শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ৩০ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৯ নভেম্বর, ২০১৯ ২২:৫৭

ভোক্তাস্বার্থ রক্ষায় যা যা করতে হবে

গোলাম রহমান

ভোক্তাস্বার্থ রক্ষায় যা যা করতে হবে

সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য ঊর্ধ্বমুখী। শুরু পিয়াজ দিয়ে সেপ্টেম্বর মাসে। তারপর একে একে চাল, ডাল, ময়দা, আটা, সয়াবিন তেল, ডিমসহ নানা পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। শীতকালীন সবজি এখনো সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। কয়েকদিন আগে লবণের দাম হঠাৎ করে অস্বাভাবিকভাবে বাড়ে, তবে স্বস্তির কথা এখন তা অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত। এ বছরের প্রথম দিকে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে পিয়াজের দাম ছিল প্রতি কেজি ২০ থেকে ২৫ টাকা। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে খুচরা বাজারে ২২০ টাকা বা তার চেয়েও বেশি। সরকারের নানা উদ্যোগের পরও মূল্য নিয়ন্ত্রণে আসছে না। এমনটি আরও একবার হয়েছিল ২০১৭ সালে। সে সময়ে প্রতি কেজি পিয়াজ ১৪০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

পিয়াজ রান্নার একটি অত্যাবশ্যকীয় উপকরণ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মানুষের ভোগের পরিমাণ বাড়ছে। পিয়াজের ব্যবহারও বাড়ছে। বর্তমানে পিয়াজের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৩০ লাখ টন বা কাছাকাছি। বিগত এক দশকে উৎপাদন দ্বিগুণ হওয়া সত্ত্বেও দেশে উৎপাদিত পিয়াজে ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ সম্ভব হচ্ছে না।  মোট চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ পিয়াজ বর্তমানে বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। পিয়াজ পচনশীল পণ্য। দূরবর্তী চীন, মিসর, তুরস্ক বা পাকিস্তান থেকে পিয়াজ আমদানি ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল। আমদানিকৃত পিয়াজের প্রায় সবটাই আসে প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে। ভারতে পিয়াজ উৎপাদন ব্যাহত হলে অথবা মূল্য বৃদ্ধি পেলে তার প্রভাব প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের বাজারে পড়ে। ২০১৭ সালে ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় ভারত সরকার পিয়াজ রপ্তানি নিষিদ্ধ করে, ফলে বাংলাদেশের বাজারে সরবরাহ সংকট হয় ও মূল্য বৃদ্ধি পায়। এ বছর ভারত থেকে প্রতি টন পিয়াজ ২৫০ থেকে ৩৫০ ডলার বা কাছাকাছি মূল্যে আমদানি হচ্ছিল। ভারত সরকার বিগত ১৩ সেপ্টেম্বর পিয়াজ রপ্তানিতে টনপ্রতি ন্যূনতম মূল্য ৮৫০ মার্কিন ডলার বেঁধে দেয়। তখনই বাংলাদেশের বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। ২৯ সেপ্টেম্বর দেশটি পিয়াজ রপ্তানি পুরো বন্ধ করে দেয়। ভারত থেকে প্রতিদিন গড়ে ২৫০০ থেকে ৩০০০ টন পিয়াজ আমদানি হতো। ভারত রপ্তানি বন্ধ করায় বাংলাদেশে সরবরাহ ঘাটতি দেখা দেয় ও দাম বৃদ্ধি পেতে থাকে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এই সরবরাহ সংকট মোকাবিলার উদ্দেশ্যে মিয়ানমারসহ অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি উৎসাহিত করার লক্ষ্যে ব্যাংকের সুদহার ও এলসি মার্জিন হ্রাসসহ আমদানিকারকদের নানা প্রণোদনা প্রদানের উদ্যোগ নেয়। মিয়ানমার থেকে প্রতিদিন হাজার টনের অধিক পরিমাণ পিয়াজ আসা শুরু হয়। মিয়ানমারের পিয়াজ অধিক পচনশীল হওয়ায় এবং মিয়ানমারের রপ্তানি মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্রমে তা হ্রাস পেতে থাকে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় অক্টোবরের মাঝামাঝি ভোগ্যপণ্যের কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী গ্রুপকে বিদেশ থেকে পিয়াজ আমদানির অনুরোধ করে। এসব ব্যবসায়ী গ্রুপ পিয়াজ ব্যবসার সঙ্গে ইতিপূর্বে সম্পৃক্ত ছিল না। সম্ভবত সে কারণে আমদানি বিলম্বিত হচ্ছে। অন্যদিকে বাজারে বড় ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পিয়াজ আমদানিতে নিরুৎসাহিত করে। সরকার মূল্য নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে পিয়াজ কিনে টিসিবির ডিলারদের মাধ্যমে সুলভ মূল্যে বিক্রির ব্যবস্থা করে। তা ছাড়া প্রশাসনিক ব্যবস্থা হিসেবে বাজার অভিযানের মাধ্যমে মূল্য নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগও নেওয়া হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের অধিক মূল্যে পিয়াজ বিক্রির অপরাধে মোটা অঙ্কের জরিমানা করা হয়। এসব ব্যবস্থা সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নয়নে সহায়ক হয়নি। আর এ সংকটকে পুঁজি করে অতিমুনাফালোভী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী আমদানিকারক, আড়তদার, মজুতদার ও খুচরা ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি করে ভোক্তাদের পকেট থেকে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়।

