শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৩ জুন, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২ জুন, ২০২১ ২৩:১৮

পল্লী বিদ্যুতের নতুন চ্যালেঞ্জ অফ-গ্রিড

মো. আবুল হাসান

Google News

দেশে শতভাগ বিদ্যুতায়নের লক্ষ্যে ২০১৪ সাল থেকে শতভাগ বিদ্যুতায়ন (ডিএনই) প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড একের পর এক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে যাচ্ছে। ওই প্রকল্প সমাপনান্তে দেশের মোট ৪ কোটি গ্রাহকের মধ্যে পল্লী বিদ্যুতের ৩ কোটি ১২ লাখ গ্রাহককে (৭৮%) বিদ্যুৎ সরবরাহের মাধ্যমে দেশের ৯৯.৫% গ্রাহককে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। কিছু কিছু নদী ও সাগর বক্ষের প্রায় ১৫ লাখ মানুষকে বিদ্যুৎ দিতে না পারলে মুজিববর্ষেই শতভাগ বিদ্যুতায়নের মূল লক্ষ্য অপূর্ণ থেকে যাবে। এ লক্ষ্য অর্জনে পল্লী বিদ্যুৎকে আবারও অফ-গ্রিড এলাকায় বিদ্যুতায়নের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হয়েছে। ইতিমধ্যে সোলার হোমস সিস্টেমের মাধ্যমে কিছু কিছু অফ-গ্রিড এলাকায় আবাসিক ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলেও কৃষিতে সেচ, শিল্প ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের সঙ্গে সংযুক্ত করা সম্ভব না হলে চরাঞ্চলের অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে কখনই উন্নয়নের মহাসড়কে যুক্ত করা যাবে না।

কিন্তু সাগর কিংবা নদীর তলদেশ দিয়ে সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপন করে কোনো দ্বীপ কিংবা চরাঞ্চলের অফ-গ্রিড এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা কারিগরি ও আর্থিকভাবে দুরূহ একটি কাজ। ইতিপূর্বে চীনের কারিগরি সহায়তায় সাগরদ্বীপ সন্দ্বীপে সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপন করে বিদ্যুৎ সরবরাহের নজির থাকলেও নদীমাতৃক বাংলাদেশের অসংখ্য নদীর পলিবাহিত চরে গড়ে ওঠা ভাগ্যহত জনগণের ঘরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা শুধু কঠিনই নয়, অধিকতর চ্যালেঞ্জিংও। অবশেষে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড এবং তার ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ‘শেখ হাসিনার উদ্যোগ ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ’ কর্মসূচি বাস্তবায়নকল্পে দেশের সমগ্র চরাঞ্চল তথা অফ-গ্রিড এলাকায় বিদ্যুতায়নের সেই দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের ছোটবড় প্রায় ৭০০ নদ-নদী থাকলেও পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, তেঁতুলিয়া, বলেশ্বর, বিশখালী প্রভৃতি নদ-নদীর মধ্যে জেগে ওঠা ২২১টি ইউনিয়ন যা দেশের মোট ৪৫৭১টি ইউনিয়নে প্রায় ৫ শতাংশ এলাকায় প্রায় ১৫ লাখ মানুষ বসবাস করে। তাদের গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত করতে হলে সেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এর মধ্যে প্রথমত নদীর তলদেশে সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপন এবং তার নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা। দ্বিতীয়ত নদীর দুর্গম এলাকায় যেখানে এখনো কোনো রাস্তাঘাট গড়ে ওঠেনি, চর এলাকায় পলিবাহিত হালকা মাটিতে বৈদ্যুতিক লাইন স্থাপন এবং তা রক্ষণাবেক্ষণ। তৃতীয়ত বর্ষা যখন দুই কূল ছাপিয়ে সমগ্র এলাকা ডুবিয়ে দেয় তখন গ্রিডলাইনকে সচল রাখা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং।

তবু জাতির পিতার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা রেখে চলমান মুজিববর্ষেই শতভাগ মানুষকে বিদ্যুতায়নের স্বপ্নে বিভোর পল্লী বিদ্যুৎ। তাই যে কোনো ঝুঁকি নিতেও তারা প্রস্তুত।

সারা দেশের চরাঞ্চলগুলো ২২টি জেলার ২২১টি ইউনিয়নে ১ হাজার ৫৯টি গ্রামে বিস্তৃত যা ২৩টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি (পবিস) বাস্তবায়ন করছে। অফ-গ্রিড এলাকায় সমগ্র প্রক্রিয়াকে তিনটি ফেজে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম ফেজে ৬৪৬, দ্বিতীয় ফেজে ৩৮৪ ও তৃতীয় ফেজে ২৯টি গ্রামে বিদ্যুতায়নের কাজ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। এজন্য বিভিন্ন নদীতে ৮৭টি ক্রসিং পয়েন্টে মোট ১৭৪ সার্কিট কিলোমিটার সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের কাজ প্রায় সমাপ্তির পথে। যার আওতায় ৭ হাজার ৯৭১ কিমি লাইন নির্মাণ করে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার গ্রাহককে সংযোগ প্রদান করা হবে। এজন্য পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড সম্পূর্ণ নিজস্ব তহবিল থেকে ২৯৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। ইতিমধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় ফেজের কাজ প্রায় ৭০% সমাপ্তির পথে। তৃতীয় ফেজে ২৯টি গ্রাম সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে সংযোগ করা, কারিগরি ও আর্থিকভাবে গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় ৯টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির (পবিস) আওতায় সোলার হোমস স্থাপন করা হচ্ছে।

স্বাধীনতা উত্তর দেশ গঠনে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রতিটি গ্রামে বিদ্যুৎ প্রদানের যে অঙ্গীকার ছিল আজ তারই যোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে শতভাগ বিদ্যুতায়ন বাস্তবায়ন করছে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের আওতায় পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি)। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী গ্রিড এলাকায় ২০১৪ থেকে ২০২০- মাত্র ছয় বছরে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের আগের ২ লাখ ২৮ হাজার কিমি লাইন থেকে ৫ লাখ ৩০ হাজার কিমি লাইন নির্মাণ করে আগের ৭৪ লাখ (২৭%) গ্রাহক থেকে ৩ কোটি ১১ লাখ গ্রাহক তথা (৯৯.৫%) মানুষকে সংযোগ প্রদান করে জাতিকে শতভাগ বিদ্যুতায়নের দ্বারপ্রান্তে। আর বর্তমানে পল্লী বিদ্যুতের মাধ্যমে অফ-গ্রিড এলাকায় বিদ্যুতায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই চলতি মুজিববর্ষেই জাতিকে শতভাগ বিদ্যুতায়ন উপহার দিতে যাচ্ছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। যা ইতিমধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশকে টপকে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করতে যাচ্ছে।

            লেখক : মহাব্যবস্থাপক, ফরিদপুর পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি।