Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : বুধবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২৩:৩০
চাহিদা থাকলেও কেন নেই ফোক ছবি
আলাউদ্দীন মাজিদ
চাহিদা থাকলেও কেন নেই ফোক ছবি

১৯৫৬ সালে ঢাকায় প্রথম বাংলা সবাক ছবি আবদুল জব্বার পরিচালিত ‘মুখ ও মুখোশ’ মুক্তি পেলেও উর্দু ছবির দাপটে বাংলা ছবি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছিল না। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র সাংবাদিক ও গবেষক অনুপম হায়াৎ তার রচিত ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘ষাটের দশকের প্রারম্ভে উর্দু ছবির প্রচণ্ড দাপটের মধ্যে ১৯৬৬ সালে পরিচালক সালাউদ্দীন নির্মাণ করেন লোকগাথা ভিত্তিক গল্পের ছবি ‘রূপবান’। ছবিটি সুপার হিট হয়। লোকগাথা ভিত্তিক ছবি রূপবানের সাফল্যে অন্যান্য চিত্র নির্মাতাকে উর্দু ভাষার পরিবর্তে লোকগাথা ভিত্তিক ছবি নির্মাণে প্রেরণা দেয়। একে একে তৈরি হয় ‘রহিম বাদশা ও রূপবান’, গুনাই, আপন দুলাল, সাইফুল মুলক বদিউজ্জামান, মহুয়া, কাঞ্চনমালা, আমির সওদাগর ও ভেলুয়া সুন্দরী, সাত ভাই চম্পা, রাখাল বন্ধু, সুয়োরানী দুয়োরানী, বেহুলা, অরুণ বরুণ কিরণ মালাসহ অনেক লোকগাথা ছবি। এসব ছবি ব্যাপক দর্শক প্রিয়তা পায়। আশির দশকে শুরু হয় রঙিন লোকগাথা ছবি নির্মাণের হিড়িক। এসব ছবির বেশির ভাগই পূর্বে নির্মিত সাদা কালো লোকগাথা ছবির পূর্ণনির্মাণ।

যেমন— ১৯৮৫ সালে প্রথম নির্মাণ করা হয় ‘রঙিন রূপবান’ এরপর রঙিন রাখাল বন্ধু, রঙিন গুনাই বিবি, রঙিন সাত ভাই চম্পা, রঙিন জরিনা সুন্দরীসহ অনেক ছবি। এসব লোকগাথা ছবিও ব্যাপক দর্শক প্রিয়তা লাভ করে।

 ১৯৮৯ সালে তোজাম্মেল হক বকুল পরিচালিত ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ এখন পর্যন্ত ঢাকাই চলচ্চিত্রে সর্বোচ্চ আয়ের ছবির স্থান দখল করে আছে। যাদের হাতে লোকগাথা ছবি প্রাণ পেয়েছিল তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আরও কয়েকজন নির্মাতা হলেন— জহির রায়হান [বেহুলা], আজিজুর রহমান [সাইফুল মূলক বদিউজ্জামান, কাঞ্চন মালা], দিলীপ সোম [সাত ভাই চম্পা], খান আতাউর রহমান [অরুণ বরুণ কিরণ মালা], চাষী নজরুল ইসলাম [বেহুলা লক্ষীন্দর], সফদর আলী ভূইয়া [রসের বাইদানী], এফ কবির চৌধুরী [পদ্মাবতী, সওদাগর] ছটকু আহমেদ [রাজদণ্ড] এবং অসংখ্য লোকগাথা ছবির নির্মাতা ইবনে মিজান। উল্লিখিত নির্মাতারা অসংখ্য লোকগাথা ছবি নির্মাণ করে সফল হন। এসব নির্মাতা ছাড়াও আরও অনেকে এ জাতীয় ছবি নির্মাণের মাধ্যমে দর্শক প্রশংসা কুড়ান। এর মধ্যে নূর মোহাম্মদ মনি ও দেলোয়ার জাহান ঝন্টুর নামও উল্লেখ করতে হয়। নব্বই দশকে এসে মারদাঙ্গা, নকল আর রিমেক ছবির ভিড়ে হারিয়ে যায় লোকগাথা ছবি নির্মাণ। ২০১৭ সালে চিত্রপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম সুমন ছোট পর্দার জনপ্রিয় নায়ক ডি এ তায়েব, পপি ও পরীমণিকে নিয়ে নির্মাণ করেন ‘সোনা বন্ধু’ চলচ্চিত্রটি। এ ছবিটিও দর্শক সাদরে গ্রহণ করে। তারপরেও লোকগাথা ছবির নির্মাণে আগ্রহ নেই কেন নির্মাতাদের। এ বিষয়ে লোকগাথা ছবি সংশ্লিষ্ট বেশ কজন নির্মাতা ও শিল্পীর মতামত তুলে ধরা হলো—

সুচন্দা

বর্তমানে লোকগাথা ছবি নির্মাণের মতো গল্প, নির্মাতা, গান কোথায়। এ ধরনের ছবি নির্মাণতো খুব সহজ নয়। রীতিমতো গবেষণাধর্মী ছবি হলো ফোক এবং লোকগাথা ছবি। জহির রায়হান ষাটের দশকে ‘বেহুলা’ ছবিটি নির্মাণ করেছিলেন। যা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এখনো ইতিহাস হয়ে আছে। এ ছাড়াও কুচবরণ কন্যা, নয়নতারাসহ অনেক এ জাতীয় ছবি রয়েছে। আসলে এসব ছবি নির্মাণে মেধার প্রয়োজন, শিল্পী মনোভাবাপন্ন লোক দরকার। এখন তো সবাই শুধু অর্থের পেছনে ছুটে। ছবি মানে শুধু ব্যবসা নয়, এটি একটি শিল্প। এখন কৃষ্টি কালচারের মধ্য থেকে শিল্পমান উধাও হয়ে গেছে। সবাই কত সহজে বিদেশি অ্যাকশন ছবির নকল করে সহজে অর্থ উপার্জন করবে সেই চিন্তাই শুধু করে। লোকগাথা ছবি নির্মাণ করতে হলে দেশীয় শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি মায়া থাকতে হবে। না হলে কখনো আরেকটি বেহুলা বা রূপবান তৈরি করা যাবে না।

