শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা
আপলোড : ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২৩:২৬

একটি জরিপ ও আসন্ন নির্বাচন

ইঞ্জিনিয়ার আবদুল মান্নান

একটি জরিপ ও আসন্ন নির্বাচন

এক. যুক্তরাষ্ট্রের স্বনামখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই) পরিচালিত এক জরিপে বলা হয়েছে বাংলাদেশের ৬৪ শতাংশ ভোটারের সমর্থন রয়েছে আওয়ামী লীগ  নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি। জরিপে দেশের ৬৬ শতাংশ ভোটারই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা তার দলের চেয়ে দুই শতাংশ বেশি। জরিপের এই ফলাফল আভাস দিচ্ছে আগামী জাতীয় নির্বাচনে জিতে টানা তৃতীয়বার সরকার গঠনে আওয়ামী লীগকে বেগ পেতে হবে না।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনে জিতে সরকার গঠন করা আওয়ামী লীগ টানা প্রায় ১০ বছর ধরে ক্ষমতায়। আর এই দুই মেয়াদে দেশে আর্থ-সামাজিক ব্যাপক উন্নয়ন যে হয়েছে তা দিবালোকের মতই সত্যি। এ সময়ে দারিদ্র্যবিমোচন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতির উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, মাথাপিছু আয় ও বাজেটের আকার বৃদ্ধি, নানা মেগা প্রকল্প গ্রহণ, গড় আয়ু বাড়াসহ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে নানা অগ্রগতির প্রশংসা এসেছে আন্তর্জাতিক পরিম-ল থেকে। ঐতিহ্যগতভাবে বাঙালি চরিত্রে অস্থিরতা বিদ্যমান। যে কারণে এ দেশে পর পর দুই মেয়াদে জয়ী হওয়া বা নিজেদের জনপ্রিয়তা ধরে রাখা খুবই কঠিন। কিন্তু এই কঠিন কাজটি সম্ভব হয়েছে উন্নয়নের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার বিকল্প নেই এই ধারণা জনমনে গড়ে ওঠার কারণে।

দুই. পৃথিবীর জনসংখ্যা ৭৪৫ কোটি। তাদের মধ্যে এমন দুটি মানুষ পাওয়া যাবে না চিন্তা-চেতনায় সব বিষয়ে অভিন্ন। মতভিন্নতা আলস্ন্লাহ প্রদত্ত একটি বৈশিষ্ট্য। তবে মানুষে মানুষে নানা বিষয়ে মতভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও কিছু কিছু বিষয়ে ঐকমত্য থাকা প্রয়োজন। যেমন আমরা বাংলাদেশের মানুষ। এ দেশকে আমাদের ভালোবাসতে হবে। যার নেতৃত্বে আমরা এ দেশের স্বাধীনতা পেয়েছি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর ডাকে দেশমাতৃকার যে শ্রেষ্ঠ সন্তানরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন যাদের অসীম ত্যাগে লাল সবুজ পতাকা আমরা অর্জন করেছি তাদের দেশপ্রেমের অজেয় আদর্শকে ধারণ করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধে দেশের বিরুদ্ধে নিজেদের ভাইবোনদের বিরুদ্ধে যারা অবস্থান নিয়েছে তাদের প্রতি সর্বোচ্চ ঘৃণা পোষণ করাও আমাদের কর্তব্য। ৩০ লাখ শহীদ ও প্রায় তিন লাখ মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতাকে রক্ষায় আমাদের দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতে হবে। শহীদদের স্বপ্ন একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায়ও হতে হবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

এই ঐকমত্য জাতির অস্তিত্বের জন্য অপরিহার্য। এই ঐকমত্য ছিল না বলে রূপকথার নোংরা ভূতের মতো ১৯৭৫ সালের পর থেকে বাংলাদেশ পেছন পানে হেঁটেছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গত এক দশকে দেশ যে অভাবনীয় উন্নতি লাভ করেছে এটি কোনো ব্যক্তির কৃতিত্বে নয়। বরং মুক্তিযুদ্ধের অপরাজেয় চেতনার কৃতিত্ব। মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আদর্শকে ধারণ করার সুফল। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার কৃতিত্ব এতটুকুই যে তিনি এ আদর্শ ধারণ করতে জাতিকে সাহস জুগিয়েছেন। নোংরা ভূতের মতো পেছনে হাঁটা নয়, গর্বিত বিজয়ী বীরের মতো জাতিকে সামনে এগিয়ে যেতে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

আমাদের দেশের মানুষের কাছে এক দশক আগেও উন্নয়নের মডেল হিসেবে বিবেচিত হতেন দুটি মানুষ। এদের একজন সিঙ্গাপুরের সাবেক প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান অন্যজন মালয়েশিয়ার নন্দিত রাষ্ট্রনেতা মাহাথির মোহাম্মদ। লি কুয়ানের নেতৃত্বে এক সময়কার জেলেদের দ্বীপ সিঙ্গাপুর বিশ্বের নেতৃস্থানীয় অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আর মাহাথির মোহাম্মাদের নেতৃত্বে মালয়েশিয়া অর্জন করেছে উন্নয়নের অসামান্য কৃতিত্ব। কিন্তু এখন জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের কাছে বাংলাদেশের উন্নয়ন এক বিস্ময়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা এমন এক ভূখ-কে উন্নয়নের সোপানে তুলেছেন যে দেশের হাজার বছরের ইতিহাস অন্ধকারে ঢাকা। শায়েস্তা খানের আমলে যখন এ দেশে টাকায় ৮ মণ চাল কেনা যেত তখনো এ দেশে দুর্ভিক্ষে মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ব্রিটিশ আমলে দুটি দুর্ভিক্ষে দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে অবজ্ঞা করে বলা হতো তলাবিহীন ঝুড়ি। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ মূলত একটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু রূপকথার ফিনিক্স পাখির মতো ভস্ম থেকে উড়াল দেওয়ার যে কৃতিত্ব বাংলাদেশ দেখিয়েছে তার কোনো দ্বিতীয় নজির নেই। মাহাথির মোহাম্মদ মালয়েশিয়াকে উন্নত দেশে পরিণত করেছেন এটি ঠিক। কিন্তু একইভাবে ঠিক যে মালয়েশিয়া দুনিয়ার অন্যতম সম্পদশালী দেশ। বিশ্বের এক নম্বর ভোজ্যতেল উৎপাদনকারী দেশ। টিন ও রাবার উৎপাদনেও শীর্ষ স্থানে। সিঙ্গাপুরের অবস্থানই তাকে ফ্রিপোর্ট হিসেবে আত্মপ্রকাশের সুযোগ দিয়েছে। সে বিবেচনায় গত ১০ বছরে বাংলাদেশ যে অগ্রগতি লাভ করেছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তুলনাহীন। যুক্তরাষ্ট্রের স্বনামধন্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান আই আর আইয়ের জরিপে শেখ হাসিনার পেছনে দেশের ৬৬ শতাংশ মানুষের সমর্থন সে সাফল্যেরই প্রতিদান। বাংলাদেশকে উন্নত বিশ্বের কাতারে নিতে যে একজন শেখ হাসিনার প্রয়োজন যে তাগিদই ফুটে উঠেছে ওই জরিপে।

আগামী নির্বাচনে নিঃসন্দেহে এ জনপ্রিয়তা মূলধন হিসেবে কাজ করবে। তবে সে নির্বাচনে প্রতিটি আসনে প্রার্থী মনোনয়নে দলকে বেছে নিতে হবে মাঠপর্যায়ের জনপ্রিয় প্রার্থীকে।

লেখক : মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও রাজনীতিক।


আপনার মন্তব্য