শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৬ অক্টোবর, ২০২০ ২১:৩৬

মাটির শো-পিস থেকে সমৃদ্ধির সুঘ্রাণ

মহিউদ্দিন মোল্লা, কুমিল্লা

মাটির শো-পিস থেকে সমৃদ্ধির সুঘ্রাণ
কুমিল্লার বিজয়পুরের মৃৎশিল্পের ঐতিহ্য কয়েক শত বছরের। সাত গ্রামের মানুষ জড়িত এই নান্দনিক মৃৎশিল্পের সঙ্গে। চাহিদা বাড়ছে দেশ-বিদেশে ছবি : বাংলাদেশ প্রতিদিন

কুমিল্লার বিজয়পুর। নগরীর দক্ষিণ পাশ লাগোয়া এলাকা। বিজয়পুরের মৃৎশিল্পের সুনাম দেশজুড়ে। রপ্তানি হচ্ছে ইউরোপ-আমেরিকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। শিল্পীদের হাতের ছোঁয়ায় মাটির গায়ে ফুটে উঠে লাল গোলাপ, রজনীগন্ধাসহ নানারকম নকশা। এমন নান্দনিক কারুকাজের শো-পিস থেকে ফুলের গন্ধ না এলেও পাওয়া যাচ্ছে সমৃদ্ধির সুঘ্রাণ। এখানে কাজ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন স্থানীয় মৃৎশিল্পীরা। প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশ পান পাশের সাত গ্রামের দুই শতাধিক মৃৎশিল্পী। তবে কয়েক বছর ধরে গ্যাস সংকটে পিছিয়ে পড়ছে এই স্থানীয় উদ্যোগ। পুনরায় গ্যাস লাইন সচলের দাবি শিল্পীদের। কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুরের মৃৎশিল্পের ঐতিহ্য কয়েক শত বছরের। বিজয়পুর এলাকার সাতটি গ্রামের সাত শতাধিক পাল পরিবারের মানুষ মাটির হাঁড়ি-পাতিল তৈরি করতেন। বর্তমানে কাজ করছে তিন শতাধিক পরিবার। গ্রামগুলো হচ্ছে- গাংকুল, তেগুরিয়াপাড়া, দক্ষিণ বিজয়পুর, বারপাড়া, দুর্গাপুর, উত্তর বিজয়পুর ও নোয়াপাড়া। সমবায় আন্দোলনের পথিকৃৎ ড. আখতার হামিদ খান ১৯৬১ সালের ২৭ এপ্রিল যুবকদের সংগঠন প্রগতি সংঘের ১৫ জন যুবককে নিয়ে গড়ে তোলেন বিজয়পুর রুদ্রপাল মৃৎশিল্প সমবায় সমিতি। তারা প্রতিজনে ১০ টাকা শেয়ার এবং ৫০ পয়সা আমানত দিয়ে সমিতির কাজ শুরু করেন। বর্তমানে সদস্য সংখ্যা ২৩০ জন। এ সমিতির মাধ্যমে মৃৎশিল্পে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগে। হাঁড়ি-পাতিল, বল-বাটি, মগ-জগ থেকে বের হয়ে তারা নান্দনিক সব শো-পিস তৈরি শুরু করেন। তারা তৈরি করেন ঘর সাজানোর বিভিন্ন দ্রব্য। দ্রব্যগুলো হচ্ছে- ফুলদানি, মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন প্রকার মডেল, মনীষীদের প্রতিকৃতি, ওয়াল প্লেট, জীবজন্তুর মডেল। প্রতিকৃতির মধ্যে রয়েছে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও বঙ্গবন্ধু। দেশ-বিদেশে কুমিল্লার বিজয়পুরের মৃৎশিল্পের চাহিদা বাড়ছে। কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে কিছু মৃৎশিল্পীর। গত অর্থবছরে এ সমিতির আয় হয়েছিল ৭০ লাখ টাকার ওপরে। করোনা ও গ্যাস সংকটে এখন আয় কমে গেছে। বিজয়পুর রুদ্রপাল মৃৎশিল্প সমবায় সমিতির কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, ৫০ জনের মতো কর্মচারী হাঁস, ঘোড়া, হাতি, ময়ূর এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতিকৃতি তৈরি করছেন। কেউ কাঁচা মাটি ছাঁচে ফেলে শো-পিস তেরি করছেন। কেউ এগুলো পুড়ছেন। কেউবা রং করছেন। সমিতির কার্যালয়ের সামনের দিকে রয়েছে শো-রুম। এ সমিতি থেকে কাজ শিখে অনেকে মৃৎশিল্পের কাজ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন।

