শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ১৫ মে, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৪ মে, ২০১৯ ২২:৪০

কী হবে চলচ্চিত্রের

আলাউদ্দীন মাজিদ

কী হবে চলচ্চিত্রের
অতীতে চলচ্চিত্র শিল্পের সমস্যা সমাধানে সরকারের ধীর গতির কারণে শিল্পটি এখন অস্তিত্ব সংকটের মুখে। তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ এবারের ঈদের ছবি। প্রতি বছর ঈদে মুক্তির জন্য কমপক্ষে ৭/৮টি ছবি প্রস্তুত থাকলেও এবার এখন পর্যন্ত মাত্র ২/৩টির নাম শোনা যাচ্ছে।

 

‘নানামুখী সমস্যায় চলচ্চিত্র শিল্প দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে স্থবির হয়ে আছে’, এটি পুরনো খবর। নতুন খবর হলো বর্তমানে সরকার শিল্পটির পুনঃজাগরণে আবারও নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে যাচ্ছে। এতে চলচ্চিত্রকাররা কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলছেন, ‘এবার যেন আশ্বাস সত্যিই বিশ্বাসে পরিণত হয়, চলচ্চিত্র শিল্পটির উন্নয়নের ক্ষেত্রে সব প্রতিবন্ধকতা দূর করে সরকার যেন এটিকে আবার সচল করে দেয়। না হলে প্রায় কোমায় থাকা এই শিল্পটি অচিরেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করবে।