 

আজিজুর রহমান

আগে যেসব প্রযোজক আর পরিবেশক এবং ছবির পৃষ্টপোষকতা করত তারা তো এখন আর নেই। এখন সবাই ডিজিটাল যুগে এসে আধুনিক হয়ে গেছে। এসব ছবি সম্পর্কে এখনকার নির্মাতাদের মধ্যে কোনো ধারণা আছে বলে মনে হয় না। সবাই এখন ভিনদেশি অনুকরণে রোমান্টিক-অ্যাকশন ছবি নির্মাণেই ব্যস্ত। নিজ দেশের মাটি ও মানুষের গন্ধমাখা চলচ্চিত্র নির্মাণে কারও দায় নেই বলেই অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়। অথচ লোকগাথা ছবির দর্শক গ্রামেগঞ্জে শহরে প্রচুর আছে। গান, গল্প এবং নির্মাণ এসব ছবির প্রাণ। এই প্রাণের আকুতি এখনকার নির্মাতাদের মধ্যে কোথায়?

 

সুজাতা

আসলে নানা প্রযুক্তির ভিড়ে এখন বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের গল্প উপেক্ষিত হয়ে পড়েছে। ছেলে মেয়েদের ছোটবেলা থেকেই আমরা ইংরেজি মিডিয়ামে পড়াশোনা করিয়ে তাদের দেশের শিল্প সংস্কৃতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখছি। এসব বাচ্চারা তিতুমীর বা সিরাজউদ্দৌলা সম্পর্কে জানে না। তারা ডরিমন দেখতেই অভ্যস্ত। আগে সিনেমা ছিল একমাত্র বিনোদনের মাধ্যম। এখন হাতে হাতে মোবাইলসহ নানা প্রযুক্তি। বিদেশি সংস্কৃতির ভারে এখনকার দর্শকের মন মানসিকতার পরিবর্তন ঘটেছে। এখনকার বাচ্চাদের কাছে ঠাকুরমার ঝুলি বা ঠাকুরদাদার ঝুলি হলো অবাস্তব ও হাস্যকর বিষয়। এখন লোকগাথা ছবি নির্মাণের মতো নির্মাতারও যথেষ্ট অভাব রয়েছে। সব মিলিয়ে চাহিদা থাকলেও লোকগাথা ছবি আর নির্মাণ হচ্ছে না।

 

ছটকু আহমেদ

এখন ডিজিটাল আর ফোর জি এর যুগ। সবাই আধুনিক হয়ে গেছে। তাই এ ধরনের গল্পের ছবি এখনকার দর্শকের কাছে হাস্যকর মনে হয়। সত্যি কথা বলতে এখন কারও মধ্যে আর প্রাণের টান বা মায়া নেই। লোকগাথা ছবি মানে প্রাণের ছবি। এমন ছবি এখন নির্মাণ করার মতো নির্মাতা বা মানসিকতা কারও আছে বলে মনে হয় না। এ ধরনের ছবি নির্মাণ করা মানে রীতিমতো গবেষণা করা। সেই সময়ও কারও নেই। সবাই এখন নকল মানে কপি পেস্টের মধ্যে নিজেদের সীমিত করে ফেলেছে। ডিজিটাল যুগ সবার মন থেকে মাটির গন্ধ আর মেধা কেড়ে নিয়েছে বলে এসব ছবি সম্পর্কে এখন আর চিন্তা করার মতো শক্তিও কারও আছে বলে মনে হয় না।

 

ডি এ তায়েব

বড় পর্দায় অনেকদিন পর গত বছর লোকগাথা ছবি সোনা বন্ধু নিয়ে এসেছিলাম। আমার ইচ্ছে ছিল আমার প্রথম অভিনীত ছবি হবে এ দেশের মাটি ও মানুষের গন্ধমাখা ছবি। যে ছবিটি সবার ভালোবাসার কথা বলবে। দেশ ও মানুষের কথা বলবে। এই ভালোবাসার এখনকার ফেসবুকের ভালোবাসার মতো ক্ষণস্থায়ী হবে না। লোকগাথা সোনা বন্ধু ছবি মানে জীবনের গল্পের ছবি। আমার আত্মবিশ্বাস ছিল আমার ২০ বছরের ছোট পর্দার সফল অভিনয় জীবনের মতো বড় পর্দার প্রথম অভিনীত ছবিটিও হবে সার্থক। শেষ পর্যন্ত তাই হয়েছে। কেউ বলতে পারেনি এই ছবির কোথাও এক বিন্দু খুঁত আছে। এখন আসলে সবাই আর্টিফিশিয়াল চিন্তায় আসক্ত। ভিনদেশি কালচার আর নকলে অভ্যস্ত। তাই দর্শক দেশীয় ছবি বিমুখ হয়ে পড়েছে। আমাদের জীবনের শিকড় হলো গ্রাম বাংলা। গ্রাম বাংলার গল্পের ছবি নিয়ে এগিয়ে আসতে পারলে এ দেশের ছবি আবার তার হারানো মর্যাদা ফিরে পাবে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow