শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৪ এপ্রিল, ২০১৯ ২৩:৩৪

চাকরির ব্যবসা

মির্জা মেহেদী তমাল

চাকরির ব্যবসা

পাবনার ভবানীপুর এলাকার আল-আমিন পুলিশে চাকরি নেওয়ার একটি লাইন খুঁজে পেয়েছে। সে তার পরিবারকে জানায়, এটা একটা ভালো লাইন। টাকা দিলেই চাকরি হবে। পাবনার ফরিদপুর থানার চকচকিয়া গ্রামের শাকিল আকতার এবং গাইবান্ধার মনিরুল হক মনিরের ওপরে ভালো যোগাযোগ। তাদের বিশ্বাস করা যায়। আলামিন পুলিশে চাকরি পাওয়ার আশায় দুজনের সঙ্গে কথা বলে। তারা মোটা অংকের টাকা দাবি করে। একপর্যায়ে ৩১ লাখ টাকায় দফারফা হয়। কিন্তু নির্ধারিত দিন-তারিখ পেরিয়ে গেলেও তার চাকরি হয় না। আল-আমিনের মতো আরও বেশ কয়েকজন তরুণ এমন অভিযোগ নিয়ে খোঁজ করতে থাকে শাকিল আর মনিরকে। এলাকার লোকজন বুঝতে পারে তারা প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়েছেন। আল-আমিন র‌্যাব-১০-এর সঙ্গে যোগাযোগ করে। র‌্যাব গ্রেফতার করে শাকিল আর মনিরকে। র‌্যাব জানতে পারে, তারা দীর্ঘদিন ধরেই চাকরি দেওয়ার নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ রেলওয়ে, বাংলাদেশ ব্যাংক, ভূমি মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সরকারি অফিসে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে চাকরিপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে ১৬ জনকে গ্রেফতার করে র‌্যাব-৪। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে চক্রের ১৬ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, গ্রেফতার হওয়া এই চক্রের সদস্যরা সংঘবদ্ধভাবে সরকারি চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণা করে আসছিল। গত আট বছরে প্রায় ১৬০ জনের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা। টার্গেট ব্যক্তিকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলার জন্য এ চক্রের সদস্যরা পাঁচটি গ্রুপে ভাগ হয়ে কাজ করত। র‌্যাব জানায়, পত্রিকায় কোনো সরকারি চাকরির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরপরই প্রতারকদের তৎপরতা শুরু হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে কাজ করে তাদের প্রমোটর টিম, যাদের দায়িত্ব চাকরি প্রার্থী সংগ্রহ করা। এই গ্রুপের সদস্যরা মাঠপর্যায়ে কাজ করে। তাদের লক্ষ্য থাকে দেশের বিভিন্ন জেলার শিক্ষিত বেকারদের টার্গেট করে সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির প্রলোভন দেখানো। তারা বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি দেওয়ার কথা বলে প্রার্থীদের কাছ থেকে সিভি, শিক্ষাগত যোগ্যতার ফটোকপি, জন্মসনদ, নাগরিকত্বের সনদ ও পাসপোর্ট সাইজের ছবি সংগ্রহ করে।  চাকরিপ্রত্যাশীদের মনে বিশ্বাস স্থাপনের জন্য সেনাবাহিনীর চাকরির ক্ষেত্রে সেনানিবাসের আশপাশের এলাকায় সুবিধাজনক স্থানে ডেকে প্রার্থীর নাম-ঠিকানা, শিক্ষাগত যোগ্যতাসহ চাকরি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রশ্ন করে ভুয়া মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়। একই রকম পদ্ধতিতে তারা ভূমি অফিস, রেলওয়ে, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অন্যান্য চাকরির ক্ষেত্রে সচিবালয়ের আশপাশে সুবিধাজনক জায়গায় ডেকে পরীক্ষা গ্রহণ করে থাকে। পরে তারা চাকরিপ্রত্যাশীদের মৌখিক ও মেডিকেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণসহ নিয়োগপত্র প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করে এবং নিয়োগপত্র প্রদান করে। এ সময় চাকরিতে যোগদানের তারিখ এবং মৌলিক প্রশিক্ষণ শুরুর তারিখও উল্লেখ করে দেয় তারা। জানা গেছে, প্রতারক চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন পত্রিকা, যাত্রীবাহী বাস ও দেয়ালে লোভনীয় অফার দিয়ে বিজ্ঞপ্তি ছাপায়। ওই বিজ্ঞপ্তি দেখে চাকরিপ্রত্যাশীরা ফোন করতে বাধ্য হয়। প্রতারকরা মোবাইল নম্বরগুলো টার্গেট করে বিভিন্নভাবে প্রলোভন দেখায়। অফিসে যেতে বাধ্য করে। পরে চাকরি দেওয়ার নামে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন সময় চাকরিপ্রত্যাশীদের আটক রেখে মুক্তিপণও আদায় করা হয়। আর মুক্তিপণ না দিলে অনেক সময় মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, প্রতিদিনই বাড়ছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা। প্রতি বছর যে হারে লোকসংখ্যা বাড়ছে, সে হারে বাড়ছে না কর্মক্ষেত্র। এ কারণে দিন দিন চাকরি যেন ‘সোনার হরিণ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে পড়ালেখা শেষ করলেও জুটছে না কাক্সিক্ষত চাকরি। তাই জেলা শহরে ব্যর্থ হয়ে কাজের সন্ধানে অবশেষে শিক্ষিত বেকার যুবকরা ছুটে আসছেন রাজধানীতে। প্রতিযোগিতার যুগে দু-একজন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলেও অধিকাংশই প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব হারাচ্ছেন। দেশে কর্মক্ষেত্র যেমন বাড়াতে হবে, তেমনি বিজ্ঞাপন দেখলেই চাকরির জন্য আবেদন করা ঠিক নয়। দেখেশুনে বুঝে আবেদন করতে হবে।


আপনার মন্তব্য