শিরোনাম
বৃহস্পতিবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ টা

তুমি ভালো থেকো প্রিয় দেশ

তসলিমা নাসরিন

তুমি ভালো থেকো প্রিয় দেশ

১. দেশের দুই রকম খবর শুনি। এক. খুব ভালো, দুই. খুব খারাপ। ভালোর মধ্যে উন্নয়নের তুলনা নেই, মাথাপিছু আয় আগের চেয়ে অনেক বেশি। খারাপের মধ্যে ধর্মীয় মৌলবাদ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, দুর্নীতি সর্বত্র, গণতন্ত্রের বালাই নেই, অপরাধীর বিচার নেই, নিরপরাধ ফেঁসে যাচ্ছে, বাকস্বাধীনতা উধাও হয়ে গেছে। আমি মনে করি, দুটোই সত্যি। নদীর ওপর সেতু গড়ে উঠছে, কিন্তু নৈতিকতা ভেঙে পড়ছে।

খবরের কাগজে পড়লাম যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির হিসাব অনুসারে ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে মোট ৪ হাজার ৯৬৫ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় পাচারের পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ গড়ে প্রতি বছর পাচার হয়েছে প্রায় ৭৪ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু ২০১৫ সালেই পাচার হয়েছে ১ লাখ কোটি টাকার বেশি। বিদেশে অর্থ পাচার বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য মোটেও ভালো নয়। অর্থ পাচার বন্ধ করতে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে তথ্য দিলেও এ যাবৎ কোনও পাচারকারীর বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িতদের একটি বড় অংশ আমলা এবং রাজনীতিক এমন ধারণা করা হয়। এর বাইরে রয়েছে সন্ত্রাস ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অশুভ চক্র। বিদেশে অর্থ পাচার দেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। প্রতি বছর যে পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয় তা দেশে বিনিয়োগ হলে লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ হতো।

আরও যেসব খবর ভেসে আসে, তা শুনে ভীষণই মন খারাপ হয়ে যায়। কারখানা পুড়ে গেল, মানুষ কয়লা হয়ে বেরিয়ে এলো। লঞ্চভর্তি মানুষ, ইঞ্জিনে আগুন লেগে মরে গেল প্রচুর লোক। রাস্তাঘাটে চলছে, গাড়ির ওপর গাড়ি উঠে যাচ্ছে, সড়ক দুর্ঘটনায় অগুনতি মানুষ মারা যাচ্ছে প্রতিদিন। কোথাও নিরাপত্তা নেই মানুষের। মেয়েদের তো নিরাপত্তা ঘরে নেই, বাইরেও নেই। সেদিন ভ্যানে চড়ে বাজার করতে বেরোলো এক গ্রামের মেয়ে, তাকে গণধর্ষণ করে বাড়ি পৌঁছে দিল তিন ধর্ষক। শিশু ধর্ষণ, তরুণী ধর্ষণ, মধ্যবয়সী ধর্ষণ এখন নিত্যদিনের ঘটনা। স্ত্রীদের শারীরিক মানসিক নির্যাতন করা এবং হত্যা করাও আজকাল স্বামীদের অভ্যেসের মধ্যে চলে এসেছে। পুরুষতন্ত্র চিরকালই মেয়েদের ‘যৌনবস্তু’ হিসেবে দেখেছে, পুরুষতন্ত্রের এই অনৈতিকতা সমাজের সবাই যেন আগের চেয়ে আরও বেশি লুফে নিয়েছে। ধর্মান্ধতা বাড়ছে, একই সঙ্গে পুরুষতন্ত্রও হই রই করে ডালপালা মেলে বিকট আকার ধারণ করছে। এক সময়, সেই ষাট-সত্তর দশকে জানতাম ধার্মিকেরা সৎ এবং নীতিমান, তারা চুরি করে না, ধর্ষণ করে না, কারও অনিষ্ট করে না। আজকাল সবাই জানে মাদরাসার হুজুরদের একটি অংশ অনৈতিক কার্যকলাপে লিপ্ত। নিরীহ শিশুদেরও তারা তাদের লালসার শিকার করতে দ্বিধা করে না। শিশু এবং নারী আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী। যে সমাজে শিশু এবং নারীর কোনও নিরাপত্তা নেই, সেই সমাজ সভ্য নয়, সুস্থ নয়। কেবল রাস্তাঘাট নির্মাণ করে, দালানকোঠা তৈরি করে, সেতু বানিয়ে, অস্ত্র কিনে দেশের সত্যিকার উন্নতি সম্ভব নয়। একদিকে অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটছে, আরেকদিকে ধনীরা আরও বেশি ধনী হচ্ছে, নির্বিঘ্নে লুটতরাজ করছে। ব্যাংকের লক্ষ কোটি টাকা উধাও করে দিচ্ছে। শুধু তাই নয়, সুশিক্ষার অভাব প্রকট হয়ে উঠছে চারদিকে। মানুষকে মাপা হচ্ছে তার ধন সম্পদ দিয়ে। ধনীকে কুর্নিশ করার আর ক্ষমতাবানের পায়ে চুম্বন করার অপসংস্কৃতি এখন গ্রাস করছে গোটা দেশকে। বাংলার সংস্কৃতি ধ্বংস করে আরবীয় সংস্কৃতিকে আদর যত্ন করে ঘরে তোলা হচ্ছে। আজ ধর্মনিরপেক্ষ মানুষেরা নিরাপত্তার অভাবে দেশান্তরী হতে বাধ্য হচ্ছে। দেশে সুফি আর বাউল শিল্পীদের হাত থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে তাদের একতারা, তাদের কণ্ঠ চেপে ধরা হয়েছে। বাংলার সংস্কৃতিকে হত্যা করে মিথ্যের অপসংস্কৃতি এখন নিশান উড়িয়ে দিয়েছে।

যে কোনও অসুখ বিসুখে দেশের উচ্চবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত বিদেশে পাড়ি দেয় চিকিৎসার জন্য। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরও দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা এখনও মানুষের আস্থা অর্জন করতে ব্যর্থ। আমার নিজের বাবা-মা’র মৃত্যু হয়েছে ভুল চিকিৎসায়। চিকিৎসকরা যদি সেবার আদর্শ ভুলে ধন সম্পদ বানানোর স্বপ্নে বিভোর থাকেন, তাহলে তো তাঁদের হাতে কোনও রোগীই নিরাপদ নয়।

মূল্যবোধের অবক্ষয় নিয়ে কারও ভাবার অবকাশ নেই। প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর প্রয়াত। হীরক রাজার দেশের জনতার মতো সকলে অনুগত, ভক্ত। বহু বছর আগে একটি কবিতা লিখেছিলাম দেশ তুমি কেমন আছো, কেমন আছো তুমি দেশ?/আমি ভালো নেই, তুমি ভালো থেকো প্রিয় দেশ।/আজ বুঝি, আমি ভালো নেই, দেশও ভালো নেই। দেশের যে চিত্র দেখি কদিন পর পর, তা প্রমাণ করে না দেশ ভালো আছে।

২. আজ সাতাশ বছর ধরে আমি নির্বাসনে থাকতে বাধ্য হচ্ছি। আমার নির্বাসন নিয়ে সবচেয়ে বেশি উচ্ছ্বাস মৌলবাদী জিহাদিদের। তারা মনে করে আমি মানুষটি মন্দ, সে কারণে আমি নির্বাসন দন্ড ভোগ করছি। নির্বাসনে কিন্তু পৃথিবীর বড় বড় শিল্পী সাহিত্যিক, রাজনীতিক, এমনকী ধর্মগুরুরাও যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। লোকেরা কিন্তু তাঁদের মন্দ বলে না, বরং সম্মান করে।

তাহলে আমাকে করে না কেন সম্মান? কারণ ধর্মীয় মৌলবাদ ও পুরুষতন্ত্র কী করে নারীকে অসম্মান করে তা আমি বর্ণনা করেছি। যেন হাটে হাঁড়ি ভেঙেছি। আমার এই স্পর্ধা সমাজ ধ্বংসকারী মন্দ লোকদের সহ্য হয় না।

দেশে কী আর আমার আছে শুধু স্মৃতি ছাড়া? শৈশব কৈশোরের স্মৃতি মাঝে মাঝেই আমাকে বড় আন্দোলিত করে। ময়মনসিংহ শহরে অবকাশ নামের যে বাড়িতে আমি বড় হয়েছি, সে বাড়ি ছিল প্রচ- ধর্মনিরপেক্ষ বাড়ি, বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের বাড়ি। আমার বাবা ছিলেন ডাক্তার, ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের অধ্যাপক। মিটফোর্ড এবং ঢাকা মেডিক্যাল কলেজেরও অধ্যাপক ছিলেন। আমরা চার ভাই বোন ছিলাম বিজ্ঞানের ছাত্র ছাত্রী। পড়েছি পদার্থবিজ্ঞান, রসায়নবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান। আমি ডাক্তার হয়েছি। বাবা বিজ্ঞানমনস্ক ছিলেন। ভাই বোনেরাও তা-ই ছিল। দাদারা বেহালা বাজাতো, গিটার বাজাতো। আমিও গিটার বাজাতাম। বোন হারমোনিয়াম বাজিয়ে রবীন্দ্রসংগীত গাইতো। আমাদের গিটার, বেহালা আর গানের শিক্ষক ছিলেন যামিনী পাল, সমীর চন্দ্র দে, বাদল দে। দাদারা পাড়ার হিন্দু মেয়েদের সংগে প্রেম করতো। একজন তো এক হিন্দু মেয়েকে পরে বিয়েই করেছে। মেয়েটি নৃত্যশিল্পী। বোনেরও ছিল পাড়ার হিন্দু ছেলেমেয়েদের সংগে বন্ধুত্ব। হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান নাস্তিক আস্তিককে কখনও আলাদা করে দেখিনি কেউ। আমাদের বাড়িতে মা ছাড়া কেউ নামাজ পড়তো না। বাবা জানতেনই না নামাজ কিভাবে পড়তে হয়। কোরান পড়তেও জানতেন না। আমার বাবা দাদারা বরাবরই ক্লিন শেভড। বরাবরই স্যুট টাই। আমরা বোনেরাও আধুনিক পোশাক। জিন্স। শাড়ি টিপ।

এই ছিল আমাদের সত্তর আশির দশকের অবকাশ। বাড়িতে সারা বছর রবীন্দ্রসংগীত বাজতো, গণসংগীত বাজতো, হেমন্ত মান্না দে সতীনাথ বাজতো। নাটক হতো, নৃত্যনাট্য হতো। সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করতো দাদা। আমিও করতাম। বাড়ির বুকশেল্ফে ছিল প্রচুর গল্প উপন্যাস প্রবন্ধের বই। বাড়িটিতে সাহিত্য চর্চা চলতো প্রতিদিন। দাদা লিখতো কবিতা। আমিও লিখতাম। বাড়িতেই ‘সকাল কবিতা পরিষদ’ গড়ে তুলেছিলাম, বারান্দার ঘরে শহরের উৎসাহী আবৃত্তিকারদের নিয়ে বৃন্দ আবৃত্তির মহড়া চলতো। বাড়িতে দাবা খেলা চলতো বাবা আর মেয়েতে, ভাই বোনে চলতো রাত জেগে তাস খেলা। সে বাড়ির নাম ছিল ‘অবকাশ’। নামখানা বাবার দেওয়া। অবকাশে আমরা সবাই ছিলাম কর্মমুখর। কারও একফোঁটা অবকাশ ছিল না।

আমাদের সেই অবকাশ আর আমাদের নেই। সেই অবকাশ এখন বড় দাদার স্ত্রী পুত্রদের দখলে। স্ত্রীর বাপের বাড়ির আত্মীয় আর পুত্রদের শ্বশুরবাড়ির পাঁড় ধর্মবাজদের প্রভাবে আমাদের সেই অবকাশ এখন ভিন্ন এক অবকাশ। আমরা দেয়ালে টাঙাতাম আর্ট, সেসব সরিয়ে দেয়ালে এখন টাঙানো হয়েছে মরু দেশের উটের ছবি, টাঙানো হয়েছে প্রশ্রাব পায়খানা, পেট খারাপ, বমির উদ্রেক, সর্দি কাশি আর স্বপ্নদোষের দোয়া। ময়মনসিংহ শহরে আমার বাবার ছিল ক্লিনিক। এক্স রে, প্যাথলজি, মেডিক্যাল কন্সাল্টেশান, সার্জারি, ফার্মেসি। এখন শুনেছি অবকাশের বোরখা হিজাব আর আলখাল্লা টুপি পরা লোকগুলো শহরে একটি দোকান খুলেছে, সেই দোকানে বিক্রি করে ধর্মীয় বই, জায়নামাজ, তসবিহ, হিজাব বোরখা, যমযমের পানি, খেজুর আর আরব দেশের আতর।

আমাদের সেই শিল্প সাহিত্যের, সেই গান বাজনার, সেই ধর্মনিরপেক্ষ অবকাশ নষ্ট হয়ে গেছে। শুধু আমাদের অবকাশই নষ্ট হয়নি। নষ্ট হয়ে গেছে গোটা বাংলাদেশ।

কিন্তু তারপরও বলি, আমাকে নির্বাসন দিয়েও যদি দেশ ভালো থাকে, দেশে মেয়েদের নিরাপত্তা থাকে, বাকস্বাধীনতা থাকে, সত্যিকার গণতন্ত্রের চর্চা চলে, সভ্য এবং সুশিক্ষিত হয়ে ওঠে মানুষ, দেশের প্রগতিশীল মানুষকে যদি দেশান্তরী হতে না হয়, তাহলে নির্বাসনে থাকতে আমার আপত্তি নেই বাকি জীবন। তবু ভালো থাকুক প্রিয় দেশ।

                লেখক : নির্বাসিত লেখিকা।

এই রকম আরও টপিক

সর্বশেষ খবর