Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শনিবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ৩১ আগস্ট, ২০১৮ ২১:৪২
ভেলেন্টিনা তেরেস্কোভা
কারখানা শ্রমিক থেকে মহাকাশকন্যা
সাইফ ইমন
কারখানা শ্রমিক থেকে মহাকাশকন্যা
প্রথম নারী নভোচারী ভেলেন্টিনা তেরেস্কোভা
bd-pratidin

ভেলেন্টিনা একজন নভোচারী হতে পেরেছিলেন। তার জন্য বিশেষভাবে কাজ করেছে তার প্যারাস্যুট জাম্পিং বা স্কাইডাইভিংয়ের দক্ষতা। এর প্রতি আকর্ষণ ছিল অল্প বয়স থেকেই। প্যারাস্যুট ক্লাবের সদস্য ছিলেন। মহাকাশ অভিযানে প্রতিনিধিত্ব করার পেছনে এটাও একটা কারণ...

 

পৃথিবীর ইতিহাসে নারীরা কখনো কোনো কিছুতে পিছিয়ে ছিল না। এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে নারীদের জয়জয়কার ধ্বনিতে মুখরিত হয়নি। খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য, স্থাপত্যশিল্প, বিজ্ঞান সবকিছুতেই নারীরা কাজ করে যাচ্ছে সাফল্যে সাথে। ১৯৬৩ সালের ১৬ জুন পৃথিবীর ইতিহাসে নারীদের জন্য এরকম একটি বিশেষ সাফল্যে দিন। এই দিন রেডিও মস্কোতে এক বিশেষ ঘোষণা দেওয়া হয়। যেখানে বলা হয়- মানব ইতিহাসে প্রথম একজন নারী মহাকাশ গমন করেছেন, তিনি সোভিয়েতেরই নাগরিক, একক পাইলট হিসেবে ভস্টক-৬ কে নিয়ে ছুটছেন ঊর্ধ্বমুখে। 

 

৫৫ বছর আগে সেই দিনে প্রথম নারী হিসেবে মহাশূন্যে যান সোভিয়েত নভোচারী ভ্যালেন্টিনা তেরেস্কোভা। এই ঘটনা পৃথিবীর জন্য এই কারণে গুরুত্বপূর্ণ কেননা এটা বলছে আগামীতে নারীপুরুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শুধু পৃথিবীতে নয় মহাশূণ্যে গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ছড়িয়ে পড়বে। ইতিমধ্যে এই পথ ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে মহাকাশে প্রায় ৬০ জন নারী সফল পদচারণা করেছে। যারা পরিচিতি লাভ করেছে বীর নারী হিসেবে। যেমন ইরানের আনুশেহ আনসারি, জাপানের চিয়াকি মুকাই, ভারতের কল্পনা চাওলা, কানাডার রবার্টা বন্ডার, কোরিয়ার লিও ইয়াং চুক, ফ্রান্সের হেউগনেরে কডি, আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ নারী ড. মে জেমিসন এবং আরও অনেকে।

১৯৩৭ সালের ৬ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন ভেলেন্টিতা তেরেস্কোভা রাশিয়ার মাসলেনিকোভো গ্রামে। বাবা ছিলেন ট্রাক্টর চালক। মা ছিলেন স্থানীয় বস্ত্র কারখানার একজন কর্মী। স্কুল ছাড়ার পর মায়ের মতো নিজেও কারখানাতে কাজ নিয়েছিলেন তেরেস্কোভা। অর্থাৎ বলা যায় কারখানার শ্রমিক থেকে মহাকাশকন্যা! তার বাবা ভ­াদিমির তেরেস্কোভ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রারম্ভে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ফিনল্যান্ডের মধ্যে সংঘটিত শীতকালীন যুদ্ধে প্রাণ হারান। শৈশব থেকেই ভেলেন্টিনা তেরেস্কোভা প্যারাসুট নিয়ে লাফিয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখতেন। তাই স্থানীয় অ্যারোকাবে স্কাই-ডাইভিংয়ে প্রশিক্ষণ নেন। ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দের ২১ মে, তিনি প্রথম আকাশ থেকে ঝাঁপ দেন। ভেলেন্টিনা একজন নভোচারী হতে পেরেছিলেন। তার জন্য বিশেষভাবে কাজ করেছে তার প্যারাস্যুট জাম্পিং বা স্কাইডাইভিংয়ের দক্ষতা। এর প্রতি আকর্ষণ ছিল অল্প বয়স থেকেই। প্যারাস্যুট ক্লাবের সদস্য ছিলেন। মহাকাশ অভিযানে প্রতিনিধিত্ব করার পেছনে এটাও একটা বিশেষ কারণ। ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে ইউরি গ্যাগারিনের মহাকাশ ভ্রমণের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধান রকেট প্রকৌশলী সের্গে কোরোলিয়োভ মহাকাশ যাত্রার ক্ষেত্রে নারীদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেন।

