শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ১ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩০ জুন, ২০২০ ২২:১১

অভিনয়ে সর্বক্ষেত্রে সফল এ টি এম শামসুজ্জামান

একজন সফল মানুষের চিত্র হলেন চলচ্চিত্রকার ও নাট্য অভিনেতা এ টি এম শামসুজ্জামান। তার বিচিত্র কর্ম ও ব্যক্তি জীবনের নানা গল্প তুলে ধরেছেন-আলাউদ্দীন মাজিদ

অভিনয়ে সর্বক্ষেত্রে সফল এ টি এম শামসুজ্জামান

সর্বক্ষেত্রে সফলতা তার...

কখনো মন্দ মানুষ, কখনোবা হাস্যরসের ভাণ্ডার নিয়ে উপস্থিত এক চিরচেনা মুখ। যখনই যে চরিত্রে তিনি পর্দায় হাজির হয়েছেন দর্শকদের দিয়েছেন ভিন্ন স্বাদের বিনোদন। চলচ্চিত্রে গ্রাম্য বদ মাতব্বর, নানা ধরনের দুষ্ট লোক কিংবা গতানুগতিকের চেয়ে অন্য ধারার কমেডি চরিত্রে অভিনয় করে তিনি পেয়েছেন আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা। একাধারে তিনি জনপ্রিয় অভিনেতা, পরিচালক, কাহিনিকার, চিত্রনাট্যকার, সংলাপ রচয়িতা ও গল্পকার। এ যাবৎ তিন শতাধিক চলচ্চিত্রে এবং কয়েকশত টিভি নাটকে অভিনয় করেছেন তিনি।

 

চলচ্চিত্রে যেভাবে...

পুরো নাম আবু তোরাব মোহাম্মদ শামসুজ্জামান। চলচ্চিত্রে এ টি এম শামসুজ্জামানের যাত্রা শুরু সহকারী পরিচালক হিসেবে।

১৯৬১ সালে পরিচালক উদয়ন চৌধুরীর ‘মানুষের ভগবান’ ও ‘বিষকন্যা’ ছবিতে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেন তিনি। এরপর বিভিন্ন পরিচালকের সঙ্গে সহকারী হিসেবে কাজ করেন। এদের মধ্যে খান আতাউর রহমান, কাজী জহির, সুভাষ দত্ত অন্যতম। ১৯৬৫ সালে সর্বপ্রথম চলচ্চিত্রের জন্য চিত্রনাট্য লিখেন এ টি এম শামসুজ্জামান। লেখালেখিতে অল্প সময়ে বেশ খ্যাতি অর্জন করেন। এ পর্যন্ত শতাধিক চিত্রনাট্য ও কাহিনি লিখেছেন। তিনি অভিনয় শুরু করেন ১৯৬৫ সালের দিকে। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা নারায়ণ ঘোষ মিতা পরিচালিত ‘এতটুকু আশা’ ছবিতে সর্বপ্রথম ‘পত্রিকা বিক্রেতা’ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি। এই ছবিতে তার অভিনয়ের গল্পটা মজার। ছবিতে জীবনযুদ্ধে পর্যুদস্ত চরিত্রে প্রখ্যাত অভিনেতা আলতাফ হোসেন একজন পত্রিকা বিক্রেতার অভিনয় করেন। তার সঙ্গে সহকারী হিসেবে যার অভিনয় করার কথা ছিল তিনি যে কোনো কারণে সেদিন অনুপস্থিত ছিলেন। সেসময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন এটিএম। নির্মাতা মিতা উপায়ন্তর না দেখে তাকেই আলতাফের সহকারীর চরিত্রে অভিনয় করতে বললেন, প্রথমে রাজি না হলেও নির্মাতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে জীবনে প্রথম ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান তিনি। আলতাফ গাইছিলেন সেই বিখ্যাত গান ‘তুমি কি দেখেছো কভু জীবনের পরাজয়’। এ সময় বিষাদগ্রস্ত চেহারা নিয়ে যে এক্সপ্রেশন দিয়েছিলেন এ টি এম তা দেখে নির্মাতা বলেছিলেন ছেলেটি একদিন অনেক বড় অভিনেতা হবে। সত্যিই পরবর্তীতে তাই হয়েছেন তিনি। এরপর ১৯৭৬ সালে চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেনের ‘নয়নমণি’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে আলোচনায় আসেন এটিএম। এ ছবিতে খল চরিত্রে অভিনয় করেই এ টি এম শামসুজ্জামান তার অভিনয় জীবনের টার্নিং পয়েন্টে খুব অল্প সময়ে পৌঁছে যান। তবে এতে অভিনয় করতে রাজি হননি তিনি। আমজাদ হোসেন যখন তাকে ডেকে পাঠালেন তখন তিনি ভেবেছিলেন ছবিতে তাকে হয়তো সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করতে হবে। কিন্তু নির্মাতা যখন তাকে এই চরিত্রে অভিনয় করতে বললেন তখন তিনি ভয়ে ‘না’ বলে পালিয়ে যান। পরে নির্মাতা তাকে জোর করে ধরে এনে ছবির চ্যালেঞ্জিং এক মোড়ল চরিত্রে অভিনয় করান এবং এ টি এম তুমুল জনপ্রিয়তা পান। এই ছবিতে তার একটি সংলাপ ‘ওই মিয়ারা’ তখন মুখে মুখে ফিরত। ছবিটি মুক্তির দিন ভয়ে তিনি পালিয়ে গিয়েছিলেন। পরে যখন তিনি এবং ছবিটি দারুণভাবে সফল হলো তখন তিনি এসে নির্মাতার সঙ্গে দেখা করেন। আমজাদ হোসেন খুশিতে তাকে জড়িয়ে ধরেন। ছবিটিতে অভিনয় প্রসঙ্গে এই অভিনেতা বলেন, তখন আমি অভিনয়ের ‘অ’ও জানি না। আমজাদ ভাই যেভাবে বলেছেন ক্যামেরার সামনে শুধু তাই করেছিলাম।’ এটিএম-এর এই সাফল্যে অন্য পরিচালকরাও তাকে একের পর এক খল চরিত্রে কাস্ট করতে শুরু করেন। নারায়ণ ঘোষ মিতা পরিচালিত ‘লাঠিয়াল’ চলচ্চিত্রেও খল চরিত্রে অভিনয় করে দারুণ সুখ্যাতি পান। এ ছাড়া খল চরিত্রে তার অভিনীত আরও কিছু উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র হলো ‘অশিক্ষিত’, ‘গোলাপি এখন ট্রেনে’, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘স্বপ্নের নায়ক’ ‘বৌরাণী’, ‘ভালোমানুষ’ ইত্যাদি। খলনায়কের পাশাপাশি এ টি এম শামসুজ্জামান কৌতুক অভিনেতা হিসেবেও অসাধারণ সফলতা পান। বিশেষ করে কৌতুক অভিনেতা হিসেবে ‘জলছবি’, ‘জাদুর বাঁশি’, ‘রামের সুমতি’, ‘ম্যাডাম ফুলি’, ‘ভণ্ড’, ‘চুড়িওয়ালা’, ‘মন বসে না পড়ার টেবিলে’সহ বেশ কিছু চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয় করে খ্যাতি পান। এ ছাড়াও বেশ কিছু চলচ্চিত্রে তিনি পার্শ্ব-চরিত্রে অভিনয় করেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘অনন্ত প্রেম’, ‘দোলনা’, ‘অচেনা’, ‘মোল্লা বাড়ির বউ’, ‘হাজার বছর ধরে’ ইত্যাদি। তার অভিনীত অন্যান্য ছবির মধ্যে রয়েছে ‘সূর্যদীঘল বাড়ি’, ‘ছুটির ঘণ্টা’, ‘লাল কাজল’, ‘পুরস্কার’, ‘প্রিন্সেস টিনা খান’, ‘ঢাকা ৮৬’, ‘দায়ী কে’, ‘রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত’, ‘তোমার জন্য পাগল’, ‘শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ’, ‘হাজার বছর ধরে’, ‘আমার স্বপ্ন তুমি’, ‘এবাদত’, ‘পরান যায় জ্বলিয়ারে’, ‘কুসুম কুসুম প্রেম’, ‘গেরিলা’, ‘লাল টিপ’, ‘চোরাবালি’, ‘দ্য স্টোরি অব সামারা’, ‘পাংকু জামাই’ ইত্যাদি।

চলচ্চিত্র নির্মাতা...

এটিএম শামসুজ্জামান ২০০৯ সালে প্রথম পরিচালনা করেন শাবনূর-রিয়াজ জুটিকে নিয়ে ‘এবাদত’ নামের ছবিটি। এই ছবির কাহিনি, চিত্রনাট্য তারই ছিল।

 

নাটকে অভিনয়...

চলচ্চিত্রের পাশাপাশি অসংখ্য নাটকেও অভিনয় করেছেন তিনি। ১৯৬৩ সালে টিভি নাটকে তার অভিষেক। প্রথম নাটক বিশিষ্ট টিভি ব্যক্তিত্ব ও নাট্যকার আশকার ইবনে শাইখ পরিচালিত ‘লাঠিয়াল বাহিনী’। তার অভিনীত অন্যান্য নাটকগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘রঙের মানুষ’, ‘ভবের হাট’, ‘ঘর কুটুম’, ‘বউ চুরি’, ‘নোয়াশাল’, ‘শতবর্ষে দাদাজান’ ইত্যাদি।

 

নানা সম্মাননা...

এ টি এম শামসুজ্জামান ‘দায়ী কে’, ‘ম্যাডাম ফুলি’, ‘চুড়িওয়ালা’, ‘মন বসে না পড়ার টেবিলে’ ও ‘চোরাবালি’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। শিল্পকলায় অবদানের জন্য ২০১৫ সালে পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা একুশে পদক। ৪২তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননায় ভূষিত হন তিনি। এ ছাড়াও নানা গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার এ টি এম শামসুজ্জামানের অর্জনের ঝুলিকে করেছে সমৃদ্ধ।

প্রধান চরিত্রে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা...

১৯৮৭ সালে কাজী হায়াত পরিচালিত ‘দায়ী কে?’ চলচ্চিত্রে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান।

 

ব্যক্তি জীবন...

ব্যক্তিজীবনে এ টি এম শামসুজ্জামান বিনয়ী, সদালাপী, মিশুক এবং স্পষ্টবাদী মানুষ। ১৯৪১ সালের ১০ সেপ্টেম্বর নোয়াখালীর দৌলতপুরে নানাবাড়িতে তিনি জনগ্রহণ করেন। গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুর জেলার ভোলাকোটের বড়বাড়ি আর ঢাকায় থাকেন রাজধানীর সূত্রাপুর থানার দেবেন্দ্রাথ দাস লেনে। পড়াশোনা করেছেন ঢাকার পগোজ স্কুল, কলেজিয়েট স্কুল এবং রাজশাহীর লোকনাথ হাই স্কুলে। পগোজ স্কুলে তার বন্ধু ছিল চলচ্চিত্রের আরেক অভিনেতা প্রবীর মিত্র। ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন ময়মনসিংহ সিটি কলেজিয়েট হাইস্কুল থেকে। তারপর জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হন। তার পিতা নূরুজ্জামান ছিলেন নামকরা উকিল এবং শেরেবাংলা একে ফজলুল হকের সঙ্গে রাজনীতি করতেন। মাতা নুরুন্নেসা বেগম। পাঁচ ভাই ও তিন বোনের মধ্যে এ টি এম শামসুজ্জামান সবার বড়। তার স্ত্রীর নাম রুনি জামান। তাদের তিন ছেলের মধ্যে দুজন জীবিত।

নিজের মুখে নিজ জীবনের গল্প...

এ টি এম শামসুজ্জামানের কথায়, নানাবাড়ি নোয়াখালীতে আমার জন্ম। তবে বেড়ে ওঠা ঢাকায়। মানে পুরান ঢাকায়। আগে বাবুবাজারের আরমানীটোলা মাঠের পাশে ভাড়া থাকতাম। সেই বাড়ির ভাড়া ছিল ছয় টাকা। পরে ১৯৫৬ সালে আমাদের সূত্রাপুরের বাড়িটি আট হাজার টাকায় কিনে নেন আব্বা। ওই বছরই পরিবারসহ এই বাড়িতে চলে আসি আমরা। সেই সময় সম্পর্কে একটু ধারণা দিই, তখন একটা বড় সাইজের ইলিশ মাছের দাম ছিল চার আনা। আমার আব্বা বালাম চাল খেতেন। আমার হাতে ২০ টাকা দিয়ে পাঠাতেন এক মণ বালাম চাল নিয়ে আসার জন্য। যা হোক, আমাদের বাসা সূত্রাপুরে থাকলেও আমার খেলার জায়গা ছিল আরমানীটোলা মাঠ। অবশ্য সেই সময় ওই মাঠ ব্যবহৃত হতো রাজনীতির মাঠ হিসেবে। পরে ওটা স্থানান্তরিত হলো পল্টন ময়দানে। অবশ্য তখন পল্টন ময়দান বলতে ছিল পুরোটা ফাঁকা মাঠ। আমাদের সময়ে নিউমার্কেট বলতে ছিল চকবাজার। ঈদের কেনাকাটা সব এখানেই হতো। আমরাও কিনতাম এখান থেকে। আমার আবার প্রতি ঈদেই জুতা কেনার বাতিক ছিল। তবে এখানেই সমস্যা। সব সময় আব্বা কিনে দিতেন বাটা জুতা। সেই জুতা তো সহজে ছেঁড়ে না। একবার ঈদে জুতা কিনব, কথাটি আব্বাকে বলতে পারছি না। কারণ জুতা তো ছিঁড়েনি। কী করি, এক দিন রাতের বেলা সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়েছে, তখন রান্নাঘরে বঁটি নিয়ে জুতা কেটে দুই ভাগ করলাম। সকালবেলা দেখালাম আব্বাকে। দেখে তিনি ঠিকই বুঝলেন, এটা ছিঁড়ে যায়নি, কাটা হয়েছে। তবে কিছু বললেন না। আমার লোভ ছিল ক্যাপসুন জুতার ওপর। বায়না ধরলাম সেই জুতা কেনার জন্য। রাজি হলেন না আব্বা। পরে মায়ের কাছ থেকে টাকা নিয়ে কিনলাম।  কিনেই ওই জুতা সারা রাত বুকের মধ্যে জড়িয়ে রেখেছিলাম।

 

যেভাবে কাটছে সময় এখন...

 বেশ কবছর ধরে অসুস্থ হয়ে আছেন এই গুণী অভিনেতা। গত দুই বছরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় কয়েক দফা হাসপাতালেও কাটাতে হয়েছে তাকে। এখন অনেকটা সুস্থ এই জীবন্ত কিংবদন্তি অভিনেতার সময় কাটে বই পড়ে আর টিভি দেখে।


আপনার মন্তব্য