শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১০ আগস্ট, ২০২০ ২৩:১৫

দয়াময় প্রভু দয়া করুন

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম

দয়াময় প্রভু দয়া করুন

মৃত্যু অস্বাভাবিক কিছু না, বরং মৃত্যুই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই মৃত্যু কীভাবে হচ্ছে সেটাই ভাবার বিষয়। জন্ম যেমন আনন্দের, স্বাভাবিক মৃত্যুও অনেকের কাছে সুন্দর উপভোগ্য আনন্দের। আমরা কি ভেবেছিলাম বঙ্গবন্ধুর এমন মৃত্যু হবে? তাঁর পরিবারের সবার এমনভাবে দুনিয়া থেকে চলে যেতে হবে? যে যাই বলুন, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা কোনো মহামানবী ছিলেন না। তিনি একজন যথার্থ পরিপূর্ণ মানুষ ছিলেন। কোমরে আঁচল বেঁধে অনেকের সঙ্গে কথা বলার সাহস তিনি রাখতেন। তাঁর বিয়ে হয়েছিল শিশু বয়সে। স্কুল-কলেজে কোনো শিক্ষা নেননি। কিন্তু প্রকৃতির কাছ থেকে যে শিক্ষা তিনি পেয়েছেন সেটা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। তাঁর কি ওভাবে মরার কথা ছিল? ১৫ আগস্টের আগে আমরা কেউ কি একবারও এমন কল্পনা করেছি? পৃথিবীতে এমনি অনেক ঘটনা ঘটে যা আমাদের কল্পনাকেও হার মানায়। এই যে করোনা, এ নিয়ে গভীরভাবে ভেবে দেখেছি, মৃত্যুর সংখ্যা অস্বাভাবিক কিছু না। যতগুলো লোক করোনায় মরেছে স্বাভাবিক সময়েও অতটা মানুষ অসুখ-বিসুখে মরে, ওর চাইতেও বেশি মরে। কিন্তু আতঙ্ক ছড়ায় না। এই সেদিন করোনায় মরেছে ৩২ জন আর সড়ক দুর্ঘটনায় ২৭ জন। তাই করোনার মৃত্যু আহামরি কিছু না। তবে করোনার কারণে আমরা অনেক পশুশক্তিকে চিহ্নিত করতে পারলাম। করোনার নামে মিথ্যা সার্টিফিকেট, জাল-জালিয়াতি অমানবিকতার এক শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। এমন হওয়ার কথা নয়। যেখানে বাঙালি জাতি মানবতা, দেশপ্রেম, ভালোবাসায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে মায়া-মমতায় বিশ্বের উদাহরণ সৃষ্টিকারী একটি জাতি, সেই তাদের কপালেই জুটেছে এ ধরনের ন্যক্কারজনক জঘন্য তকমা! যা আমরা কখনো কল্পনাও করিনি। ঠিক এমন এক সময়ে লেবাননে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হিরোশিমা-নাগাসাকির মতো বিস্ফোরণ সমগ্র মানবসভ্যতাকে নাড়া দিয়েছে। লেবানন বহু বছর অস্ত্রের ঝনঝনানি শুনেছে। ফিলিস্তিনিরা একসময় লেবাননে আশ্রয় নিয়েছিল। ইয়াসির আরাফাতের সদর দফতর ছিল লেবাবনে। সেই লেবাননে এ কি ভয়াবহ বিস্ফোরণ! এ বিস্ফোরণ যদি সরকারের উদাসীনতায় হয়ে থাকে তাহলে তাদের আর এক মুহূর্তও ক্ষমতায় থাকার কোনো অধিকার নেই। আর এটা যদি কোনো অশুভ শক্তি ঘটিয়ে থাকে তাহলে এর চেয়ে নিষ্ঠুর ঘৃণ্য কাজ আর হতে পারে না। এ বিস্ফোরণে আমাদের কয়েকজন হতাহত হয়েছেন। সর্বত্র কেমন যেন অস্থিরতা। আল্লাহ কি আমাদের এ অস্থিরতা থেকে মুক্তি দেবেন না? আমার এক বন্ধুর বড় ভাই জামান স্যার মুক্তিযুদ্ধের সময় ঘাটাইল স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের পরও ছিলেন অনেক বছর। নেজামে ইসলাম পার্টি করতেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁকে টাঙ্গাইল জেলা শান্তি কমিটির সদস্য করা হয়েছিল। কদিনের মধ্যে শান্তি কমিটির অশান্তি দেখে হতাশ হয়ে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই একজনই শান্তি কমিটি থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। পদত্যাগ করা কোনো কঠিন কাজ নয়। কিন্তু ইয়াহিয়ার আমলে মুক্তিযুদ্ধের সময় শান্তি কমিটি থেকে পদত্যাগ করা যে সে কথা ছিল না। ইমানের জোর ছিল, আল্লাহর ওপর ভরসা ছিল তাই হয়তো নীতি আঁকড়ে বেঁচে ছিলেন। কতবার বলেছেন, ‘বাবা কাদের! বঙ্গবন্ধুর কন্যা নেত্রীকে বল একটা জাতীয় দোয়া মাহফিলের আয়োজন করতে। সবাইকে নিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করলে হয়তো আল্লাহ মাফ করতে পারেন।’ তাঁর বিশ্বাস ছিল, আমি অনুরোধ করলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শুনবেন। তাই এর আগেও জাতীয় দোয়া মাহফিলের প্রস্তাব করেছিলাম। ৯৭-৯৮ বছর বয়সে পবিত্র ঈদের দিন শনিবার ইন্তেকাল করেছেন। মারা যাওয়ার আগে বেশ কয়েকবার বলেছেন, কাদের! তোমাকে দেখতে বড় ইচ্ছা করে। আমিও কথা দিয়েছিলাম কয়েকদিনের মধ্যেই তাঁর সঙ্গে দেখা করব। আর হলো না। জাতীয় দোয়া মাহফিলের জন্য কত চিঠি এবং টেলিফোন যে পেয়েছি তার হিসাব নেই। তাই আবার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি, যদি কোনো অসুবিধা না থাকে আমাদের সবাইকে নিয়ে কোনো শুক্রবার একটা জাতীয় দোয়া মাহফিলের আয়োজন করুন।

ঈদের আগের বৃহস্পতিবার পরম মিত্র সৌমেন মিত্র ৭৮ বছর বয়সে আমাদের মায়া কাটিয়ে পরপারে চলে গেছেন। খবরটা হঠাৎই পেয়েছিলাম মুন্সীগঞ্জের সিরাজ ফরাজি নামে এক ভদ্রলোকের কাছ থেকে। সাধারণত ইদানীং কোনো মৃত্যু সংবাদ খুব একটা তোলপাড় করে না। কিন্তু সৌমেন মিত্রের মৃত্যু ভীষণ নাড়া দিয়েছে। স্বাধীনতার পর ভদ্রলোককে প্রথম দেখেছিলাম ’৭২ সালে। আমরা প্রায় ১০০ জন মুক্তিযোদ্ধা জীবনে প্রথম কলকাতা সফরে গিয়েছিলাম। তখন বাঘা সিদ্দিকী ছিল ভারতের মানুষের কাছে এক আরাধ্য পুরুষ। দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় স্বাধীনতার সময় কথিকা পাঠ করে বাঙালির ঘরে ঘরে পরিচিত হয়েছিলেন। সেই দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি বাঘা সিদ্দিকী সংবর্ধনা কমিটি করেছিলেন। বড় ভালো লেগেছিল তাঁদের অভাবনীয় আতিথেয়তায়। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের উপস্থিতিতে বসশ্রী সিনেমা হলে এক সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। সেখানে প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি, সুব্রত মুখার্জি আর সৌমেন মিত্র আয়োজক ছিলেন। তখন তাঁদের ‘ত্রিরত্ন’ বলা হতো। সেই পরিচয় থেকে আমৃত্যু তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। ’৭৫-এর পর আমরা যখন সর্বহারা, দিশাহারা তখন প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি আর সৌমেন মিত্র যে সহযোগিতা করেছিলেন কোনো মায়ের পেটের ভাই ছাড়া অন্য কেউ খুব একটা করে না। প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি তাঁর এক বন্ধু সুবীর ঘোষের বাড়িতে আমাদের থাকতে দিয়েছিলেন। কলকাতায় তখন কেবল ফ্ল্যাটবাড়ির সূচনা হয়েছে। আমরা আট বা নয় তলায় সুবীর ঘোষের এলগিন রোডের বাড়িতে ছিলাম। লোকটার একসময় সুদিন ছিল। সুবীর ঘোষের বাড়ির উত্তরে ছিল বাঙালির স্বপ্নসাধ নেতাজি সুভাষ বোসের বাড়ি। বারান্দায় বসে প্রতিদিনই বাড়িটি দেখতাম আর নানা কল্পনার জাল বুনতাম। সে সময় প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির ছোট ভাইয়ের বিয়ে হয়। সে বিয়েতেও গিয়েছিলাম। কতটা যত্ন করেছিল তা বলার মতো না। একসময় প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি আর সৌমেন মিত্রের খুব একটা সদ্ভাব ছিল না। কিন্তু বাঘা দাকে নিয়ে তাঁদের কোনো দ্বন্দ্ব হয়নি। যখন যে কাজে গেছি কখনো না করেননি। কত নেতাকে সৌমেন মিত্রের বাড়িতে দেখেছি। এই যে আজ পশ্চিমবঙ্গের জগদ্বিখ্যাত মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি, তাঁকেও সৌমেন মিত্রের আমহার্স্ট স্ট্রিটের বাড়িতে দেখেছি। অজিত পাঁজা, সুব্রত মুখার্জি- কাকে দেখিনি সেখানে। শেষের দিকে সৌমেন মিত্র এবিএ গণি খানের ভাবশিষ্যে পরিণত হয়েছিলেন। গণি খান যেমন তাঁকে সন্তানতুল্য ভাবতেন, সৌমেন মিত্রও পিতৃজ্ঞানে শ্রদ্ধা করতেন। গণি খান যেদিন মারা যান, মারা যাওয়া থেকে কবর দেওয়া পর্যন্ত সৌমেন মিত্র সন্তানের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তাঁর ভাই-বোন, ভাইস্তা-ভাস্তিরা দায়িত্ব পালনে সৌমেন মিত্রের ধারেকাছেও ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে আগাগোড়া কংগ্রেসি রাজনীতির একজন উল্লেখযোগ্য মানুষ ছিলেন সৌমেন মিত্র। নিখাদ রাজনীতিক বলতে যাদের বোঝায় সৌমেন মিত্র তার অন্যতম। হয়তো তিনি মন্ত্রী হননি রাজ্যে বা কেন্দ্রে। কিন্তু তাঁর আঙ্গুল ধরে যারা রাজনীতিতে এসেছেন তাদের অনেকেই হয়েছেন। তাই মন্ত্রিত্ব দিয়ে বিচার না করে রাজনীতি দিয়ে বিচার করলে পশ্চিমবঙ্গে কয়েকজন নেতার পরই আসে সৌমেন মিত্রের নাম। স্বাধীনতার পর প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি, সুব্রত মুখার্জি, সৌমেন মিত্র ছিলেন ত্রিরত্ন। দারুণ সম্পর্ক ছিল তাঁদের। সৌমেন মিত্রের সঙ্গে কয়েক বছর আগে ঢাকায় শেষ দেখা। আমি আবার খুব একটা ক্লাব চিনি না। কোনো ক্লাবে যাই না। একবার বিএনপি আমলে গুলশান ক্লাবে গিয়েছিলাম ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির স্ত্রী দিদি শুভ্রা মুখার্জিকে বাবর রোডের বাড়ি আনতে। ঢাকা ক্লাবে গেছি দুবার। একবার ’৭৪-এর দিকে কাদেরিয়া বাহিনীর বেসামরিক প্রধান আনোয়ারুল আলম শহীদ যখন বিয়ে করেন তখন আর শেষবার সৌমেন মিত্রের সঙ্গে দেখা করতে। সেই সৌমেন মিত্র এভাবে হঠাৎ চলে যাবেন ভাবতে পারিনি। পরম প্রভু সৃষ্টিকর্তা তাঁকে স্বর্গবাসী করুন, তাঁর পরিবার-পরিজনকে বিয়োগব্যথা সইবার শক্তি দিন।

বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা হত্যা। বেশ কয়েকজন সামরিক অফিসার পত্র লিখে এ ব্যাপারে প্রতিকার চেয়েছেন, অনেকেই ফোন দিয়েছেন। সেনাবাহিনীর খুব বেশি লোকজনের সঙ্গে আমার যোগাযোগ, পরিচয় নেই। যা পরিচয় তা সবই রাস্তাঘাটে। রাস্তাঘাটে অফিসার র‌্যাংকের তেমন কেউ থাকে না, সবই সাধারণ সৈনিক, সিপাই, ল্যান্স নায়েক, হাওলদার, সুবেদার। এখন মনে হয় হাওলদার পদ উঠে গেছে। এখন নায়েক, হাওলদারদের কীসব অন্য নামে ডাকে। তাদের সঙ্গে দেখা হয় যেহেতু তারা রাস্তাঘাটে রোদবৃষ্টিতে ভিজে-পুড়ে থাকে। যখন রাস্তায় চলি তখন দেখা হয়। কারও কারও সঙ্গে কথা হয়। ওয়ান-ইলেভেনের সময় যখন প্রায় সবার ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা তখন ফুলপুরে সেনাবাহিনীর চার সিপাইর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তারা আমার গাড়ি থামিয়ে ছিল। পরিচয় পেয়ে দুজন হাতে চুমো খেয়েছিল আর দুজন বয়সে ছোট হয়েও মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে অবাক বিস্ময়ে বলছিল, ‘আজ আমাদের শুভদিন, আপনাকে দেখলাম।’ সেই সেনাবাহিনী নিয়ে কথা বলতে ভালো লাগে আবার কষ্টও হয়। পুলিশের হাতে সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর নিহত শুনতেই যেন কেমন লাগে। পুলিশ গত সাধারণ নির্বাচনে সাধারণ মানুষের মারাত্মক আস্থা হারিয়েছে। তবে এই করোনাকালে পুলিশ মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিল। করোনা না এলে যুগ যুগ চেষ্টা করেও পুলিশ তার এ ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে পারত না। আমার মনপ্রাণও ছুঁয়ে গিয়েছিল করোনায় পুলিশের কর্তব্য পালন দেখে। আত্মীয়স্বজন প্রিয়জনকে রাস্তার পাশে ফেলে গেছে পুলিশ তাকে তুলে নিয়েছে। ফেলে রাখা কত শিশুকে পিতা-মাতার মতো পুলিশ বুকে তুলে নিয়েছে- এ এক স্বর্গীয় মানবিক কর্মকান্ডের উদাহরণ। করোনায় যখন অনেক বদনাম থেকে পুলিশ বেরিয়ে এসেছিল ঠিক তখন মেজর সিনহা হত্যা হাজারো পুলিশের নিরলস পরিশ্রমে পানি ঢেলে দিয়েছে। পানি ঢালা খারাপ কিছু নয়, কিন্তু এ কাজটা চরম খারাপের পর্যায়ে পড়ে। কোনো জবাব নেই। সেনাপ্রধান ও পুলিশের আইজি বলেছেন, এ হত্যার কারণে দুই বাহিনীর ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না। কথা বলা সহজ, কিন্তু বাস্তব বড় কঠিন। এটা সত্য, হয়তো সামগ্রিক অর্থে দুই বাহিনীতে কোনো প্রভাব পড়বে না, কিন্তু সদস্যদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক যে প্রভাব পড়েছে, তা থেকে বেরিয়ে আসা খুব সহজ হবে না। গুলি করেছে পুলিশ, আসামি হয়েছে আক্রান্তরা। এখন দেখছি, এসপিও জড়িত। সব নাদানের সমাহার। এভাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একা কী করবেন। অযোগ্যদের মেলায় তিনি এক নীরব দর্শক। সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত তরুণ সদস্য গাড়ির দরজা খুলে বেরোতে বেরোতে তিন গুলি! অস্ত্র হাতে থাকলে সিনহা কি গুলি চালাতে পারত না? তার গাড়িতে ৫০টি ইয়াবা- এও কি সম্ভব? এক যুগ আগে আমাকে নিয়ে শত্রুপক্ষ কথা বলায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘তোমরা বজ্রকে নিয়ে কথা বলতে যেও না। যে জীবনে একটা সিগারেট ধরেনি তার সম্পর্কে তোমাদের কথা বলা সাজে না।’ ঠিক তেমনি মেজর সিনহার গাড়িতে ইয়াবা! সেদিন পত্রিকায় দেখলাম ওসি প্রদীপ কুমার দাশের অফিসে তদন্ত কমিটির লোকেরা ইয়াবা পেয়েছে। মাশা আল্লাহ, ওসি একখান! মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা পাওয়া গেছে। কে কত মাসোহারা দিত তার হিসাবও পাওয়া গেছে। এসব আলামত নিয়ে শেষ পর্যন্ত কী হবে আল্লাহই জানেন। কেউ মিথ্যা বললে তার সঙ্গে পারা যায় না। একজন মানুষ মিথ্যা বললে হয়তো দু-এক জনের ক্ষতি হয়। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা বিশেষ করে পুলিশ যার ওপর সমাজ দাঁড়িয়ে আছে তাদের কেউ মিথ্যা বললে বিশেষ করে একটা থানার প্রধান যদি মিথ্যা বলেন তাহলে মানুষ যাবে কোথায়? অনেক দিন ভারতে ছিলাম। সেখানে চোর পুলিশ যেমন দেখেছি তেমনি সাধু পুলিশও দেখেছি। সেখানে চোরের চেয়ে সাধুর সংখ্যা বেশি। আমাদের দেশে সৎ থাকবে কী করে। কনস্টেবলে ভর্তি হতে ১৫ লাখ লাগে। পাঁচ-ছয় বছর আগে আমি দুজনকে পুলিশে নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলাম। একজনকে নিয়েছিল, আরেকজনকে নেয়নি। মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ব্যাপারটা বলায় তিনি কঠিনভাবে নির্দেশ দিয়েছিলেন আমার অনুরোধ রক্ষা করতে। কিন্তু করেনি। পরে শুনেছি, আমার অনুরোধের বাইরে যাকে নিয়েছে সে জমি বিক্রি করে ২৫ লাখ দিয়েছে। ২৫ লাখের কাছে কারও অনুরোধ কী করে টিকবে! একবার রোডস অ্যান্ড হাইওয়েজের এক এসডিইর বদলি নিয়ে যোগাযোগ সচিব রেজাউল হায়াতকে অনুরোধ করেছিলাম। ভদ্রলোক বলেছিলেন, আচ্ছা হয়ে যাবে। এক দিন-দুই দিন-সপ্তাহ-মাস পেরিয়ে ছয় মাস। হঠাৎ রেজাউল হায়াতের সঙ্গে দেখা। বলেছিলাম, কী হলো! আমার লোকটার বদলি হলো না? ভদ্রলোক আসমান থেকে পড়েছিলেন। পরদিন অফিসে গিয়েই ফোন, ‘কাদের ভাই! আমি বড় লজ্জিত। আপনার অনুরোধটি রাখা হয়নি। আমি আবার আপনাকে ফোন করব।’ মাস দুই-আড়াই পর রেজাউল হায়াতের ফোন, ‘কাদের ভাই! কাল আমার সঙ্গে দুপুরে খাবেন।’ বলেছিলাম, আমি তো বাইরে খাই না। বউয়ের হাতের রান্না খেয়ে ধন্য হই। বলেছিলেন, ‘আপনার ভাবি রান্না করে দেবেন, আমরা দুই ভাই খাব। কথা আছে।’ গিয়েছিলাম পরদিন। খাবার খেতে খেতে ভদ্রলোক বলেছিলেন, ‘আপনার লোক দুই দিন আগে সে জায়গায় বসেছেন শুনেছেন কি?’ বলেছিলাম, না, শুনিনি। তিনি বললেন, ‘বাড়ি গেলেই শুনবেন।’ তারপর যা বললেন তা শুনে অবাক না হয়ে পারিনি। তিনি বললেন, ‘কাদের ভাই! বদলিটদলি এ তো নিয়মিত কাজ। এমনিতেই করি। সম্মানি কেউ বললে আমরা খুশি হয়ে করি। আপনার ব্যাপারটাও সহজ ভেবে বলেছিলাম হয়ে যাবে। কিন্তু আপনার লোকের জায়গায় যিনি গিয়েছিলেন তিনি জায়গামতো ২ লাখ দিয়েছিলেন। টাকা দেওয়ার আগে আমি বলতে পারলে হয়তো হয়ে যেত। টাকা কোনো কাজে আসত না। কিন্তু শুধু টাকা দেওয়াই নয়, যাকে যাকে দিলে হয় টাকাটা তাকে তাকে দিয়ে ভাগ-বাটোয়ারা করে ফেলেছিল। টাকা না নেওয়া এক কথা, টাকা নিয়ে খরচ করে তা বাক্স থেকে বের করা সে তো আরেক কথা। তাই একটু দেরি হয়ে গেল।’ সে আমার এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা। ভদ্রলোক মারা গেছেন। আল্লাহ তাঁকে বেহেশতবাসী করুন। এখন টাকা ছাড়া কিছু হয় না- এটা যখন শুনি তখন মরে যেতে ইচ্ছা করে। তাই বলছি, সাধু সাবধান! সিনহা হত্যা ছোট করে দেখলে চলবে না। সরকারকে অপ্রিয় করার এও এক গভীর ষড়যন্ত্র হতে পারে। তবে সরকারের কাছে অনুরোধ করব, ক্রসফায়ারের কারণে কাউকে বাহাদুরি নয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে কারও জীবনহানি হলে সেটা কঠোরভাবে দেখতে হবে। জীবনহানি কোনো শুভ কাজ নয়। আল্লাহতায়ালা সুরা মায়েদায় বলেছেন, ‘যে হত্যা করে, যে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করে তাকে ছাড়া অন্য কাউকে হত্যা করলে সে যেন সারা জাহানকে হত্যা করল। আর কোনো একজনকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাল তেমনি সে যেন বিশ্বমানবতাকে বাঁচাল।’ তাই ইচ্ছা হলেই কাউকে মেরে ফেলা এর চেয়ে জঘন্য অন্যায় আর কিছু নেই। হত্যা করা সহজ, জীবন দেওয়া কঠিন। শুনেছি, মেজর সিনহার গায়ে ছয়টি গুলির দাগ পাওয়া গেছে। তাহলে কি মেজর সিনহা মারা যাওয়ার পরও তার গায়ে গুলি করা হয়েছে? এ নিষ্ঠুরতা কেন? বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে গিয়ে সেনাবাহিনী থেকে বহিষ্কৃত কিছু সিমার এমনি করে গুলি করেছিল। কারও গায়ে ২৫-৩০টা, কারও মাথার খুলি থেকে মগজ গিয়ে দেয়ালে লেগেছিল। এ কি তারই আলামত? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী! ব্যাপারটা দেখবেন। ভালোভাবে দুই চোখ খুলে দেখতে পেলে আপনারই লাভ হবে। আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হলে আমরা যেমন লাভবান হব, তেমনি আপনিও হবেন। সেদিন ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘আগস্ট এলে নেত্রীর জন্য শঙ্কা জাগে।’ শুধু আগস্টে নয়, আপনাকে নিয়ে সব সময় শঙ্কায় থাকি। কারণ সব ক্ষেত্রেই লাগামহীন, কে লাগাম ধরবে? দয়া-মায়া, বিবেক-বিবেচনা সব কেমন যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। মানবিক বাঙালি আজ মানবতার নিম্নসীমায় নেমে এসেছে। মেজর সিনহার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। আর তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। আল্লাহ তাকে বেহেশতবাসী করুন।

লেখক : রাজনীতিক।

www.ksjleague.com


আপনার মন্তব্য