শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৭ অক্টোবর, ২০২০ ২৩:১৯

রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে বাধ্য করতে হবে

খায়রুল কবীর খোকন

রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে বাধ্য করতে হবে

চীন ও অন্য বিশ্বমোড়লদের ‘নিজ নিজ রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির স্বার্থে দেওয়া’ সমর্থনে মিয়ানমারের নিষ্ঠুর সামরিক বাহিনী রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রায় ২৫ লাখ মানুষকে চিরতরে উচ্ছেদের লক্ষ্যে (এথনিক ক্লিনজিং) জঘন্যতম এক ‘ক্র্যাকডাউন’ চালিয়েছে। তিন বছর আগে ২০১৭ সালের আগস্টের শেষ প্রান্তে হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয় এবং হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী ও শিশুকে ধর্ষণ ও গণধর্ষণ করা হয়, হাজার হাজার বাড়িঘর পুড়িয়ে রোহিঙ্গা গ্রামগুলোকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হয়। হিউম্যানরাইটস ওয়াচের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ৫৫টি রোহিঙ্গা গ্রামকে এমনভাবে নিশ্চিহ্ন করে সেসব জায়গায় সামরিক স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে যে, ওইসব গ্রামের বাসিন্দারা তা দেখলে নিজের বাড়িঘরের ‘ভূমিভিটা’ বলে চিহ্নিতই করতে পারবে না।

রোহিঙ্গা মুসলিমদের মিয়ানমার রাষ্ট্র থেকে পুরোপুরি নির্মূল করাই বর্মী সামরিক বাহিনীর মূল উদ্দেশ্য। সবচেয়ে দুঃখজনক, মিয়ানমারে সামরিক বাহিনীর স্বৈরতন্ত্র থেকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে ‘লড়াকু ভূমিকার’ জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত মিয়ানমার নেত্রী অং সান সু চি বিবেক বিসর্জন দিয়ে এসব বর্বরতার বিরুদ্ধে মুখ বন্ধ করে রেখে নীরব সমর্থন দিয়ে এসেছেন, এবং প্রকাশ্য সমর্থন দিয়েই রোহিঙ্গা মুসলিমদের নাগরিকত্ব লাভের বিরুদ্ধে এবং মিয়ানমার রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষার দোহাই পেড়েছেন। মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর নিষ্ঠুরতা ও অনাচারের পক্ষে তার এ সমর্থন রোহিঙ্গা মুসলিম নিধনযজ্ঞে ও জাতিগত উচ্ছেদে শতভাগ সহায়তাদানের শামিল। ‘গণতন্ত্রের নেত্রী’ হিসেবে পাওয়া নোবেল পুরস্কারটিকে সর্বাধিক অসম্মান করেছেন অং সান সু চি। নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে যা সবচেয়ে জঘন্য ঘটনা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। সারা দুনিয়ার মানুষ, বিশেষভাবে গণতন্ত্রকামী ও মানবাধিকার সংগ্রামী মানুষ এর প্রবল প্রতিবাদ করেছেন, সু চির অনেক সম্মাননা প্রত্যাহার করেছে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়সহ বহু প্রতিষ্ঠান। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশের রাজপথে মিছিল সমাবেশে নিন্দার ঝড় উঠেছে। তার পরও অং সান সু চির এতটুকু লজ্জার বালাই নেই, তিনি রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপরে নিপীড়নের বিরুদ্ধে কথা তো বলছেনই না, উল্টো নিপীড়িত মানুষগুলোর বিরুদ্ধে বিভিন্ন রকম অভিযোগ তুলে আরও খারাপ ভূমিকা রাখার তৎপরতায় লিপ্ত।

আর সে লক্ষ্য বাস্তবায়নের পক্ষে মিয়ানমার সামরিক-বেসামরিক সরকারের প্রধান সমর্থক শক্তি হচ্ছে নয়া সাম্রাজ্যবাদী ও নয়া উপনিবেশবাদী চীন, সুবিধাবাদী রাশিয়া, ভারত আর জাপান এবং আরও কোনো কোনো বিশ্বমোড়ল রাষ্ট্র। তারা সবাই রোহিঙ্গা মুসলিমদের জন্মভূমি মাতৃভূমি রাখাইন প্রদেশটিকে নিজ নিজ শিল্প বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজে লাগিয়ে বিপুল অর্থ-সম্পদ অর্জনে আগ্রহী; শুধু আগ্রহী বললে ভুল বলা হয়, বলা উচিত ‘লোভাতুর, লালসা-বর্বর’, প্রবলভাবে। তাতে তাদের বাড়তি অর্থ-সম্পদ লাভ হবে, রাখাইনের সেই ভূমিতে রোহিঙ্গারা থাকলে সেখানে বিপুল শিল্প বিনিয়োগ কর্মকান্ড সহজে চালানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে। তাই তো তাদের চিরতরে উচ্ছেদে এসব বিশ্বমোড়ল একসঙ্গে মিয়ানমার সরকারের পক্ষে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশে ২০১৭ সালের আগস্টের আগে অবধি (১৯৭৮ সাল থেকে শুরু করে পরবর্তী বছরগুলোয়) পুরনো রোহিঙ্গা মুসলিম আশ্রয়হীন (মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত) মানুষ ছিল প্রায় সাড়ে ৩ লাখ। আর ওই আগস্টের ২৫ তারিখের পরে থেকে মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত নতুন যোগ হওয়া রোহিঙ্গা মুসলিমের সংখ্যা দঁাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ। তারপর এ তিন বছরে উচ্চ জন্মহারের রোহিঙ্গা পরিবারগুলোয় নতুন শিশু জন্মেছে প্রায় ১ লাখ। এই মোট ১২ লাখ বিতাড়িত মানুষ বাংলাদেশের ভূখন্ডে আশ্রয় নিয়ে প্রায় তিন বছর ধরে এক মারাত্মক সংকট সৃষ্টি করেছে। সারা বিশ্বে এখন রোহিঙ্গা মুসলিম সমস্যা একটা ভয়ানক সংকট হিসেবে সবার মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু চীন, ভারত, রাশিয়া আর জাপানের মতো বিশ্বমোড়লরা এ ব্যাপারে নির্বিকার। রোহিঙ্গা মুসলিমের এখনকার জনসংখ্যা প্রায় ২৫ লাখ, তার মধ্যে প্রায় ১২ লাখ এখন বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে অবস্থান করছে। প্রায় ৭ লাখ পাকিস্তান, সৌদি আরবসহ বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রে আশ্রয় নিয়েছে বা ‘বিশেষ ইমিগ্রেশন’ সুযোগ লাভ করেছে। এখনো মিয়ানমারের রাখাইন ও অন্যান্য প্রদেশে রয়েছে প্রায় ৬ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম। তারা নিদারুণ অসহায় দশায়, মিয়ানমার ও স্বৈরাচারী সরকারের নির্মম নিপীড়নের শিকার। রোহিঙ্গা মুসলিম গোষ্ঠীটির লোকজন পিছিয়ে থাকা মানুষ, তাদের ৮০ শতাংশের বেশি নিরক্ষর। লেখাপড়া ওদের সংস্কৃতিতে অনুপস্থিত, ওরা ধর্মীয় মৌলবাদী চরিত্রের এবং আধুনিক লেখাপড়াকে ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখে। আর সুদীর্ঘকাল ধরে মিয়ানমার সরকার ওদের নিরক্ষর রাখার ব্যবস্থা করে আসছে। আসলে বৌদ্ধ সাম্প্রদায়িকতাবাদীরা শত শত বছর ধরেই ‘মগ দস্যু’র মতো আচরণ করে এসেছে রোহিঙ্গা মুসলিমদের সঙ্গে। আর রোহিঙ্গা মুসলিমরা কেবল জন্মহার বাড়াচ্ছে। ধর্মান্ধতা ও কূপমন্ডুকতার অপসংস্কৃতির শিকার ওরা, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ বা পরিবার পরিকল্পনা ওদের বোধের অগম্য। ওদের মতে, ‘সৃষ্টিকর্তা জীবন দেন মানুষের, তিনিই তাদের সবার খাওয়া-পরার ব্যবস্থা করবেন, জন্মনিয়ন্ত্রণের কোনো দরকার নেই।’ এসব অসংস্কৃত, নিরেট-মগজ, নিরক্ষর, পিছিয়ে থাকা রোহিঙ্গা মুসলিমদের এ কারণেই মিয়ানমারের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা তাদের ‘আধা পয়সার’ মূল্য দেয় না, সভ্য মানুষই মনে করে না। বৌদ্ধ শাসকগোষ্ঠী শত শত বছর ধরে আরাকানি রোহিঙ্গা মুসলিমদের অশিক্ষিত ও অসংস্কৃত বানানোর সুপরিকল্পিত চক্রান্ত চালিয়ে তা সফল করেছে। ফলে স্কুল-কলেজ সুবিধাদির সীমাবদ্ধতায় আর কূপমন্ডুক মানসিকতায় আক্রান্ত হওয়ার কারণে রোহিঙ্গা মুসলিমরা একেবারেই ‘অশিক্ষিত, নিরক্ষর ও অসংস্কৃত’ ধরনের পিছিয়ে-পড়া জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। তারা নিতান্তই অপাঙ্ক্তেয় জনসমাজের অন্তর্র্ভুক্ত। পাকিস্তানি তালেবান গোষ্ঠীসহ মধ্যপ্রাচ্যের কিছু মতলববাজ গোষ্ঠী ও রাষ্ট্র এদের সব অপকর্মের পেছনে উসকানি দেয় এবং তাদের ভূরাজনৈতিক চক্রান্তের স্বার্থে ব্যবহার করে।

বেকারত্ব ও উপার্জনের ভালো উপায় না থাকায় রেহিঙ্গাদের মধ্যে জীবিকার তাগিদেও অপরাধপ্রবণতায় জড়ানোর ঘটনা প্রচুর। এত অপরাধীর জন্যই তাদের সমাজটাও ‘অচ্ছুৎ’-এ রূপ নিয়েছে। বস্তুত মিয়ানমারের সামরিক জান্তা মগ দস্যুসুলভ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে রোহিঙ্গা মুসলিমদের মিয়ানমার রাষ্ট্র থেকে ‘জাতিগত-নির্মূলকরণ’ চায়। আর রাখাইন প্রদেশের ভূমির প্রয়োজন পড়েছে চীন ও অন্যসব বিশ্বমোড়লদের। তাদের লালসার কুদৃষ্টিতে পড়েছে সেই ভূমি। সেটা ব্যবহার করে তারা নতুন নতুন শিল্পকারখানা গড়ে তুলতে চায়, নতুন যোগাযোগের সড়ক তৈরি করতে চায় ইয়াঙ্গুন সমুদ্রবন্দরটিকে সংযুক্ত করার লক্ষ্যে। সেখানে গভীর সমুদ্রবন্দর সুবিধা ব্যবহার করতে চায় চীন। চীন যেহেতু নয়া উপনিবেশবাদী ও নয়া সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে মিয়ানমারকে এক প্রকার ‘দখলে’ নিয়ে নিয়েছে, তার অনুসরণে ভারত, রাশিয়া ও জাপান এসব বৃহৎ পুঁজির মোড়লেরা রাখাইন প্রদেশে চীনের বিনিয়োগের পাশাপাশি নিজ নিজ রাষ্ট্রের শিল্প বিনিয়োগের প্রচেষ্টায় উন্মাদপ্রায়।

১৯৭৮ সালে রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর মিয়ানমার সেনারা নির্যাতন চালিয়ে বাংলাদেশের সীমানার মধ্যে ঢুকিয়ে দেয় প্রায় ২ লাখ নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। বছর দুইয়ের মধ্যে তৎকালীন সরকারের দূরদর্শী ও বহুমুখী কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় তাদের প্রায় ৬০ শতাংশকে ফিরিয়ে নিয়েছিল মিয়ানমার সরকার। বাকি থাকে আরও প্রায় ৮০ হাজার রোহিঙ্গা।

বাংলাদেশ সরকারের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো. তৌহিদ হোসেন দীর্ঘকাল রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানের প্রক্রিয়ায় কর্মতৎপর ছিলেন, তার রোহিঙ্গা সংকটের সুরাহাপন্থার ব্যাপারে বিশাল অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি ২৫ আগস্ট দৈনিক প্রথম আলোয় প্রধান উপসম্পাদকীয় নিবন্ধে গভীর বিশ্লেষণমূলক পর্যালোচনা করেছেন। ‘রোহিঙ্গা সমস্যায় কী করবে বাংলাদেশ’ শীর্ষক এ নিবন্ধটিতে তিনি পুরো সমস্যার পর্যালোচনা করে মিয়ানমারের ভিতরে রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য একটা ‘সেইফ জোন’ (নিরাপদ অঞ্চল) গড়ে তুলে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের উদ্যোগে পশ্চিমা দেশগুলোর সমর্থন পাওয়ার প্রচেষ্টা চালানোর সুপারিশ করেছেন। তবে তিনিও চীন ও রাশিয়ার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমার সমর্থক ভূমিকার ব্যাপারে শঙ্কা প্রকাশ করেন।

আসলে চীন চাইলে মিয়ানমার ‘বাপ বাপ’ করে রোহিঙ্গা মুসলিম উদ্বাস্তুদের ফিরিয়ে নিয়ে পুনর্বাসনে বাধ্য হবে। বিগত তিন বছরে রোহিঙ্গা সংকট ঘনীভূত হতে থাকায় বেশ কয়েকজন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ সরকারকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন সহায়তা এমনকি মিয়ানমারকে সামরিকভাবে ধমকি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন বারবার। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার তাতে কান দেয়নি। ‘সোজা আঙ্গুলে ঘি উঠবে না’, তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরাশক্তিসুলভ ক্ষমতা এখানে প্রয়োগ করাতেই হবে, ‘বিশ্বশান্তির স্বার্থেই এটুকু অশান্তি করতে হবে’ বাংলাদেশকে। এ ছাড়া মিয়ানমার আর তার বড় ভাই সমর্থকরা কোনো রাস্তা খোলা রাখেনি বাংলাদেশের জন্য- তা এ তিন বছরে প্রমাণিত হয়েছে।

লেখক : বিএনপির যুগ্মমহাসচিব, সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক ডাকসু সাধারণ সম্পাদক।


আপনার মন্তব্য