শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২২ এপ্রিল, ২০১৯ ২২:৫৮

চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ কী

চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ কী
বন্ধ হয়ে গেল নারায়ণগঞ্জের জোড়া সিনেমা হল আশা-মাশা

বন্ধ হয়ে গেল নারায়ণগঞ্জের আশা-মাশা জোড়া সিনেমা হল    প্রযোজনা সংস্থার বন্ধের তালিকায় এবার মিনা ফিল্মস 

চলচ্চিত্র শিল্পের দুর্দশা কোনোভাবেই কাটছে না। দীর্ঘদিন ধরে রাহুর কবলে পড়া এই শিল্পটি যেন ধীরে ধীরে গুটিয়ে যাচ্ছে। সরকারি আশ্বাসে বিশ্বাস করেও ঘুরে দাঁড়ানোর পথ খুঁজে পাচ্ছে না চলচ্চিত্রকাররা। চলচ্চিত্র শিল্পের এই অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা তুলে ধরেছেন- আলাউদ্দীন মাজিদ

থামছে না সিনেমা হল বন্ধ

সিনেমা হল বন্ধের হিড়িক কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না। গত সপ্তাহে বন্ধ হলো নারায়ণগঞ্জের জোড়া সিনেমা হল খ্যাত ‘আশা’ ও ‘মাশা’। এর মালিকপক্ষ বলছেন, পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ছবির অভাবে দর্শক নেই। লোকসান গুনে কতদিন সিনেমা হল টিকিয়ে রাখা যায়। নারায়ণগঞ্জের স্বনামধন্য ব্যবসায়ী মাহাবুব হোসেন টানবাজারের সুতা ব্যবসায়ীদের জন্য ১৯৬০ সালে ‘আশা’ সিনেমা হলটি নির্মাণ করেন। ওই বছরই বলিউডের  দিলীপ কুমার অভিনীত ‘দাগ’ ছবি দিয়ে সিনেমা হলটি উদ্বোধন করা হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মাহাবুব হোসেন তার ছেলে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়া মাশার নামে আশা সিনেমা হলের সঙ্গে ‘মাশা’ নামের হলটি নির্মাণ করেন। প্রয়াত মাহাবুব হোসেনের ছোট ছেলে মেহমুদ হোসেনই এই জোড়া সিনেমা হলের দেখাশোনা করতেন। ব্যবসায়িক মন্দার কারণে গত বুধবার আশা ও মাশা ভেঙে ফেলা শুরু করেন তিনি। এর ফলে নারায়ণগঞ্জে থাকা ছয়টি সিনেমা হলের মধ্যে এখন অবশিষ্ট রয়েছে কেবল ‘নিউ মেট্রো’ ও ‘গুলশান’।

চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির উপদেষ্টা মিয়া আলাউদ্দীন জানান, নব্বই দশকের শেষ পর্যন্ত ঢাকাসহ সারা দেশে মোট ১ হাজার ৪৩৫টি সিনেমা হল চালু ছিল। এক বছর আগেও যার সংখ্যা ছিল ৩০০-এর ওপরে। গত সাত মাসের মাথায় সেই সংখ্যা ২৫০-এ নেমে আসে। বর্তমানে এই সংখ্যা ১৭২। এর মধ্যে ৯০টির মতো সিনেমা হলের পরিবেশ দর্শক উপযোগী। মিয়া আলাউদ্দীন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সরকার আশ্বাস দিয়ে আসছিল সিনেমা হলে আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন, সিনেমা হল সংস্কার ও সিনেপ্লেক্স নির্মাণ করা হবে। কিন্তু দীর্ঘ সময় কেটে গেলেও ওই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি। অবশেষে গত ২১ এপ্রিল তথ্য মন্ত্রণালয়ে সিনেমা হল উন্নয়ন সংক্রান্ত এক বৈঠকে দেশের ৫২টি সিনেমা হলের তালিকা তৈরি করা হয়। এর মধ্যে আপাতত ৪০টি সিনেমা হলে স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পরিশোধে আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শিগগিরই এ কাজ শুরু হবে। এছাড়া শিল্প মন্ত্রণালয় আশ্বাস দিয়েছে সিনেমা হলের বিদ্যুৎ বিল বাণিজ্যিক হারের পরিবর্তে শিগগিরই শিল্প হারে নেওয়া হবে। তাছাড়া তথ্যমন্ত্রী আরও আশ্বাস দিয়েছেন কলকাতার ছবি এখানে একই সঙ্গে মুক্তি এবং হিন্দি ছবি মুক্তিরও ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি

স্থানীয়ভাবে মানসম্মত ছবি নির্মাণে সরকারি অনুদানের ব্যবস্থা সময়োপযোগী করাসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হবে। মিয়া আলাউদ্দীন বলেন, এসব প্রতিশ্রুতি যদি অচিরেই বাস্তবায়ন হয় তাহলেই শুধু সিনেমা হল বন্ধ রোধ করা যাবে।

 

প্রযোজনা সংস্থার আকাল

চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির উপদেষ্টা মিয়া আলাউদ্দীন উদ্বেগের সঙ্গে বলেন, স্বাধীনতার পর ঢাকাজুড়ে ছিল চলচ্চিত্র প্রযোজনা সংস্থার অফিস। ২০০০ সালের শুরু থেকে চলচ্চিত্র ব্যবসায় ধস নামলে প্রসিদ্ধ প্রযোজনা সংস্থাগুলো বন্ধ হতে থাকে। গত সপ্তাহে বন্ধ হলো হিমেল খানের ‘মিনা ফিল্মস’। ২০০৭ সালে কাকরাইলে এসে জড়ো হয় শতাধিক প্রযোজনা সংস্থা। এর মধ্যে শুধু ভূঁইয়া ম্যানশনেই ছিল অর্ধশতাধিক প্রোডাকশন হাউস। সিনেমা ব্যবসা মন্দার কারণে বন্ধ হতে হতে এখন এখানে রয়েছে মাত্র ৪-৫টি প্রযোজনা অফিস। এরমধ্যে কাউসারের তুষার কথাচিত্র, তাপসী ঠাকুরের হার্টবিট এবং সেলিম খানের শাপলা মিডিয়া অন্যতম। বাকি যে কয়টি আছে তা থেকে ছবি নির্মাণ হয় না। এগুলো যেসব প্রযোজকের অফিস নেই তারা তাদের ছবি মুক্তির সময় ব্যবহার করে। মিয়া আলাউদ্দীন দুঃখের সঙ্গে বলেন, এখন প্রায় প্রযোজক ওয়ান টাইম ছবি নির্মাণ করেন, তাদের নিজস্ব কোনো অফিস বা ঠিকানা নেই। ফলে সিনেমা হল মালিকরা এসব প্রযোজককে অগ্রিম দিতে সাহস পান না। কারণ ছবি যদি না চলে তাহলে সেই অগ্রিম টাকা ফেরত নিতে কার কাছে বা কোন ঠিকানায় প্রদর্শকরা যাবেন।

জনশূন্য কাকরাইল ফিল্মপাড়া

আরও সংকট...

চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির প্রধান উপদেষ্টা সুদীপ্ত কুমার দাস বলেন, নানামুখী সমস্যায় এদেশের চলচ্চিত্র শিল্প স্থবির হয়ে আছে। এসবের মধ্যে তারকা, নির্মাতা, গান ও গল্প সংকট অন্যতম। এই তিনটির অভাব  নেই। আছে মানের অভাব। প্রায় শিল্পী আর নির্মাতাদের কাজে দক্ষতা নেই। দেশে গল্পকার, চিত্রনাট্যকার ও গীতিকার আছে প্রচুর।

তাতেও রয়েছে মানের অভাব। দেশীয় মৌলিক গল্প বাদ দিয়ে সবাই ছুটছেন নকলের পেছনে। দর্শক তো বোকা নয়, উন্মুক্ত আকাশ সংস্কৃতির যুগে পৃথিবীর সব ছবি সহজেই দর্শক দেখতে পারছে। এক্ষেত্রে নকল ছবি বানিয়ে দর্শকদের ধোঁকা দেওয়ার দিন আর নেই। ফলে সংকটে জড়িয়ে দেশের প্রধান গণমাধ্যম চলচ্চিত্র শিল্প এখন অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে।

 


আপনার মন্তব্য