ্ছিল অঘটন বা ব্রাজিলের হার।
জাপান আবার কোনো ফেলে দেওয়ার মতো প্রতিপক্ষও না। বিশ্বকাপে আসার আগে কিরিন কাপে তারা ব্রাজিলকে হারিয়ে ছিল। তাই উৎসব আর দুশ্চিন্তা দুটোই কাজ করছিল ব্রাজিলীয়দের ভিতর। সত্যি বলতে কি খেলা শুরু হওয়ার পর পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নদের এলোমেলোই মনে হচ্ছিল। লিড নেবে সে রকম আক্রমণও শানাতে পারছিল না জাপানের দুর্গে। তুরুপের তাস ভিনিসাসকেও ম্লান মনে হচ্ছিল। ২৯ মিনিটে তো থমকে যায় হলুদ শিবির। প্রায় ২৫ মিটার দূর থেকে অবিশ্বাস্য গোল করে জাপানকে এগিয়ে নেন কাউসু সানো। এক গোলেই চিন্তার ভাঁজ পড়ে যায় দুনিয়াজুড়ে ব্রাজিলীয় ভক্তদের। কেননা সাম্প্রতিক সময় কোনো বিশ্বকাপে পিছিয়ে পড়ে ব্রাজিল জিতেছে এমন রেকর্ড পরিসংখ্যানে নেই। ১৯৯৪ সালে পিছিয়ে থেকে জয় পেয়েছিল তারা। সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে এমন সম্ভাবনাও দেখছিল না। এক গোলে পিছিয়ে থেকে প্রথমার্ধ শেষ করেন আনচেলত্তির শিষ্যরা। তাহলে কি হেরেই যাবে এ চিন্তায় নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছিল সমর্থকদের। তারপরও অপেক্ষা দ্বিতীয়ার্ধে কোনো ম্যাজিক কাজ করে কি না।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই ব্রাজিল খেলতে থাকল তাদের চিরচেনা খেলাটা। আক্রমণের পর আক্রমণ করে জাপানকে অস্থির করে তুলছিল। এত ভয়ংকর অবস্থা যে, জাপানের সবাই মিলে দুর্গ সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ভিনিসাস, এনড্রিক, মার্তেনেল্লি, ক্যাসিমিরো, ফাবিনহো আক্রমণ করে ব্রাজিলের শিবির জাগিয়ে তোলে। কিন্তু সময় যত গড়াচ্ছে ততই দমবন্ধ হওয়ার উপক্রম। গোল তো হচ্ছে না। জাপানের পরদেশি গোলরক্ষক জিয়ান সুজুকি ব্রাজিলের সামনে চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়ান। পোস্টে লেগে বল ফিরছে তাহলে কি সব শেষ?
না, দেশটি বা দলটি যে ব্রাজিল। এরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ার ক্ষমতা রাখে। এত আক্রমণে গোল না হয়ে কি পারে। শেষ পর্যন্ত এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ৫৬ মিনিটে ক্যাসেমিরোর হেড জাল স্পর্শ করলে ব্রাজিল নতুন জীবন ফিরে পায়। তাতে কি ম্যাচ তো ১-১। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে না জিতলে তখন তো অতিরিক্ত ৩০ মিনিট বা টাইব্রেকারে কী ঘটে এ নিয়ে চিন্তার শেষ ছিল না। ভিনিসাসের শর্ট ক্রসবারে লেগে ফেরত আসার পর সারা দুনিয়া আফসোসে ইস্্ ইস্্ করতে থাকে।
গোল আর হচ্ছে না। ছয় মিনিটে অ্যাডিশনাল টাইম যখন শেষ হওয়ার পথে তখন হলুদ সমুদ্রে ব্রাজিলের গর্জনে কেঁপে ওঠে। গোল, গোল, গোল ধারাভাষ্যকারও চিৎকার দিয়ে ওঠেন। মার্তেনেল্লির বিজয় গোলের পর লাইফ সাপোর্টে থাকা ব্রাজিলীয় সমর্থকরা জেগে ওঠে। জাপান বাঁধা পার হয়েছে, এতেই তো সব শেষ নয়। এই গর্জনই তো চূড়ান্ত বিজয়ের অর্জন নয়। সামনে আরও কত বাধা। তারপর স্বপ্নের হেক্সা। পারবে কি ব্রাজিল ২৪ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটাতে?