শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ৩০ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৯ মার্চ, ২০২০ ২২:০১

করোনাভাইরাসে স্থবির সাংস্কৃতিক অঙ্গন

দুস্থদের পাশে থাকবেন শিল্পীরা

মোস্তফা মতিহার

দুস্থদের পাশে থাকবেন শিল্পীরা

নভেল করোনাভাইরাসের আক্রমণে থমকে গেছে সারা বিশ্ব। বৈশ্বিক এই দুর্যোগের প্রভাব পড়েছে আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও। জনসমাগমের কারণে করোনাভাইরাস ছড়ায় বলে ১৮ মার্চ থেকে পরবর্তী নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত সারা দেশের সব সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বাতিল করেছে  সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। নিরাপদ ও সাবধানতার সঙ্গে চরম এই সংকট কাটিয়ে উঠে সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে বেগবান করার লক্ষ্যে সংস্কৃতিকর্মীদের রয়েছে নানা ধরনের পদক্ষেপ। নিজেদের নানা উদ্যোগের বিষয়ে বাংলাদেশ প্রতিদিনের সঙ্গে কথা বলেছেন সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সঙ্গে সম্পৃক্তরা।

 

আসাদুজ্জামান নূর

শুধু সাংস্কৃতিক অঙ্গনই নয়, সারা বিশ্বই এখন চরম প্রতিকূলতার মধ্যে রয়েছে। আগে বাঁচতে হবে এবং সুস্থ থাকতে হবে। অতিমাত্রায় জনসমাগমের কারণে এই ভাইরাসটিতে সংক্রমিত হওয়ার যেহেতু ঝুঁকি রয়েছে সে কারণেই সংস্কৃতিকর্মীরা সব ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বাতিল করেছে। আর এর প্রভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন অসচ্ছল শিল্পী ও কলাকুশলীরা। যাত্রাশিল্পী, লোকশিল্পী ও যন্ত্রশিল্পীসহ যারা দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল, অনুষ্ঠান বন্ধ থাকায় তারা বেকার হয়ে পড়েছেন। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের পক্ষ থেকে দুস্থদের পাশে দাঁড়ানোর লক্ষ্যে আমরা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের পক্ষে একটা উদ্যোগ নিয়েছি। সংস্কৃতির পাশাপাশি অর্থনীতিতেও করোনার প্রভাব পড়েছে। টিভি বিজ্ঞাপন ও টিভি নাটক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কিছুটা সময় তো লাগবেই।

 

গোলাম কুদ্দুছ

করোনা একটা বৈশ্বিক দুর্যোগ। বিশ্ব পরিস্থিতির উন্নতি হলে আমাদেরও উন্নতি হবে। দেশের সব ক্রান্তিকালে সংস্কৃতিকর্মীরা পাশে ছিল, এখনো আছে আর ভবিষ্যতেও থাকবে। সংস্কৃতিকর্মী ও জনগোষ্ঠীর কথা চিন্তা করেই আমরা সব ধরনের অনুষ্ঠান বাতিল করেছি। এই মহাদুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আমরা সব সংস্কৃতিকর্মী ঐক্যবদ্ধ হচ্ছি। রাষ্ট্রের পাশাপাশি আমরাও এগিয়ে আসব। এই সংকটে সবারই নিজ নিজ অবস্থান থেকে সাহায্যের হাত প্রসারিত করে দেওয়া উচিত। এই ধরনের দুর্যোগে রাষ্ট্রের পাশাপাশি সংস্কৃতিকর্মীদেরও অনেক দায়িত্ব রয়েছে। আমরা এখন ফান্ড রাইজিং করছি। দুস্থ ও অসচ্ছল শিল্পীদের পাশে আমরা সাধ্যমতো দাঁড়াব। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট থেকে আমাদের আরও নানা ধরনের পরিকল্পনা রয়েছে।

 

লাকী ইনাম

দেশের বৃহৎ স্বার্থে শিল্পকলাসহ সারা দেশের সব সাংস্কৃতিক কার্যক্রম লকডাউন রয়েছে। যার যার জায়গা থেকে আমরা সবাইকে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে বলেছি। পরিস্থিতি খুব শিগগিরই কেটে যাবে বলে আশা করছি। সবাইকে ধৈর্য ধারণ করতে হবে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে অনেক রোগ-শোক ও মহামারীর মধ্য দিয়ে আমরা এখনো এগিয়ে চলছি। এই দুর্যোগের সময় মানসিক শক্তি ও ধৈর্যটাই অনেক বেশি দরকার।

 

মোমেনা চৌধুরী

সারা বিশ্ব যখন অনাচারে ভরে গেছে, নারীর প্রতি যখন সহিংসতা চরমে তখনই এই করোনা আমাদের জন্য হুমকিস্বরূপ এসেছে। অভিনয়ের পাশাপাশি আমি কোয়ান্টামের সঙ্গেও জড়িত। তাই কোয়ান্টামের পক্ষ থেকে বিভিন্ন বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে দম ধরে রাখার কৌশল শিখাচ্ছি। যাতে করে ফুসফুস ভালো থাকে। এছাড়া ইয়োগার বিষয়েও জনগণকে উৎসাহিত করছি। একজন শিল্পী হিসেবে জনগণকে সচেতন করার এর চেয়ে ভালো সুযোগ আর কি হতে পারে। তবে এই পরিস্থিতি আমরা খুব শিগগিরই কাটিয়ে উঠব বলে আমি আশা রাখি। শিল্পীরা যেহেতু সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে সেহেতু এই দুর্যোগের সময় সব শিল্পীকে মানুষের সহযোগিতায় এগিয়ে আসতে হবে। এ জন্য সব শিল্পীকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে।

 

এস হক অলিক

করোনা নিয়ে সারা বিশ্বই এখন চিন্তিত। সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পেতে ২২ মার্চ থেকে আমরা সব ধরনের শুটিং বন্ধ রেখেছি। নির্মাতা, শিল্পী ও কলাকুশলীরা বেকার হয়ে পড়েছেন। আগে বেঁচে থাকতে হবে, পরে কাজ। প্রোডাকশন্স বয় থেকে শুরু করে দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে কাজ করা আমাদের অনেক শিল্পী ও কলাকুশলী বর্তমানে বেকার। আমাদের সব সংগঠন ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাদের জন্য কিছু একটা করার উদ্যোগ আমাদের পরিকল্পনায় রয়েছে।  সরকার গার্মেন্ট খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা দিয়েছে। আমাদের যেহেতু আয়ের কোনো বিকল্প ব্যবস্থা নেই, তাই সরকারের প্রতি অনুরোধ করব গার্মেন্ট শিল্পের মতো নাট্যশিল্পেও যেন সরকার প্রণোদনা দেয়। সরকার এগিয়ে আসবে বলে আমরা আশা করছি।

 

তারিন

করোনা শুধু বাংলাদেশের নয়, এটা বৈশ্বিক সমস্যা। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সরকার আন্তরিক ও কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে। শুধু সাংস্কৃতিক অঙ্গনই নয়, সব সেক্টরই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমাদের নাট্যাঙ্গনে যারা দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে কাজ করে তারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে স্পটবয় থেকে শুরু করে মেকাপ আর্টিস্ট, ক্যামেরাম্যান, লাইটম্যানসহ আরও অনেকে। সবারই আয়ের উৎস কিন্তু মিডিয়া। কারোরই বিকল্প আয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই। এই টাকা দিয়েই তাদের রুটি-রুজির ব্যবস্থা হয়। সংসার চালিয়ে আবার অনেককে কিস্তিও দিতে হয়। তাদের জন্য কিছু করা অর্থাৎ তাদের পাশে দাঁড়ানোটা এখন আমাদের নৈতিক দায়িত্ব বলেই আমরা মনে করি। অসচ্ছল শিল্পী ও টেকনিশিয়ানদের পাশে দাঁড়ানোর লক্ষ্যে অ্যাক্টরস ইকুইটি, ডিরেক্টরস গিল্ডসহ বিভিন্ন সংগঠন একত্রিত হয়ে আমরা তথ্যমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেছি। তিনি আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন। অন্তত দুই মাস যাতে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করা যায় সে জন্য কিছু একটা করার প্রচেষ্টা ও সদিচ্ছাও আমাদের রয়েছে।  সরকারের পক্ষ থেকে আমরা সহযোগিতা পাব বলেই আশা রাখি। সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদেরও আমরা অনুরোধ করব তারা যাতে এই দুর্যোগের সময় সংস্কৃতির উন্নয়নে এগিয়ে আসে। 

 

তানভীন সুইটি

শিল্পী ও কলাকুশলীদের সুস্থতার জন্য এই মুহূর্তে আমরা কোয়ারেন্টাইনে আছি। শুটিং বন্ধ থাকায় আমাদের শিল্পী ও কলাকুশলীরা বেকার হয়ে পড়েছেন। তবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে কাজ করা জুনিয়র শিল্পী ও টেকনিশিয়ানরা। প্রোডাকশন্স বয় থেকে শুরু করে মেকাপ আর্টিস্ট, ক্যামেরাম্যান, লাইটম্যান, ক্যামেরা ক্রুÑ এরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। কারণ সবার রুটি-রুজি হয় এই অঙ্গন থেকে। এই দুঃসময়ে তাদের জন্য কিছু করাটা আমাদের নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। নাটকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১৪টি সংগঠন ঐক্যবদ্ধ হয়ে অপেক্ষাকৃত অসচ্ছলদের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছি। ছোট আর বড় বলতে কেউ নেই, আমরা সবাই সমান। করোনা আবারও তা প্রমাণ করে দিল। এই প্রতিকূলতায় আমাদের একে অন্যের পাশে দাঁড়াতে হবে। ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা, আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই।


আপনার মন্তব্য