শুক্রবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ টা

যাত্রাশিল্পের অনুদানে স্থান পাননি দুস্থ শিল্পীরা

মোস্তফা মতিহার

যাত্রাশিল্পের অনুদানে স্থান পাননি দুস্থ শিল্পীরা

আবহমান বাংলার ঐতিহ্য যাত্রাপালার শিল্পীদের অসহায়ত্ব নিয়ে গত ২০ আগস্ট (শুক্রবার) বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রকাশিত হয় ‘মানবেতর জীবনযাপন করছেন যাত্রাশিল্পীরা’ শিরোনামের সংবাদ। এরপরই যাত্রাশিল্পের উন্নয়নে যাত্রার ১০ জন মালিককে ২ লাখ টাকা করে ও নিবন্ধিত ৭২টি দলকে ৫০ হাজার টাকা করে অনুদান প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয় শিল্পকলা একাডেমি। এমন সিদ্ধান্তে যাত্রাশিল্পের মানুষের মাঝেও বইছিল স্বস্তির সুবাতাস। তবে, প্রকৃত দুস্থদের বাদ দিয়ে বিত্তশালী যাত্রা মালিকদের নাম অনুদানের তালিকায় ঘোষণার পর ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে শিল্পের এই আঙিনায়। তেলবাজি ও স্বজনপ্রীতিসহ অনিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অনুদানের তালিকা তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সারা দেশের দুস্থ যাত্রাশিল্পীরা। সম্প্রতি যশোরের মনিরামপুর প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই অনিয়মের প্রতিবাদও জানিয়েছেন তাঁরা।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় যাত্রাশিল্পে অনুদান ও অর্থ সহায়তা প্রদান প্রক্রিয়ায় প্রাথমিক পর্যায়ে ১০ জন পরিচালককে ২ লাখ টাকা করে অনুদান এবং ৭২টি নিবন্ধনপ্রাপ্ত দল মালিককে সহায়তা হিসেবে ৫০ হাজার টাকা করে প্রদানের বিষয়ে শিল্পকলা একাডেমির সিদ্ধান্তের পর স্বস্তির বাতাস বইছিল যাত্রার অঙ্গনে। যাত্রাপালা ফের ঘুরে দাঁড়াবে, সংলাপ আর সুরের মূর্ছনায় আবারও নতুন করে প্রাণের সঞ্চার ঘটবে দেশের যাত্রাশিল্পে, এমন আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দেয় এ শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মাঝে। অনুদানের তালিকায় দুস্থ যাত্রাশিল্পীদের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত ও সচ্ছল যাত্রাশিল্পীদের নাম থাকায় সুসংবাদ পরিণত হয় দুঃসংবাদে, আনন্দ পরিণত হয় বিষাদে। এবার প্রথমবারের মতো ২ লাখ টাকা করে অনুদান পাচ্ছেন- জ্যোৎস্না বিশ্বাস, মিলন কান্তি দে, তাপস সরকার, এস এম শফি, বদরুল আলম দুলাল, হাসান কবির শাহীন, শফিকুল ইসলাম খান, প্রদীপ কীর্তনিয়া, প্রণব ভট্ট ও মাসুদুল হক বাচ্চু। এদের সবাই নিজ নিজ অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত। এর মধ্যে  কানাডায় বসবাস করছেন প্রয়াত অমলেন্দু বিশ্বাসের সহধর্মিণী জ্যোৎস্না বিশ্বাস। নিজের ব্যবসা নিয়ে ভালোই আছেন তাপস সরকার। আইন ব্যবসায় নিয়োজিত অ্যাডভোকেট হাসান কবির শাহীনও বিত্তশালী। মিলন কান্তি দে, এস এম শফি, বদরুল আলম দুলাল, শফিকুল ইসলাম খান, প্রদীপ কীর্তনিয়া, প্রণব ভট্ট ও মাসুদুল হক বাচ্চুও যথেষ্ট সচ্ছল। তবে, কাদের তুষ্ট করার জন্য এ অনুদান। মানবেতর জীবনযাপনে অনাহারে-অর্ধাহারে থাকা যাত্রাশিল্পীদের অনুদান না দিয়ে বিত্তশালীদের নাম ঘোষণায় সরকারি এই অনুদান নিয়ে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বর্তমানে চলছে তুমুল বিতর্ক ও সমালোচনা।

এদিকে, শিল্পকলা একাডেমি সূত্র জানায়, ২ লাখ টাকা করে অনুদানপ্রাপ্ত পরিচালকরা বিভিন্ন জেলার শিল্পকলা একাডেমিতে ১০টি নতুন পালা মঞ্চায়ন করবেন। পরবর্তীতে মানসম্পন্ন পালাগুলো নিয়ে ঢাকায় কেন্দ্রীয়ভাবে একটি যাত্রা উৎসবের আয়োজন করা হবে। অনুদানের মাধ্যমে ঝিমিয়ে পড়া যাত্রাদলগুলো আবার সক্রিয় হওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার কারণে যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি মিলন কান্তি দে শিল্পকলা একাডেমির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেও ভিন্নচিত্র দুস্থ ও অসহায় যাত্রাশিল্পীদের মাঝে। ক্ষোভ প্রকাশ করে অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত যাত্রাশিল্পীরা বলেন, যার আছে সে আরও পায় কিন্তু যার নাই তাকে কেউ-ই দেয় না। তেলামাথায় সবাই তেল দেয় বলেও হতাশার দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন অনেক যাত্রাশিল্পী।

করোনাকালে ক্ষতিগ্রস্ত প্রকৃত যাত্রা মালিকদের অনুকূলে সরকারি প্রণোদনার অর্থ বরাদ্দ এবং অর্থ বিতরণে ঢাকার বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম তুলে ধরার পাশাপাশি যাত্রাশিল্পকে রক্ষায় ও ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রাশিল্পীদের অনুদান প্রদানের জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন দুস্থ যাত্রাশিল্পী ও যাত্রাদলের মালিকরা।

এতে অংশ নেন খুলনা, নাটোর, মাগুরা, কুষ্টিয়া ও বাগেরহাটসহ দেশের বিভিন্ন জেলার যাত্রা মালিক সমিতির নেতারা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা ছিলেন বাংলাদেশ যাত্রা মালিক সমিতির সভাপতি মোশারফ হোসেন নয়ন, যশোরের চৈতালি অপেরার স্বপন পান্ডে, নাটোরের পদ্মা অপেরার মোহাম্মদ হানিফ, পঞ্চগড়ের দি লায়ন অপেরার স্বত্বাধিকারি মো. শরীফুল ইসলাম প্রমুখ। অপেরার মালিক স্বপন পান্ডে বলেন, একটি প্রদর্শনীতে প্রায় লক্ষাধিক টাকা খরচ হবে, কিন্তু আমাদের দেওয়া হবে ৫০ হাজার টাকা। আমরা কেন লোকসান দেব। আমরা খেয়ে না খেয়ে অসহায় অবস্থার মধ্যে বেঁচে থাকলেও শিল্পকলা একাডেমি বিত্তশালী যাত্রা মালিকদেরই অনুদান দিচ্ছে। গরিব চিরকালই মরে। নাটোরের পদ্মা অপেরার মালিক মোহাম্মদ হানিফ অভিযোগ করে বলেন, নানা প্রতিকূলতার মধ্যে থেকেও যাত্রাকে আঁকড়ে ধরে আছি। শুধু ভালোবাসার কারণেই তা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু দিনশেষে অভাগারা চিরকালই অভাগা। যাত্রার মাধ্যমে দীর্ঘদিন যাবৎ সারা দেশের মানুষকে আনন্দ দিয়ে এলেও দিনশেষে আমাদের কপালটাই খারাপ।  জ্যোৎনা বিশ্বাস, তাপস সরকার ও মিলন কান্তি দে শিল্পকলা একাডেমির যাত্রাদল নিবন্ধনের ব্যবস্থাপনা  কমিটিতে থাকার কারণে তাদের মূল্যায়ন হয়েছে।