এরই সূত্র ধরে ১৯৬২ সালে ১৬ ফেব্র“য়ারি ভ্যালেন্টিনা তেরেস্কোভা সোভিয়েত মহাকাশচারী শিবিরে মহিলা সদস্য হিসাবে যোগদান করার সুযোগ পান। চার শতাধিক শিক্ষার্থী আবেদন করেছিলেন। কিন্তু সবার মাঝে তেরেস্কোভাই বেড়িয়ে আসেন মহাশূন্য অভিযানে। এয়ার ফোর্স থেকে বাছাইকরণের সময় তার ৯০ বার প্যারাস্যুট জাম্পিং সম্পন্ন করতে হয়। যার ফলে তিনি সুযোগ পেয়েছিলেন অত্যন্ত গোপনীয় এই মহাকাশ অভিযানে প্রতিনিধিত্ব করার। এই অভিযান এতটাই গোপনীয় যে, নিজের মা’কেও মিথ্যা বলে যেতে হয়েছিল! মূল অভিযানের আগে

পাঁচ নারী সদস্যের একটি দল গঠন করা হয় ১২ই মার্চ, ১৯৬২ সালে। মস্কো শহর হতে ৪০ কি.মি. দূরে মিলিটারি ঘাঁটিতে শুরু হলো কঠোর প্রশিক্ষণ। পুরুষ মহাকাশচারীদের সমান ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল নারীদের ক্ষেত্রেও।

প্রশিক্ষণই শেষ কথা নয়। এরপর বিভিন্ন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে তাদের যেতে হয়েছিল। যেমন আইসোলেশন টেস্ট, ভরশূন্য উড্ডয়ন, সেন্ট্রিফিউজ টেস্ট, ১২০ বার প্যারাস্যুট জাম্প, মিগ-১৫ইউটিআই জেট ফাইটারে পাইলট ট্রেনিং। এসবের মধ্যে সেন্ট্রিফিউজ টেস্ট ছিল সবচাইতে কঠিন পরীক্ষা, প্রচণ্ড অভিকর্ষণ বল প্রয়োগের ফলে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়তেন সদস্যরা। এমনই একজন সদস্য বলেছিলেন, “এই পরীক্ষার পর দেখা যেত সারা শরীরে লাল ছোপ- ছোপ হয়ে আছে, কারণ প্রচণ্ড চাপে আমাদের চামড়ার ভেতরের ক্ষুদ্র রক্ত-নালিকাগুলো ফেটে যেত!”

ভেলেন্টিনা তেরেস্কোভা হাল ছাড়েননি। তিনি সব ধরনের কঠিন পরীক্ষায় উতরে নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন। ৭০ ঘন্টা ৫০ মিনিট উড্ডয়নকালে ভেলেন্টিনা পৃথিবীকে ৪৮ বার প্রদক্ষিণ করেন। তিনি যতটুকু সময় মহাকাশে ছিলেন তা সেই সময়ে মোট আমেরিকান মহাকাশচারীদের মহাকাশে থাকার সময়ের চেয়েও বেশি ছিল। ভেলেন্টিনার এই অভিযান সোভিয়েতদের টেস্টের রেজাল্টকে সমর্থন করে। এতে প্রমাণিত হয় মহাকাশে পুরুষের ও নারীর শারীরিক এবং মানসিক চাপ সহ্য করার ক্ষমতা একই। মহাকাশ পরিভ্রমণ শেষে ভেলেন্টিনা তেরেস্কোভা বিমান বাহিনী একাডেমি থেকে মহাকাশ প্রকৌশলবিদ্যা নিয়ে লেখাপড়া করেন এবং গ্রাজুয়েশন অর্জন করেন।

এই পাতার আরো খবর
সর্বাধিক পঠিত
up-arrow