‘ব্যবসা সরকারের কাজ নয়’ নীতিতে অটল থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রণোদনা ও নীতিসহায়তা প্রদান এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। কিন্তু ব্যবসায়ীদের থেকে প্রত্যাশিত উদ্যোগ ও সহযোগিতা না থাকায় বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে এবং কিছু ব্যবসায়ী মূল্য বৃদ্ধি করে লাভবান হন। বাজার-ব্যবস্থার ব্যর্থতার ফলে ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হন। অবশেষে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সরকার মালবাহী বিমানে সরাসরি পিয়াজ আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়। কয়েকটি ব্যবসায়ী গ্রুপও এ উদ্যোগে যোগ দেয়। কিন্তু এতেও সরবরাহ পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতি হয়নি এবং মূল্য এখনো ক্রেতাদের ক্ষমতার বাইরে। অক্টোবরে সরকার সরাসরি আমদানির মাধ্যমে বাজারে পিয়াজ সরবরাহ বৃদ্ধিতে উদ্যোগী হলে সম্ভবত মূল্য পরিস্থিতির অতটা অবনতি হতো না। বাজারব্যবস্থা যখন অকার্যকর হয়ে পড়ে সে সময় জনস¦ার্থে কেবল ব্যবসায়ীদের ওপর নির্ভর না করে সরকারের সরাসরি ব্যবসায় অবতীর্ণ হয়ে পণ্য সরবরাহ বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনে ভর্তুকি প্রদানের মাধ্যমে মূল্য নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখার কোনো বিকল্প আছে বলে মনে হয় না। আর সে কারণেই বঙ্গবন্ধু টিসিবি সৃষ্টি করেছিলেন।

ইতিমধ্যে নতুন পিয়াজ বাজারে আসা শুরু করেছে, আশা করা যায় ডিসেম্বরে পিয়াজ ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নেমে আসবে। আর যদি ভারত রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় তবে দ্রুতই বাজার স্বাভাবিক হয়ে আসবে। এ বিষয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা গ্রহণ সরকার বিবেচনা করতে পারে। প্রসঙ্গত, ভারত মালদ্বীপে পিয়াজ রপ্তানি নিষিদ্ধ করেনি এবং ভারতের কোনো কোনো রাজ্যে ইতিমধ্যে পিয়াজের মৌসুম শুরু হয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদে পিয়াজের বাজার স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে দেশে উৎপাদন বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। উন্নত জাতের বীজ সরবরাহ, সুলভে ঋণ ও সারের ব্যবস্থা, পিয়াজ সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং কৃষককে মৌসুমে যুক্তিসংগত মূল্য নিশ্চিত করা গেলে পিয়াজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্জন সম্ভব বলে মনে করি। এ লক্ষ্যে পিয়াজের মৌসুমে পিয়াজ আমদানির ওপর ১০ থেকে ২০ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে, তবে তা মৌসুমের শেষে ভোক্তাস্বার্থে প্রত্যাহার যুক্তিযুক্ত হবে। স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের আগে পিয়াজ আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ কোনোভাবেই সমীচীন হবে না, এতে সংকট ঘনীভূত হবে, ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

