শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ১৩ জুন, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১২ জুন, ২০২১ ২৩:৪৯

হারিয়ে যাচ্ছে দেশি আম

সরকার হায়দার, পঞ্চগড়

হারিয়ে যাচ্ছে দেশি আম
Google News

উত্তরের সমতল অঞ্চল পঞ্চগড়ে হারিয়ে যাচ্ছে দেশি জাতের আম। সেই সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে প্রাচীনকালের সংস্কৃতি আম কুড়ানো। স্থানীয়রা বলছেন, বাজারে নতুন নতুন আম এসেছে। স্বাদে-গন্ধে ভালোমানের হলেও দেশি আমের স্বাদই আলাদা। আগে প্রত্যেক বাড়িতে বিশাল আকারের একটি করে আমের গাছ থাকত। রাস্তায় দুই ধারে বা গ্রামীণ রাস্তার মোড়ে মোড়ে আম গাছ ছিল। গ্রামীণ হাটবাজার, স্কুল-কলেজের মাঠ, ঈদগাহ, গোরস্থান, মসজিদ, মন্দিরের সামনের খোলা জমিতে বড় বড় দেশি আমের গাছ ছিল। প্রচ  রোদের দিনে এসব গাছের ছায়ায় খানিক অবকাশ নিত মানুষ। সেই অবকাশে চলত পরিবার-পরিজনের সুখ-দুঃখের গল্প। কৃষিকাজের নানা পরিকল্পনা। মাঝে মাঝে গ্রামীণ বিচার সালিশও বসত আম গাছের তলায়। এ স্থানগুলোর নাম হতো আমের জাতের নাম দিয়ে। যেমন কলমি আমের নাম দিয়ে কলমিতলা। সেই গাছগুলোকে নিয়ে নানারকমের কাহিনি প্রচলিত ছিল। আমের সময় সেই গাছগুলোকে নিয়ে হাটবাজারে চায়ের দোকানে নানারকমের আড্ডা হতো। ফাল্গুন আসতে না আসতেই মুকুলে ভরে যেত আমগাছ। মুকুলের গন্ধে মৌ মৌ করত সারা এলাকা। মৌমাছিরা বানাত মৌচাক। চৈত্র-বৈশাখ মাসে প্রত্যেক গাছেই ঝুলে থাকত থরে থরে আম। স্কুলগামী শিশুরা দুষ্টুমি করে আমের গাছে ঢিল ছুড়ত। কাঁচা আম খেতে খেতে স্কুলে যেত। মাঝে মাঝে বয়স্ক মুরুব্বিরা তাদের বকা দিত। লাঠির ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দিত। আর এসবেই মজা পেত দুরন্ত শিশুরা। বৈশাখের শেষ অথবা জৈষ্ঠের শুরুতেই আম পাকা শুরু হতো। পাকা আমের নানা রঙে ভরে যেত আমগাছগুলো। প্রত্যেক গাছতলায় আম কুড়ানোর জন্য শিশু থেকে বয়স্করা জড়ো হতো। সারা দিন আমগাছ তলায় আম কুড়ানো মানুষের ভির লেগে থাকত। কেউ কেউ রাতের আঁধারে বা ভোর বেলায় আম কুড়াত। বৈশাখী ঝড় বা একটু বাতাসেই থর থর করে মাটিতে পড়ত আম। সেই আম কুড়ানোর জন্য সবাই ছোটাছুটি করত। হাসি-তামাশাও চলত। আম কুড়ানোর আনন্দ ছড়িয়ে পড়ত প্রত্যেক পরিবারে। গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে শিশুরা এ সময় মামাবাড়ি যেত। নানাবাড়িতে আম খাওয়া আনন্দ উৎসবে পরিণত হতো। আম কুড়ানোর প্রাকৃতিক সুখ পেতে গ্রামীণ মানুষ অপেক্ষা করত সারা বছর। এখন আর এসব দৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায় না। ঝড়ের দিনে মামার বাড়ি আম কুড়াতে সুখ- অনাদিকালের এ সংস্কৃতি নিয়ে কবি জসীমউদদীনের কবিতা মামার বাড়ি এখন শুধু পাঠ্যপুস্তকেই শোভা পাচ্ছে। অন্যদিকে করোনা প্যান্ডামিক সময়ে শিশুরাও আটকে গেছে নিজেদের বাড়িতে। আম কুড়ানোর সময়ে তারা যেতে পারছে না নানা বাড়ি। বর্তমানে দেশি আমের পুরনো সুবিশাল গাছগুলো চোখে পড়ে না। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে গাছগুলো কেটে ফেলা হয়েছে। সেই গাছের স্থানে এখন ইউক্লিপটাস, মেহগনিসহ নানা জাতের কাঠের গাছ লাগানো হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, আগে অন্তত শতাধিক দেশি আমের জাত ছিল। কিন্তু এখন দেশি আম পাওয়া যায় না। আমের বড় বড় গাছগুলোকেও ধ্বংস করা হয়েছে। জানা গেছে, কলমি, সূর্যপুরি, কালোয়ানি, সিন্দুরী, সিধি, ল্যাংড়া, মধুচোষা, লক্ষ্মণা, গুটি, মিছরি, দুধিয়া, নীলাম্বরি, সিন্ধু, কালাপাহাড়, দুধস্বর, কাঁচামিঠা, দেওভোগসহ নানা জাতের আম পাওয়া যেত এ জেলায়। এসব জাতের আম বিলীন হয়ে গেছে। পাশাপাশি এ জেলায় গড়ে উঠছে বড় বড় আমবাগান। স্থানীয়রা এখন ব্যবসাকেন্দ্রিক আমবাগান করছেন। জগদল এলাকার আশরাফুল ইসলাম জানান, আগে অনেক রকমের দেশি আম পাওয়া যেত। রাস্তায় আম পড়ে থাকত। খেয়ে শেষ করা যেত না। আম কুড়াতে কত প্রতিযোগিতা হতো। এই সময় অনেক আনন্দ হতো। সেই দিনগুলো হারিয়ে যেতে বসেছে। তিনি বলেন, পুরনো গাছগুলো কেটে ফেলা হচ্ছে। রাস্তার দুই ধারে লাগানো হচ্ছে কাঠের গাছ।

অথচ সরকার ইচ্ছে করলেই রাস্তার দুই ধারে ফলের গাছ লাগাতে পারে। তাহলে আগের সেই সুখময় স্মৃতি ধরে রাখা যাবে। পঞ্চগড় জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মিজানুর রহমান জানান, দেশি আম হারিয়ে গেলেও এখন পঞ্চগড়ে বড় বড় আমের বাগান হচ্ছে। হতাশ হওয়ার কিছু নেই, এ জেলা থেকে আম বিদেশে রপ্তানি হবে। সেই পুরনো সুখ-স্মৃতি আম কুড়ানো এখন বিলীন হয়ে গেছে। প্রযুক্তির প্রভাবে তো অনেক কিছুই হারিয়ে যাচ্ছে।

এই বিভাগের আরও খবর