শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২২ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২১ এপ্রিল, ২০২১ ২২:৪৪

চিকিৎসক এবং পুলিশ কান্ড কিছু বলা কঠিন, চুপ থাকাও অসম্ভব

শহীদুল্লাহ ফরায়জী

চিকিৎসক এবং পুলিশ কান্ড কিছু বলা কঠিন, চুপ থাকাও অসম্ভব

করোনার ভয়াবহ দুর্দিনে দিনদুপুরে প্রকাশ্যে চিকিৎসক এবং পুলিশের বাকবিতন্ডার মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃত আচরণবিধি, শৃঙ্খলা, দায়িত্ব ও কর্তব্য, আত্মমর্যাদাবোধ এবং অসহিষ্ণুতা- অগভীরতার যে বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তাতে দেশবাসী খুবই উদ্বিগ্ন। উভয় পক্ষের পরিশীলিত জ্ঞানগর্ভ বয়ান ও মতাদর্শিক অবস্থানে দেশবাসী বিচলিত।

মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধার গৌরবময় অর্জনকে যে কোনো ইস্যুতে ব্যবহার করে মুক্তিযুদ্ধের মহত্ত্বকে ধূলিসাৎ করার অর্বাচীন প্রবণতা আমাদের অত্যন্ত মর্মাহত করেছে। আমাদের অর্জনগুলোকে আমরাই ধ্বংস করে ফেলেছি। এগুলো ন্যায় ও সদাচারের পরিপন্থী, ন্যায্য সমাজ গঠনের অন্তরায়। সমাজ থেকে নৈতিকতার চিহ্ন মুছে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টায় আমরা নিয়োজিত।

ঘটনার পরবর্তীতে করোনা মোকাবিলার সম্মুখযোদ্ধা দুটি সরকারি সংস্থা পরস্পরের বিরুদ্ধে অসহযোগিতা কটাক্ষ হয়রানি কটূক্তিসহ বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন এবং সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায্যতার বিচার চেয়ে গণমাধ্যমে বিবৃতি প্রদান করায় প্রমাণিত হয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও ন্যায্যতা এবং যুক্তি প্রয়োগে চরম ঘাটতি রয়েছে। এগুলো আমাদের দীর্ঘদিনের আধিপত্য, নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমতাকেন্দ্রিক অপশাসন ও অপসংস্কৃতির নিদর্শন। এসব চরম অবক্ষয়প্রাপ্ত সমাজের প্রতিফলন, দুর্দিনের প্রতীক।

এসব প্রশ্নে নীরবতা পালন না করে যুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণ করা জরুরি।

এসবকে শুধু তাৎক্ষণিক ঘটনার প্রতিক্রিয়া বা একপেশে মনোভাবে যাচাই বা কারও প্রশংসা বা নিন্দা করার বিষয় হিসেবে দেখলে তা আরও বড় ধরনের মারাত্মক বিপর্যয় বহন করে আনবে যা সবার পক্ষে ভয়ংকর হয়ে উঠবে।

সরকারি দুটি সংস্থার উচ্চতর পর্যায়ের কর্মকর্তা বা কর্মচারীরা যদি রাষ্ট্রের অন্য সংস্থার কাছে সুরক্ষা না পায় তাহলে প্রজাতন্ত্রের সাধারণ নাগরিকদের অবস্থা কোন পর্যায়ে আছে তা সহজেই অনুমেয়। সুতরাং বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা জনগণের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার সহায়ক নয়।

আইনের শাসন বিদ্যমান না থাকলে, গণতান্ত্রিক, মানবিক, নৈতিক ও সংস্কৃতি চর্চা না থাকলে শুধু দেশের জনগণ নয় সবাই যে অনিরাপদ এবং মর্যাদা বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে তা রাষ্ট্রের সব পক্ষকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে। নিজেকে রক্ষা করার যে ন্যূনতম সংস্কৃতিটুকু থাকা দরকার তা আজ আমাদের বিলীন হয়ে যাচ্ছে। আইনের শাসন, গণতন্ত্র ও নৈতিক পরিসরকে সংকুচিত করে আমাদের রাষ্ট্র সামনে এগোতে পারবে না। আমাদের গণতন্ত্র, ন্যায্যতা, সমতা ও স্বাধিকারকে প্রণোদিত ও উৎসাহিত করেই মুক্তিযুদ্ধের রাষ্ট্রকে বিনির্মাণ করতে হবে।

অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত অমর্ত্য সেন তাঁর নীতি ও ন্যায্যতা বইয়ের ভূমিকায় লিখেছেন, ১৭৮৯ সালের ৫ মে রাজনৈতিক দর্শনের পন্ডিত এবং সুবক্তা এডমন্ড বার্ক লন্ডনে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বলেছিলেন ‘একটি ঘটনা ঘটেছে এমন ঘটনা তা নিয়ে কিছু বলা কঠিন এবং চুপ করে থাকা অসম্ভব’।

ওয়ারেন হেস্টিংয়ের ইমপিচমেন্টের পক্ষে সওয়াল করতে বার্ক বলেছিলেন, তিনি ন্যায্যতার শাশ্বত বিধানগুলো লঙ্ঘন করেছেন এটাই তার মূল অপরাধ এবং সে কারণেই এ বিষয়ে নীরব থাকা অসম্ভব। উৎকট অন্যায়ের অনেক দৃষ্টান্তই আমাদের এতটাই বিচলিত করে যে আমরা ক্ষোভ বা প্রতিবাদ জানানোর ভাষা খুঁজে পাই না অথচ চুপ করে থাকা অসম্ভব মনে হয়। তবু মানতেই হবে ন্যায্যতার বিচার করতে গেলে সুস্পষ্ট ভাষায় যুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণ ছাড়া অন্য উপায় নেই।

এডমন্ড বার্ক ওয়ারেন হেস্টিংসকে অভিযুক্ত করেছিলেন এবং কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিলেন ভারতের উদীয়মান ব্রিটিশ শাসনকেও। এ অভিযোগের সমর্থনে বার্ক পেশ করেছিলেন এক নয় একাধিক স্বতন্ত্র যুক্তি : আমি শ্রীযুক্ত ওয়ারেন হেস্টিংসকে গর্হিত এবং অসদাচরণের একাধিক দায়ে অভিযুক্ত করছি। আমি পার্লামেন্টে সমবেত গ্রেট ব্রিটেনের নাগরিকদের প্রতিনিধিমন্ডলীর আশা ভঙ্গ করার অভিযোগে পার্লামেন্টের নামে তাকে অভিযুক্ত করছি।

আমি গ্রেট ব্রিটেনের সব নাগরিকের জাতীয় চরিত্রকে অসম্মানিত করার অভিযোগে তাকে অভিযুক্ত করছি।

আমি ভারতের মানুষের নামে তাকে অভিযুক্ত করছি কারণ তিনি তাদের বিধি অধিকার এবং স্বাধীনতা খর্ব করেছেন, তাদের সম্পদ ধ্বংস করেছেন এবং তাদের দেশভূমির ক্ষতিসাধন করেছেন।

তিনি ন্যায়ের যে শাশ্বত বিধানগুলোকে লঙ্ঘন করেছেন তাদের নামে এবং তাদের ভিত্তিতে আমি তাকে অভিযুক্ত করছি।

তিনি নির্মমভাবে স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে বয়স, পদমর্যাদা, পরিস্থিতি এবং জীবনের অবস্থানির্বিশেষে মানবিকতার লাঞ্ছনা করেছেন, তাকে আঘাত করেছেন, তার ওপর অত্যাচার করেছেন তাই মৌলিক মানবিকতার নামে আমি তাকে অভিযুক্ত করছি।

নৈতিক চেতনাসমৃদ্ধ রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা এবং গভীর মানবিক সংস্কৃতিমনস্ক সমাজের আশায় আমাদের আর কতকাল অপেক্ষা করতে হবে।

লেখক : গীতিকার।

[email protected]