কারাখানার প্রবীণ শিল্পী যুগেন্দ্র চন্দ্র পাল জানান, তার বাড়ি পাশের নোয়াপাড়া গ্রামে। তারা পারিবারিকভাবে এই পেশায় জড়িত। তিনি ৪৫ বছর ধরে মৃৎশিল্পের কাজ করেন। গ্যাস না থাকায় প্রতিষ্ঠানের আয় কমে গেছে।   সমিতির জেনারেল ম্যানেজার শংকরচন্দ্র পাল জানান, বাংলাদেশে প্রথম এবং একমাত্র বিজয়পুর রুদ্রপাল মৃৎশিল্প সমবায় সমিতি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মাটির শো-পিস তৈরি করছে। এ শো-পিস ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, আমেরিকা, জাপান এবং মধ্যপ্রাচ্যে যাচ্ছে। এছাড়া এখানে মৃৎশিল্পের ওপর কাজ শিখে স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে।

সমিতির সভাপতি তাপস কুমার পাল বলেন, গ্যাস দিয়ে পোড়ানো পণ্যের মান ভালো হয়। খরচ কম। নষ্টও কম হয়। গ্যাসে গ্লেস জাতীয় পণ্য উৎপাদন করা যায়। এই পণ্যের খরচ কম, লাভ বেশি। বিশেষ করে বিদেশের বাজারে চাহিদা বেশি। ১৯৯১ সালে তারা গ্যাস সংযোগ পান। বেলতলি থেকে লাইনটি পাঁচ কিলোমিটার পার হয়ে বিজয়পুর আসে। দুই ইঞ্চি লাইনের স্থলে এক ইঞ্চি লাইন বসানো হয়। সেই লাইনে আবাসিক ও অবৈধ লাইন সংযুক্ত হওয়ায় ২০১৫ সালে চাপ কমে যায়। ২০১৭ সালে গ্যাসের চাপ শূন্য হয়ে যায়।

এ নিয়ে আমরা সমবায় অধিদফতর ও বাখরাবাদ গ্যাস কোম্পানিতে তদবির করছি। তিন বছরেও কোনো সমাধান হয়নি। বাখরাবাদ বলছে, আবার লাইন টানার খরচ আমাদের দিতে হবে। বেলতলি থেকে লাইন টানতে কোটি টাকার বেশি খরচ দেওয়ার সামর্থ্য আমাদের নেই। বিজয়পুরে আধা কিলোমিটার দূরে একটি গ্যাস লাইন আছে। সেটি থেকে লাইন টানলে ১৭ লাখ টাকার মতো খরচ হবে। এটি আমরা দিতে পারব। কিন্তু রেললাইন পার করে লাইন টানতে হবে। এ জন্য বাখরাবাদ আপত্তি জানাচ্ছে। বাখরাবাদ গ্যাস সিস্টেম কোম্পানি লিমিটেডের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিস) প্রকৌশলী মর্তুজা রহমান খান জানান, নতুন করে গ্যাস সংযোগ দেওয়ার বিষয়ে তাদের একটি ফাইল চলমান রয়েছে।


আপনার মন্তব্য