চালের মূল্য ও খাদ্য নিরাপত্তা : বিগত এক মাস ধরে চালের মূল্য ক্রমে বাড়ছে। ইতিমধ্যে প্রকারভেদে প্রতি কেজি চাল ঢাকার বাজারে ২-৩ থেকে ৭-৮ টাকা অধিক মূল্যে বিক্রি হচ্ছে। বোরো মৌসুমে কৃষক ধানের উপযুক্ত মূল্য পায়নি। ৭০০-৮০০ টাকা উৎপাদন ব্যয়ের বিপরীতে প্রতি মণ ধান বিক্রি হয় ৬০০-৬৫০ টাকায়। আমনের মৌসুম এসে গেছে। কৃষক যাতে উপযুক্ত মূল্য পায় সে উদ্দেশ্যে সরকার ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ও সংগ্রহমূল্য নির্ধারণ করেছে। প্রতি কেজি চালের সংগ্রহমূল্য স্থির করা হয়েছে ৩৬ টাকা। এর পরই সক্রিয় হয়ে উঠেছে চালকল সিন্ডিকেট। সম্ভবত পিয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতা চালকল মালিকদের সাহসী করে তুলেছে। ২০১৭ সালে বন্যা ও রোগবালাইয়ের কারণে উৎপাদন কম হওয়ায় খুচরা বাজারে সব ধরনের চালের দাম দফায় দফায় বৃদ্ধি পায়। সে সময় সরকারের গুদামেও চালের মজুদ ছিল সামান্য। এবারের অবস্থা ভিন্ন। দেশে উৎপাদিত পর্যাপ্ত চাল আছে। সরকারের গুদামে ১৫ লাখ টনের অধিক খাদ্যশস্য মজুদ আছে। স্বল্প আয়ের মানুষ তাদের মোট ব্যয়ের সিংহভাগ ব্যয় করে চাল কেনায়। চালের দাম বৃদ্ধি পেলে তারা বিপাকে পড়ে। সরকারকে চালের বাজার অস্থিতিশীল করার যে কোনো অপচেষ্টা শক্ত হাতে দমন করতে হবে। চক্রান্তকারী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে খোলাবাজারে চাল বিক্রি এবং safety net program সমূহে চাল বিতরণ বৃদ্ধি করে সরবরাহ বাড়ালে চালের মূল্য স্থিতিশীল ও সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসবে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কৃষককে সুলভ মূল্যে উন্নত বীজ, সার, পানি ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ সরবরাহের সঙ্গে সঙ্গে ঋণ সুবিধা এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা বৃদ্ধি করতে হবে। একই সঙ্গে কৃষকের উৎপাদিত ফসলের লাভজনক মূল্য নিশ্চিত করতে হবে। সাধারণত ধান কাটা শুরুর আগেই সরকার ধান-চালের সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ও সংগ্রহমূল্য স্থির করে। তবে নানা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ধান-চাল সংগ্রহ প্রতি বছরই বিলম্বে শুরু হয়। এ প্রেক্ষাপটে কৃষক সরকারের ন্যায্য মূল্যে ধান-চাল সংগ্রহের সুফল থেকে বঞ্চিত হয়, লাভবান হন মিল-মালিক ও মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়িক শ্রেণি। অনেক সময় রাজনৈতিক সুবিধাভোগী শ্রেণি মৌসুমভিত্তিক কৃষক ও ব্যবসায়ী সেজে সরকার নির্ধারিত মূল্যের সুবিধা ভোগ করে। Contract Growing পদ্ধতিতে কৃষকের কাছ থেকে ধান কাটার পরপরই ধান-চাল সংগ্রহের উদ্যোগ এবং  Contract Growing  -দের জন্য শস্যবীমার প্রবর্তন করা গেলে একদিকে ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও রোগবালাইয়ের কারণে কৃষকের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনাও দূর হবে। চালকল মালিকদের সম্পৃক্ত করে  Contract Growing পদ্ধতিতে ধান উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হলে সরকারের গুদামে পর্যাপ্ত মজুদ গড়ে তোলাও সম্ভব হবে। তবে প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে  Contract Growing পদ্ধতিতে ধান-চাল সংগ্রহের উদ্যোগ গ্রহণ করা যুক্তিযুক্ত হবে। আর সরকারের গুদামে চাল পর্যাপ্ত মজুদ থাকলে মিলার ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের পক্ষে সরবরাহ অস্থিতিশীল করে মূল্য বৃদ্ধির সুযোগও থাকবে না।

