শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ৫ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৪ এপ্রিল, ২০২০ ২৩:৩২

ডেথ সার্টিফিকেটে ব্রেন স্ট্রোক টেস্ট রিপোর্টে করোনা

নারায়ণগঞ্জে নারীর মৃত্যু

রোমান চৌধুরী সুমন, নারায়ণগঞ্জ

ডেথ সার্টিফিকেটে ব্রেন স্ট্রোক টেস্ট রিপোর্টে করোনা

‘মা শুধু একটি কাশি দিয়েছিল। এক কাশির অপরাধে ঢামেকে ভর্তি নেওয়া হল না। কুর্মিটোলায় যখন গেলাম কোনো ডাক্তার নেই। আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা মায়ের চিকিৎসার আকুতি-মিনতি করেছি একটু ছুঁয়েও দেখেনি কেউ। মাকে ধরার জন্য সামান্য একটু হেক্সিসল চেয়েছিলাম, তাও দেয়নি। ভর্তি নেওয়ার পর একজন ওয়ার্ড বয় বা নার্সও এগিয়ে আসেনি বেডে তুলতে। তাই হুইলচেয়ারে বসেই মা মারা যায়। মরে যাওয়ার পর ডাক্তারের অভাব নেই। মৃত্যুর পর ডেথ সার্টিফিকেটে লেখা ছিল ব্রেন স্ট্রোক। কিন্তু মৃত্যুর দুই দিন পর ধরা পড়লো করোনা। এবার আপনারাই বলেন ব্রেন স্ট্রোক করে মারা যাওয়া মাকে কি জানাজা দেব না? নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার রসুলবাগ এলাকায় মৃত পুতুল বেগমের (৫০) ছেলে মোহাম্মদ পাভেল গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে মোবাইল ফোনে এ কথাগুলো বলেন। ইমোতে মায়ের ডেথ সার্টিফিকেটের কপি পাঠিয়ে তিনি জানান, কুর্মিটোলা হাসপাতাল আমার মা যে ব্রেন স্ট্রোকে মারা গেছেন, লিখে দিয়েছে। আমাদের বাড়িসহ এলাকার ১০০ পরিবারকে লকডাউন করা হয়েছে। বাড়ির সামনে এসে রাতে চিৎকার করে কে বা কারা প্রতিদিন হুমকি দিয়ে বলছে, তোদের একটা একটা করে মেরে ফেলব। কারণ আমরা নাকি করোনায় মৃত মায়ের জানাজা দিয়েছি। কিন্তু আমরা তো করোনা রোগী হিসেবে জানাজা দিইনি। দিয়েছি ব্রেন স্ট্রোকের রোগী হিসেবে। মায়ের চিকিৎসা ও অসুস্থতার বিস্তর বর্ণনা দিয়ে পাভেল বলেন, আমি কসমেটিক দোকানে চাকরি করি। আমার মা দীর্ঘদিন নানা রোগে ভুগছিল। গত ২৯ মার্চ মায়ের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। প্রথমে তাকে নারায়ণগঞ্জের একটি হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে কোনো চিকিৎসা হয়নি। পরে শহরের অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে ডাক্তার কিছু টেস্ট দেয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে রাতে ডিউটিরত ডাক্তার মাকে বাইরে রেখে আমার সঙ্গে কথা বলে। ওই সময় তিনি মায়ের রোগের কথা শুনে ভর্তি নেওয়ার প্রস্তুতি নেন। কিন্তু একটি কাশি সব ওলট-পালট করে দেয়। বাইরে থাকা আমার মা কাশি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার বলে দেয় ওনাকে ভর্তি নেওয়া যাবে না। তাকে কুর্মিটোলায় নিয়ে যান। কি করব ভেবে না পেয়ে মাকে ফের নারায়ণগঞ্জ নিয়ে আসি। মায়ের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়। ৩০ মার্চ দুপুরের দিকে নারায়ণগঞ্জের সব ক্লিনিক ও হাসপাতালে যোগযোগ করি, কিন্তু কোথায়ও ডাক্তার নেই। পরে কুর্মিটোলা হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে নার্সরা ছুঁয়েও দেখেনি। কোনো ডাক্তার ছিল না। আমি যখন মায়ের কথা বলি. নার্সরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল আর হাসছিল। আমি চিৎকার করলে ভর্তি নেয়। মা খুব ভারী ছিলেন। মাকে ধরার জন্য হেক্সিসল দিতে বললে নার্সরা বলে দেয়, এগুলো সরকারি দেওয়া যাবে না। ওয়ার্ডে মাকে বেডে উঠাতে আমি ও আমার স্ত্রী অনুমতি পাই। দু’জন মিলে মাকে আর বেডে তুলতে পারছিলাম না। নার্সদের ডাকলাম কেউ আসল না। রোগীর সঙ্গে আসা এক যুবক বলল, আমি এখানে পাঁচ দিনেও ডাক্তার পাইনি। আমি বাইরে গিয়ে প্রতিবাদ করি। পরেই একটি অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে আসে নার্সরা। কিন্তু অক্সিজেন সরবরাহ পাইপে কোনো মাস্ক লাগানো ছিল না। বাধ্য হয়ে মাকে শুধু পাইপ দিয়ে অক্সিজেন দেওয়া হয়। ধীরে ধীরে মায়ের শরীর ঠান্ডা হয়ে যায়। এক পর্যায়ে মা মারা যায়।

মায়ের চিকিৎসার অবহেলা দেখে অনেক কাকুতি-মিনতি করেছি। বলেছি আমার কুর্মিটোলা দরকার নেই। মাকে ছেড়ে দেন চলে যাব। কিন্তু নার্সরা বলে- এখানে থাকলে ১৪ দিন পর ছাড়া আর বের হতে পারবেন না।  মারা যাওয়ার পর ডাক্তারের অভাব নাই। চারদিক দিয়া মায়ের লাশ ঘিরে ধরলো ডাক্তাররা। এই পরীক্ষা, সেই পরীক্ষা। পাভেল জানান, মায়ের নাক দিয়ে রক্ত বের হয়েছিল। জিজ্ঞেস করাতে ডাক্তার বলে, ব্রেন স্ট্রোক করে মারা গেছে। ডেথ সার্টিফিকেটেও ব্রেন স্ট্রোকের কথা লেখা আছে। পরে লাশ নিয়ে স্বাভাবিকভাবে জানাজা সম্পন্ন করেছি। আমাদের বাড়ির আশপাশে প্রায় ১০০ পরিবারকে লকডাউন করা হয়েছে। কিন্তু অনেকের বাসায় খাদ্য নাই। এ বিষয়ে গতকাল দুপুরে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক জসিমউদ্দিনকে জানালে তিনি বলেন, ‘আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।’ বিকালে পাভেল জানান, জেলা প্রশাসককে তিনি অন্তত ৬-৭ বার কল করেছেন সাহায্য পাঠানোর জন্য। কিন্তু জেলা প্রশাসক ফোনই রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে বাংলাদেশ প্রতিদিন থেকে জেলার প্রশাসকের মোবাইলে মেসেজ পাঠিয়ে ও ফোন করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর