শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ১২ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১১ এপ্রিল, ২০২১ ২৩:১১

স্বাস্থ্য

করোনা নিয়ন্ত্রণে কী করব

ডা. লেলিন চৌধুরী

করোনা নিয়ন্ত্রণে কী করব
Google News

করোনা নিয়ন্ত্রণের মূল স্তম্ভ হলো দুটি। একটি হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি মানা এবং অন্যটি হলো চিকিৎসা দেওয়া। মাস্ক পরা,  নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়া ও দুজন মানুষের মধ্যে তিন থেকে চার ফুট দূরত্ব বজায় রাখাকে একত্রে স্বাস্থ্যবিধি বলা হয়।

দীর্ঘ এক বছরের বেশি সময় ধরে মানুষ করোনাকে মোকাবিলা করে চলছে। তাদের মধ্যে এক ধরনের গভীর মানসিক ক্লান্তি তৈরি হয়েছে। ক্লান্তি ও হতাশা থেকে জন্ম নেয় এক ধরনের বেপরোয়া মনোভাব। একই সঙ্গে তৈরি হয় ‘যা থাকে কপালে তাই হবে’ ধরনের নিয়তি-নির্ভরতা। তাই কঠোর বা কোমল কোনো ধরনের বিধিনিষেধ মানতে মানুষ আগ্রহী নয়। তারা খাবার জোগাড় করার ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। সেটাই স্বাভাবিক। ‘লকডাউন’ হচ্ছে করোনা নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কঠোর ধাপ বা অস্ত্র। তীব্র সংক্রমণের সময় রোগবিস্তারের লাগাম টেনে ধরতে লকডাউন আরোপ করা হয়। এটি একটি সাময়িক পদক্ষেপ। তবে স্বাস্থ্যবিজ্ঞান অনুযায়ী করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে কমপক্ষে দুই সপ্তাহের লকডাউন দিতে হয়।

মাস্ক পরাসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মানতে মানুষের প্রবল অনীহা। মনে রাখতে হবে স্বাস্থ্যবিধিতে যা করতে বলা হয়েছে তা মানুষের জন্য একেবারে নতুন। নতুন কোনো কিছুতে লোকজন সহজে অভ্যস্ত হতে চায় না। এ জন্য তাকে উৎসাহিত ও উদ্বুদ্ধ করতে হয় এবং একই সময়ে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বাধ্য করতে হয়। এ দুটির কোনোটাই আমাদের এখানে সঠিকভাবে পালন করা হয়নি। এক্ষেত্রে আমার প্রস্তাব হচ্ছে-(১) স্থানীয় একজন মান্যজনকে প্রধান করে প্রতিটি পাড়া, মহল্লা ও এলাকায় ‘গণতদারকি কমিটি’ গঠন করা হোক। এ কমিটি তিন-চারজনের দলে বিভক্ত হয়ে প্রতিটি বাসায় বা বাড়িতে গিয়ে মাস্ক পরাসহ স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রয়োজনীতা ও বাধ্যবাধকতার কথা জানাবে। জাতীয় বা স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময় যেমন করা হয়। এরপর মাস্ক ছাড়া কেউ বাসা বা বাড়ি থেকে বের হলে তাকে ধরে বাসায় ফিরিয়ে দেওয়া হবে। পাড়া বা মহল্লার মানুষ সবাই সবাইকে অন্তত মুখে চিনে। বাইরের কেউ মাস্ক ছাড়া মহল্লায় বা পাড়ায় ঢুকতে চাইলে তাকে ফেরত পাঠানো হবে। এ প্রয়াসের সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি অবশ্যই যুক্ত থাকবে। প্রশাসন ও পুলিশ এ কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে। (২) আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে মাঠে নামিয়ে দেওয়া হোক। রাস্তাঘাট, শপিং মল, মার্কেট, অফিস ইত্যাদি জায়গায় কাউকে মাস্কবিহীন দেখলে তাকে শাস্তির আওতায় আনা হবে। শাস্তিটা দৃষ্টান্তমূলক হবে।

করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য যা করা যেতে পারে- (১) করোনার টেস্টকে সহজলভ্য করা দরকার। এ জন্য ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে প্রচুরসংখ্যক ‘নমুনা সংগ্রহ কেন্দ্র’ স্থাপন করা প্রয়োজন। সরকারিভাবে পরীক্ষার ফি বাতিল করা অতি আবশ্যক। (২) প্রতিটি হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ‘জরুরি অক্সিজেন কেন্দ্র’ স্থাপন করা দরকার। করোনা রোগীর জন্য জীবনরক্ষাকারী একটি ওষুধ হচ্ছে অক্সিজেন। সাধারণ সিলিন্ডারের অক্সিজেন রোগীকে প্রতি মিনিটে ১৫ লিটার দেওয়া যায়। এ জন্য শুধু একটি বিশেষ মাস্ক ব্যবহার করতে হয়। অন্তত ৫০%-র বেশি রোগীকে ১৫ লিটার/মিনিট অক্সিজেন দিয়ে সাধারণত চিকিৎসা দেওয়া যায়। যেসব হাসপাতালে কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ লাইন রয়েছে সেখানে ‘হাইফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা’ স্থাপন করতে হবে। এ ক্যানুলা দিয়ে যন্ত্রভেদে ৬০ থেকে ৮০ লিটার/মিনিট অক্সিজেন রোগীকে দেওয়া যায়। এতে তীব্রভাবে ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া রোগীর অধিকাংশকে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। এ যন্ত্রটি রোগীর শয্যার পাশে স্থাপন করা যায়। কিছু জটিল রোগীর জন্য নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউর প্রয়োজন হয়। যতটা সম্ভব আইসিইউর শয্যা বাড়ানো দরকার। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালভেদে অক্সিজেন সিলিন্ডার ও হাইফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলার জোগান শর্তসাপেক্ষে সরকার সরবরাহ করবে। (৩) ‘জরুরি মোবাইল মেডিকেল টিম’ গঠন করা আশু প্রয়োজন। মৃদু ও মধ্যম আক্রান্ত রোগীদের বাড়িতে থাকতে বলতে হবে। এদের কারও জরুরি প্রয়োজন হলে মোবাইল টিমকে ‘জরুরি বার্তা’ পাঠাবে। বাড়িতে গিয়ে রোগীকে দেখে পরবর্তী  সিদ্ধান্ত নেবে। প্রয়োজনে রোগীকে অক্সিজেন কেন্দ্র বা হাসপাতালে পাঠাবে। প্রয়োজন হলে রোগী নিজেও অক্সিজেন কেন্দ্রে যাবে। (৪) এরপরেও রোগীর স্থান সংকুলান করা না গেলে সশস্ত্র বাহিনী ও রেডক্রিসেন্টের মাধ্যমে ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপন করা।

প্রস্তাবকৃত এ পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নের সঙ্গে লকডাউনসহ অন্য যেসব পদক্ষেপ কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করবে সেগুলো  অবশ্যই সফল করতে হবে।

লেখক : জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।