সার্বিক বাজার পরিস্থিতি : পিয়াজ ও চাল ছাড়াও পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী আগাম শীতকালীন সবজির সরবরাহ প্রচুর থাকলেও দাম বাড়ছে। মাসের শুরুতে প্রতি কেজি খোলা সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে ২ থেকে ৩ টাকা। আর ৩ থেকে ৪ টাকা বেড়েছে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম। গত সপ্তাহের তুলনায় প্রতি ডজন ডিমের দাম বেড়েছে ১৫ থেকে ২০ টাকা। তা ছাড়া ডাল, আটা, ময়দা ইত্যাদি পণ্যের দামও বাড়ছে। হঠাৎ করে গুজবে লবণের দাম কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়। তবে ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে তা নিয়ন্ত্রণে আসে। দেখেশুনে মনে হয় বিভিন্ন ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট ও স্বার্থান্বেষী মহল পণ্যমূল্য অস্থিতিশীল করে লাভবান হওয়ার ও সরকারের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করছে। দেশে ভোজ্যতেল, চিনি, আটা, ময়দাসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি ও প্রক্রিয়াজাত করে হাতে গোনা কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল। দেশের বাজারে মূল্য স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে সরকারের নজরদারি বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। প্রতিযোগিতা কমিশনের কার্যক্রম দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন। শীতকালীন সবজির মূল্য সহনীয় পর্যায়ে না এলে সবজি রপ্তানিতে লাগাম টানা যুক্তিযুক্ত হবে। তা ছাড়া প্যাকেটজাত ও বস্তাজাত পণ্যের সর্বোচ্চ বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করে প্যাকেটে ও বস্তার গায়ে তা লেখা বাধ্যতামূলক করা হলে ভোক্তারা উপকৃত হবেন।

উন্নয়ন ও ভোক্তাস্বার্থ : বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের মহাসড়কে। বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশের ঊর্ধ্বে। বিশ্বব্যংক বাংলাদেশকে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্যবিত্ত দেশ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করেছে। জাতিসংঘ বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে শ্রেণিভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। মানুষের মাথাপিছু বার্ষিক আয় এরই মধ্যে ১ হাজার ৯০০ মার্কিন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। দারিদ্র্যসীমার নিচে জীবনযাপনকারী জনসংখ্যা শতকের হিসাবে উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। তবে এখনো প্রায় ২ কোটি মানুষ অতিদরিদ্র। দেশের সিংহভাগ জনসংখ্যা হতদরিদ্র, নিম্ন আয় ও নিম্নমধ্যবিত্ত আয়ের শ্রেণিভুক্ত। পণ্যমূল্য বৃদ্ধি তাদের জীবনমানে বিরূপ প্রভাব ফেলে। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বাড়ে। হতাশা আর অসন্তোষ বৃদ্ধি পায়। উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছানোর লক্ষ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে রাখার বিকল্প নেই। এ প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষের ব্যবহার্য ১৫ থেকে ২০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য চিহ্নিত করে সেসব পণ্যের সরবরাহ পরিস্থিতি স্থিতিশীল ও মূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখার উদ্যোগ গ্রহণ সমীচীন হবে বলে মনে করি।

‘ভোক্তা শ্রেণি’ দেশের সর্ববৃহৎ অর্থনৈতিক গোষ্ঠী। সরকার প্রতিনিয়ত নানা বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। অনেক ক্ষেত্রেই সরকারের সিদ্ধান্ত ভোক্তাদের ওপর কী প্রভাব ফেলবে সে বিবেচনা উপেক্ষিত হয়। এ অবস্থায় ভোক্তাস্বার্থ বিবেচনা, সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ভোক্তাদের স্বার্থের বিষয়টি তুলে ধরা, ভোক্তাস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কার্যক্রমে সমন্বয়সাধন, চাহিদা, উৎপাদন, আমদানির সঠিক পরিসংখ্যান সংরক্ষণ; সর্বোপরি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল থেকে দরিদ্র, স্বল্প আয় ও নিম্নমধ্যবিত্তের ভোক্তারা যাতে বঞ্চিত না হয় সে লক্ষ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে রাখার উদ্দেশ্যে ১৫ থেকে ২০টি খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য চিহ্নিত করে সেসব পণ্যের সরবরাহ পরিস্থিতি সন্তোষজনক পর্যায়ে এবং মূল্য স্থিতিশীল রাখার দায়িত্ব অর্পণ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি পৃথক ডিভিশন অথবা একটি স্বতন্ত্র ‘ভোক্তাবিষয়ক মন্ত্রণালয়’ (Consumers Affairs Ministry) সৃষ্টি সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। প্রসঙ্গত, ভারতসহ অনেক দেশেই ভোক্তাস্বার্থ দেখভালের জন্য স¦তন্ত্র মন্ত্রণালয় আছে।

                লেখক : সভাপতি, ক্যাব।


আপনার মন্তব্য