শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ২০ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৯ মার্চ, ২০১৯ ২২:৫৬

প্রসঙ্গক্রমে

স্বাস্থ্যসেবার চালচিত্র

মুহম্মাদ আজিমউদ্দিন

স্বাস্থ্যসেবার চালচিত্র

চিকিৎসা মানুষের মৌলিক অধিকারের একটি। দেশের স্বাধিকার আন্দোলনে জাতির মৌলিক অধিকার পূরণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। ১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধুর নির্বাচনী ইশতেহারেও এটি স্থান পায়। স্বাধীনতার পর ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে যখন বাংলাদেশের পথচলা শুরু তখনো স্বাস্থ্য খাতকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলেছে। সন্দেহ নেই উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশেই এ খাতটি সবচেয়ে প্রাধান্য পেয়েছে। গরিব দেশের বাজেটের এক বড় অংশ ব্যয় করা হয়েছে স্বাস্থ্য খাতে। এর সুফলও অর্জিত হয়েছে নানাভাবে। বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে সন্তোষজনকভাবে। প্রসূতি মৃত্যুর হার কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে অর্জিত হয়েছে তাৎপর্যপূর্ণ সাফল্য। স্বাস্থ্য পরিচর্যায় বাংলাদেশের নানা উদ্যোগ বহির্বিশ্বেও প্রশংসা অর্জন করেছে। স্বাস্থ্য খাতে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ব্যয় করা হলেও সেবার মান উন্নয়নে চোখে পড়ার মতো সাফল্য অর্জিত হয়নি। গত বছর বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের চিকিৎসকরা রোগী দেখার ক্ষেত্রে গড়ে ৪৮ সেকেন্ড সময় দেন। অথচ সুইডেনের চিকিৎসকরা এ ক্ষেত্রে সময় নেন গড়ে ২২ মিনিট। চিকিৎসক যত অভিজ্ঞই হন ৪৮ সেকেন্ডে রোগীর সঙ্গে কথা বলে রোগের বিষয় জানা এবং সুচিকিৎসা করা যে সম্ভব নয়, তা সহজেই অনুমেয়। তার পরও এটিই বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থার নিয়তির লিখন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিবিসির প্রতিবেদনে বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থার যে চালচিত্র তুলে ধরা হয়েছে তাতে দেশের সবচেয়ে সুপরিচিত ও ব্যস্ত হাসপাতাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে। হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলেছেন, তাদের একজনকে গড়ে প্রতিদিন ২০০ রোগী দেখতে হয়। আট ঘণ্টা ডিউটির সময় এত রোগীর চিকিৎসা দিতে গেলে কোনোভাবেই সময় নিয়ে রোগী দেখা সম্ভব নয়। গত বছর জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশে সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে  ৬ হাজার ৫৭৯ রোগীপ্রতি একজন চিকিৎসক কর্মরত আছেন। তবে বর্তমানে দেশের চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ ওষুধ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হচ্ছে। স্বাধীনতা অর্জনের পর দেশ ওষুধের ক্ষেত্রে আমদানির ওপর নির্ভরশীল ছিল এবং অনেক উচ্চমূল্যে জনগণকে ওষুধ কিনতে হতো। ইতিমধ্যে দেশ ওষুধ আমদানিকারক থেকে রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। সারা বিশ্বে বাংলাদেশের ওষুধ সুনাম অর্জন করেছে। ডাক্তারপ্রতি রোগীর সংখ্যা বিপুল হওয়ায় রোগী দেখার শৃঙ্খলায় যে ব্যত্যয় হচ্ছে তা একটি বোধগম্য বিষয়। ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালের  জরিপ প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, রোগী দেখতে সময় দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারত ও পাকিস্তান বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে। ভারতে চিকিৎসকরা রোগী দেখতে গড়ে আড়াই মিনিট সময় দেন। রোগী দেখার জন্য এ সময় কোনোভাবেই পর্যাপ্ত নয়। তবে তা বাংলাদেশের ডাক্তারদের দেওয়া গড় সময়ের চেয়ে তিন গুণের বেশি। প্রতিবেশী দেশ এবং চিকিৎসা খরচ সহনীয় হওয়ায় বাংলাদেশ থেকে লাখ লাখ মানুষ প্রতি বছর ভারতে যায় চিকিৎসার জন্য। এ জন্য শত শত কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে। বাংলাদেশ স্বাস্থ্য পরিচর্যার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সার্ক দেশগুলোর চেয়ে এগিয়ে। কিন্তু চিকিৎসা ক্ষেত্রে ডাক্তারদের সময় কম দেওয়ার বিষয়টি পুরো চিকিৎসাব্যবস্থার সুফলকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে। ভাবমূর্তির সংকটেও পড়ছেন বাংলাদেশের চিকিৎসকরা। এ বেহাল অবস্থার অবসান তাদের নিজেদের সুনামের স্বার্থেই কাম্য হওয়া উচিত। সমস্যার সমাধানে রোগী দেখার ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা কীভাবে আরও সময় দিতে পারেন সে উপায় বের করার দিকে নজর দিতে হবে। চিকিৎসাকে বলা হয় মানবসেবার পেশা। কিন্তু আমাদের দেশের চিকিৎসকদের একাংশ যে চিকিৎসার চেয়ে রাজনীতি নিয়েই বেশি ব্যস্ত এটি একটি ওপেন সিক্রেট। চিকিৎসকদের নিয়ে দুই প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির গঠিত অঙ্গসংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ বা স্বাচিপ ও ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন  অব বাংলাদেশ বা ড্যাবের কাছেই জিম্মি হয়ে পড়েছে দেশের স্বাস্থ্য খাত। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে স্বাচিপের দৌরাত্ম্যে সরকারি সব হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজে স্বাচিপ সদস্যদের দখলদারিত্ব শুরু হয়। বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে ড্যাবের রামরাজত্ব স্বাস্থ্য খাতে অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। দেশবাসীর ট্যাক্সের টাকায় তাদের পড়াশোনার খরচ এবং চাকরি জীবনের বেতন-ভাতা দেওয়া হয় অথচ সাধারণ মানুষের সেবার বদলে রাজনীতিকেই প্রাধান্য দেন তারা। কারণ, চিকিৎসা ক্ষেত্রে ভালো কোনো পদে যাওয়ার জন্য যোগ্যতা নয়, রাজনৈতিক পরিচয়ই নিয়ামক হয়ে দেখা দেয়। দুই প্রধান দলের সমর্থক চিকিৎসকরা কথায় কথায় ধর্মঘটে নামাকে কর্তব্য বলে ভাবেন। রোগীকে ফেলে রেখে সভা-সমাবেশে ব্যস্ত থাকাও তাদের অনেকের কাছে কর্তব্য বলে বিবেচিত হয়। স্বাস্থ্য খাতে দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠায় এ জিম্মি অবস্থার অবসান হওয়া দরকার। রাজনীতি নয়, সেবার মনোভাব নিশ্চিত করার মাধ্যমে এ ক্ষেত্রের যাচ্ছেতাই অবস্থার ইতি ঘটাতে হবে।          

            লেখক : কলামিস্ট।


আপনার মন্তব্য