বিভিন্ন চলচ্চিত্র সমিতির মধ্যে পরিচালক ও প্রদর্শক সমিতির নেতারা বলছেন ইতিমধ্যে তারা তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। মন্ত্রী সব কথা গুরুত্ব দিয়ে শুনেছেন এবং শিল্পী ও প্রযোজক সমিতির সঙ্গে বৈঠক করে শিগগিরই এই শিল্পটিকে ঢেলে সাজানোর নির্দেশনা দেবেন বলে তাদের আশ্বস্ত করেছেন। গত ২ এপ্রিল তথ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির কর্মকর্তারা। ৩ এপ্রিল জাতীয় চলচ্চিত্র দিবসে এফডিসিতে এই বৈঠকের কথা জানাতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, এফডিসিকে আধুনিক করতে ৩২২ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে এটির কাজ সম্পন্ন হবে। মানসম্মত ছবির অভাবে সিনেমা হলের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। স্থানীয় ছবির অভাবে সিনেমা হল বন্ধ রোধে প্রদর্শকদের উপমহাদেশীয় ছবি আমদানির দাবি খতিয়ে দেখতে তাদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। আপাতত কলকাতার বাংলা ছবি যাতে ওই দেশের মুক্তির পর স্বল্প সময়ে এদেশে মুক্তি পেতে পারে সেই ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এ ছাড়া সিনেমা হলের বিদ্যুৎ বিল বাণিজ্যিক হারের পরিবর্তে শিগগিরই শিল্প হারে নেওয়ার ব্যবস্থাও করা হবে। আর প্রদর্শকদের হিন্দি ছবি আমদানির দাবি সব চলচ্চিত্র সমিতির সঙ্গে আলাপ করে চূড়ান্ত করা হবে। চলচ্চিত্র নির্মাণে সরকারি অনুদান সময় উপযোগী করা হবে। সিনেমা হল সংস্কার ও নির্মাণে স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি কিস্তিতে ঋণ দেওয়ারও ব্যবস্থা করা হবে। এদিকে, গত ২৪ এপ্রিল চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সদস্যরা সাক্ষাৎ করেন তথ্যমন্ত্রীর সঙ্গে। বৈঠক শেষে সমিতির মহাসচিব বদিউল আলম খোকন জানান, মন্ত্রীকে সমিতির পক্ষ থেকে বেশ কটি দাবি লিখিত আকারে দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী এসব দাবি পূরণের আশ্বাস দিয়েছেন। এসব দাবির মধ্যে ছিল সেন্সর বোর্ডে চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি অথবা মহাসচিবকে প্রতিনিধি হিসেবে রাখতে হবে, এফডিসির প্যাকেজ সুবিধা সহজ করতে হবে, বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে চলচ্চিত্র কেন্দ্র ও সিনেপ্লেক্স নির্মাণ করতে হবে, সিনেমা হলে প্রজেক্টরসহ যাবতীয় যন্ত্রপাতি সিনেমা হল মালিকদের স্থাপন ও সিনেমা হলের আধুনিকায়ন করতে হবে। মহাসচিব খোকন বলেন, সমিতির দাবি বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন মন্ত্রী। এদিকে চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির প্রধান উপদেষ্টা সুদীপ্ত কুমার দাস জানান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় উপমহাদেশীয় চলচ্চিত্র আমদানির ক্ষেত্রে সংশোধনের বিষয়ে ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে। সংশোধিত নতুন নীতিমালা প্রণীত হলে চলচ্চিত্র আমদানির ক্ষেত্রে নতুন দিগন্তের সূচনা হবে। একটি সূত্রে জানা গেছে সংশোধিত এই নীতিমালায় বছরের ৪৮ সপ্তাহের মধ্যে ১৬ সপ্তাহে উপমহাদেশীয় চলচ্চিত্র প্রদর্শনের সুযোগ থাকছে। অন্যদিকে, সিনেমা হলে সরকারি উদ্যোগে যন্ত্রপাতি স্থাপনের জন্য প্রদর্শক সমিতি তথ্য মন্ত্রণালয়ে ৮৩টি সিনেমা হলের একটি তালিকা জমা দেয়। এর মধ্যে মন্ত্রণালয় যাচাই-বাছাই করে ৫২ হলের তালিকা তৈরি করে ও এর মধ্যে ৪০টি সিনেমা হল সংস্কারের ঋণ অনুমোদনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে টাকা চেয়ে প্রস্তাব পাঠায়। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় এই প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। এ অবস্থায় প্রদর্শক সমিতি এখন আবার সরকারের কাছে সিনেমা হলে যন্ত্রপাতি স্থাপনের জন্য ঋণ চেয়ে আবেদন করেছে। এখন প্রস্তাব প্রকল্পের খসড়া তৈরির কাজ চলছে বলে জানা গেছে। সুদীপ্ত কুমার দাস সরকারের কাছে অনুরোধ জানিয়ে বলেন, প্রস্তাবটি যেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশোধিত নীতিমালা প্রকাশের আগেই সেখানে প্রেরণ করা হয়। না হলে নতুন করে এই বিষয়টি নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করতে আবার দীর্ঘ সূত্রতার কবলে পড়তে হবে। এদিকে, চলচ্চিত্রকাররা অভিযোগ করে বলেন, অতীতে চলচ্চিত্র শিল্পের সমস্যা সমাধানে সরকারের ধীর গতির কারণে শিল্পটি এখন অস্তিত্ব সংকটের মুখে। তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ এবারের ঈদের ছবি। প্রতি বছর ঈদে মুক্তির জন্য কমপক্ষে ৭/৮টি ছবি প্রস্তুত থাকলেও এবার এখন পর্যন্ত মাত্র ২/৩টির নাম শোনা যাচ্ছে। অথচ ঈদের আর এক মাসও বাকি নেই। নানা প্রতিকূলতার কারণে চলচ্চিত্র নির্মাণ আশঙ্কাজনকহারে কমছে। একের পর এক বন্ধ হচ্ছে সিনেমা হল ও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান। গত মাসে বন্ধ হয় হিমেল খানের ‘মিনা ফিল্মস’। চলচ্চিত্র পাড়া খ্যাত কাকরাইলে ছিল শতাধিক প্রযোজনা সংস্থা। এর মধ্যে শুধু ভূঁইয়া ম্যানশনেই ছিল অর্ধশতাধিক প্রোডাকশন হাউস। সিনেমা ব্যবসা মন্দার কারণে বন্ধ হতে হতে এখন এখানে রয়েছে মাত্র ৪/৫টি প্রযোজনা অফিস। এর মধ্যে কাউসারের তুষার কথাচিত্র, তাপসী ঠাকুরের হার্টবিট এবং সেলিম খানের ‘শাপলা মিডিয়া’ অন্যতম। বাকি যে কটি আছে তা থেকে ছবি নির্মাণ হয় না। অন্যদিকে গত মাসে বন্ধ হয় নারায়ণগঞ্জের জোড়া সিনেমা হল খ্যাত ‘আশা’ ও ‘মাশা’। এর মালিকপক্ষ বলছেন, পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ছবির অভাবে দর্শক নেই। লোকসান গুনে কতদিন টিকিয়ে সিনেমা হল টিকিয়ে রাখা যায়। চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির উপদেষ্টা মিয়া আলাউদ্দীন জানান, নব্বই দশকের শেষ পর্যন্ত ঢাকাসহ সারা দেশে মোট ১ হাজার ৪৩৫টি সিনেমা হল চালু ছিল। এক বছর আগেও যার সংখ্যা ছিল ৩০০-এর ওপরে। গত সাত মাসের মাথায় সেই সংখ্যা ২৫০-এ নেমে আসে। বর্তমানে এই সংখ্যা ১৭২। এর মধ্যে ৯০টির মতো সিনেমা হলের পরিবেশ দর্শক উপযোগী। প্রযোজক সমিতির সাবেক কর্মকর্তা খোরশেদ আলম খসরু বলেছেন এত অল্প সংখ্যক সিনেমা হল থাকায় মাঝারি বাজেটের ছবি নির্মাণ করেও সেই অর্থ ফেরত পাওয়া সম্ভব নয়। তাই ছবি নির্মাণ থেকে দূরে সরছেন নির্মাতারা।


আপনার মন্তব্য