শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২২ জানুয়ারি, ২০১৯ ২২:৪২

প্রসঙ্গক্রমে

অপরাধীরা যেন পার না পায়

ফাতিমা পারভীন

অপরাধীরা যেন পার না পায়

দেশে প্রতিদিনই ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। ধর্ষকদের ভয়ে গ্রামগঞ্জ তো বটেই শহরেও নারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। আমাদের দেশে প্রতিটি নির্বাচনের পর প্রতিপক্ষের প্রতিহিংসার শিকার হয় কোনো না কোনো নারী। প্রশাসনের শত সতর্কতা সত্ত্বেও এবারও সে লজ্জা এড়ানো যায়নি। সান্ত্বনা এতটুকু- এবার বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদেনি।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন মধ্যরাতে নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার চরজুবলী ইউনিয়নের মধ্য বাগ্যার বাসিন্দা সিএনজিচালক সিরাজ মিয়ার ঘরে একদল সন্ত্রাসী প্রবেশ করে তাকে ও তার সন্তানদের বেঁধে রেখে স্ত্রীকে (৪২) বাড়ির উঠানে নিয়ে ধর্ষণ করে। পরদিন তাকে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ বিষয়টি নিয়ে মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় সব আসামিকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। অপরাধীরা নিজেদের ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখতে বিভিন্ন জেলায় পালিয়ে গেলেও শেষ রক্ষা হয়নি। প্রমাণিত হয়েছে পুলিশ চাইলে অপরাধীদের গ্রেফতার করতে পারে। সুবর্ণচরের ঘটনায় তাদের তৎপরতা আমাদের কিছুটা হলেও সান্ত্বনা দেয়। সরকারের তৎক্ষণাৎ পদক্ষেপও প্রশংসনীয়।

বিশ্বজুড়েই ধর্ষণ একটি বড়সড় ভয়াবহ সামাজিক সমস্যা; যার মূল শিকার নারীরা। হোক সে বয়সে শিশু, প্রাপ্তবয়স্ক কিংবা বৃদ্ধ। সুন্দর কিংবা অসুন্দর। সুস্থ কিংবা অসুস্থ মানসিক রোগী। সে নারী- এটাই বড় পরিচয়। স্থান-কাল-পাত্র, শ্রেণি, ধর্মবর্ণনির্বিশেষে বিকারগ্রস্ত পুরুষের ধর্ষণের খপ্পর থেকে নারী কোনোক্রমেই মুক্ত ও নিরাপদ নয়।

পত্রিকাগুলোয় এমন কোনো দিন নেই যেদিন কোনো না কোনো ধর্ষণের সংবাদ চোখে পড়ে না।

অথচ আইনে ধর্ষণের মতো অপরাধে রয়েছে কঠিন দণ্ড। যেসব আইনে ধর্ষণজনিত বিধিবিধান রয়েছে সেগুলো হলো-

১. নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধনী ২০০৩)

২. দণ্ডবিধি, ১৮৬০

৩. সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২

৪. ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৬০

দণ্ডবিধির ৩৭৫ ধারা অনুযায়ী ধর্ষণের উপাদানগুলো বিস্তারিত-ভাবে বর্ণিত হয়েছে।

আবার, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৯(৩)-এর ধারামতে, যদি একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে এবং ওই ধর্ষণের ফলে নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে বা তিনি আহত হন, তাহলে ওই দলের প্রত্যেক ধর্ষক ব্যক্তি  মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে এবং এর অতিরিক্ত অন্যূন এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হবে।

এহেন আইন থাকা সত্ত্বেও আমাদের সমাজে ধর্ষণের সংবাদ দেখতে হয়। বিলম্ব বিচার বিচারহীনতার নামান্তর এবং তা ন্যায়পরায়ণতাকে ব্যাহত করে। বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘ হলে মামলার সাক্ষীরা সাক্ষ্যদানের জন্য আদালতে উপস্থিত হওয়ার উৎসাহ হারান। অনেক সাক্ষী বিবাদী পক্ষের হুমকির ভয়ে পালিয়ে বেড়ান। সেই সুযোগে অপরাধীরা জামিন নিয়ে  প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়, ফলে সমাজে মানুষ আর অমানুষের মধ্যে কোনো ব্যবধান তৈরি হয় না। অপরাধের বিচার না হলে অপরাধীরা আরও অপরাধ সংঘটনে উৎসাহিত হয়। অপরাধপ্রবণতা বাড়ে।

আমরা ক্ষুব্ধ, উদ্বিগ্ন, মর্মাহত। প্রিয় আহত নারী, আমরা তোমাদের পাশে আছি। বাংলাদেশ তোমাদের পাশে আছে। বিচার হোক তোমাদের প্রতি বর্বরদের পাশবিক নির্যাতনের। দ্রুত বিচার হোক সব ধর্ষণ ঘটনার। বিশেষত সুবর্ণচরের দলবদ্ধ ধর্ষণ মামলার প্রত্যেক ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ড হোক। এ বিচারটি হোক বাংলাদেশের রোল মডেল। আর যেন কোনো নারীকে নিজের দেহের প্রতি অমানবিক জুলুমের জন্য নিপীড়নের জন্য ধর্ষণের জন্য প্রকাশ্য আদালতে বিচার প্রার্থনা করতে না হয়। শিক্ষা হোক মানুষরূপী নরপশুদের। সেই কাক্সিক্ষত দিনের প্রত্যাশা রইল।

 

            লেখক : নারী ও শিশু অধিকারকর্মী


আপনার মন্তব্য