Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৭ মে, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ৬ মে, ২০১৯ ২২:৪৩

হঠাৎ বাজার লাগামহীন

গরু খাসির মাংসসহ বিভিন্ন পণ্যে সরকার নির্ধারিত দাম মানা হচ্ছে না

নিজস্ব প্রতিবেদক

হঠাৎ বাজার লাগামহীন

এক সপ্তাহ আগেও প্রতি কেজি দেশি মুরগির দাম ছিল কমবেশি ৪৫০ থেকে ৪৮০ টাকা। রোজা শুরুর আগের দিন গতকাল সেই মুরগির দাম কেজিপ্রতি বেড়ে ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। কেজিপ্রতি মাংসের মূল্য হিসেবে গরুকেও ছাড়িয়ে গেছে দেশি মুরগি। দাম বেড়েছে পাকিস্তানি কক মুরগিরও। কেজিপ্রতি অন্তত ২০ টাকা বেড়ে এটি গতকাল ২৮০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। আর ১৪০ টাকা কেজি দরের ব্রয়লার মুরগি গতকাল ১৬৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। গরুর মাংস যথারীতি ৫৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে। তবে সরকারিভাবে গরু ৫২৫ ও খাসি ৭৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। দেশি মুরগির এই অত্যধিক দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে বিক্রেতারা চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হওয়া, খামারগুলোয় বার্ড ফ্লু আতঙ্ক, পরিবহন খরচ বৃদ্ধিসহ ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটকে দায়ী করছেন। মিরপুরের এক মুরগি বিক্রেতা বলেন, বার্ড ফ্লু আতঙ্ক, ভ্যাকসিন ও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের কারণে ব্রয়লার মুরগির চাহিদা কমে গেছে ভোক্তাদের কাছে। অনেকই উৎসব, অনুষ্ঠানের জন্য কক ও দেশি মুরগি বেশি কিনছেন। চাহিদা বাড়লেও সে তুলনায় দেশি মুরগির উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়েনি। এ ছাড়া গ্রামগঞ্জ থেকে দেশি মুরগি কিনে ট্রাকে করে আনতে ঘাটে ঘাটে নানা খাতে টাকাপয়সা দিতে হয়। এ সবই মুরগির দামে যোগ হয়। মুরগির দামের পাশাপাশি রোজার শুরুতে আদা, মুড়ি, চিনি ও ডালের দামও বেড়েছে। চিকন দানার মসুর ডাল (দেশি) এক সপ্তাহ আগেও ৮৫ থেকে ৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। গতকাল ছিল ১০০ টাকা। রোজায় পিয়াজুর চাহিদা বাড়ে। আর এ পিয়াজু বানাতে দরকার খেসারি ডাল ও পিয়াজের। উৎপাদন মৌসুম থাকার পরও দেশি পিয়াজের কেজি ৫ টাকা বেড়ে গতকাল ৩৫ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। খেসারি ডালের দাম কেজিতে ৮ টাকা বেড়ে গতকাল ৬৮ টাকায় উন্নীত হয়েছে।

রোজা এলে ভোক্তাদের কাছে মুড়ি ও চিনির চাহিদাও বেড়ে যায়। সাদা দানার প্রতি কেজি চিনি ৩ টাকা বেড়ে গতকাল ৫৮ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। লাল চিনি বিক্রি হয়েছে ৬৫ টাকা কেজি দরে। বেড়েছে মুড়ির দামও। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের গুঁড়া দুধের দাম প্রতি কেজিতে ২০ টাকা করে বেড়েছে বলেও জানান বিক্রেতারা।

মিরপুরের রূপনগরের খুচরা পণ্য বিক্রেতা বাবু জানান, রমজান মাসকে কেন্দ্র করে কিছু কিছু পণ্যের দাম বেড়ে যায়। তবে এবার দুই মাস আগে থেকেই পাইকারি বিক্রেতারা দাম বাড়ানো শুরু করেছেন। এখন সেই বাড়তি দামেই বিক্রি হচ্ছে। এর পেছনে পাইকারি বিক্রেতাদের সিন্ডিকেট রয়েছে জানিয়ে এই বিক্রেতা বলেন, মৌলভীবাজার পাইকারি দোকানে ১০ মিনিট আগে যে চিনির বস্তা (৫০ কেজি) ২ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, ১০ মিনিট পরে গিয়ে দেখি সেই চিনির দাম ২০০ টাকা বেড়ে গেছে বস্তাপ্রতি। তেমনিভাবে মুড়ির দাম ৫০ কেজির প্রতি বস্তায় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেড়েছে। শুকনা বাজারের পাশাপাশি বেড়েছে মসলাজাতীয় পণ্যের দামও। রোজায় তেমন কোনো চাহিদা না থাকলেও সবচেয়ে বেশি বেড়েছে এলাচের দাম। এ পণ্যটির কেজি ১৭০০ টাকা থেকে বেড়ে ২ হাজার ১০০ টাকায় উন্নীত হয়েছে। বেড়েছে আদা, রসুনের দামও। প্রতি কেজি আদা ২০ টাকা বেড়ে এখন ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বড় আকারের ৯০ টাকা কেজি দরের রসুন বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকায়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সিন্ডিকেট আর পথে পথে চাঁদাবাজি প্রতিরোধে রমজানের আগেই বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। চাঁদাবাজি ও মজুদদারি বন্ধে বিভাগীয় কমিশনারসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে চিঠিও পাঠানো হয়েছে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে পণ্যের মজুদ সম্পর্কেও খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দ্রব্যমূল্য পর্যালোচনা ও পূর্বাভাস সেলের তথ্যানুযায়ী দেশে ভোজ্যতেলের বার্ষিক চাহিদা ১৮ লাখ টন হলেও পবিত্র রমজান মাসে এ চাহিদা দাঁড়ায় ৩ লাখ টন। চলতি অর্থবছরের ৯ মার্চ পর্যন্ত ১৪ লাখ ৬৯ হাজার টন ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে, আর এই সময়ে ঋণপত্র (এলসি) খোলা হয়েছে ১৭ লাখ ৬৬ হাজার টনের। চিনির বার্ষিক চাহিদাও ১৮ লাখ টন এবং রমজানে ৩ লাখ টন। ৯ মার্চ পর্যন্ত চিনি আমদানি হয়েছে ১০ লাখ ৭৩ হাজার টন এবং এই সময়ে এলসি খোলা হয়েছে ১২ লাখ ৪৭ হাজার টন চিনির। পিয়াজ, ছোলা, মসুর ডাল, খেজুর এসব পণ্যও চাহিদার তুলনায় মজুদ ভালো রয়েছে। কর্মকর্তারা জানান, এ মুহূর্তে ছোলা, ডাল, চিনি, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের মজুদ প্রয়োজনের তুলনায় বেশি রয়েছে। তবে এর পরও রোজার শুরুতেই নিত্যপণ্যের বাজার লাগামহীন। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্শি অবশ্য মনে করছেন রমজানের শুরুতে বাজারের এই হঠাৎ লাগামহীনতার জন্য ভোক্তারাই দায়ী। গতকাল সচিবালয়ে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, রমজান মাস এলেই বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার খবর শোনা যায়। এ ক্ষেত্রে ভোক্তারাও দায়ী। কারণ তারা সব পণ্য একসঙ্গে কিনতে চান। আর এ কারণে ব্যবসায়ীরা সুযোগ নেন। তাই এ মাসে ক্রেতাদেরও সংযমী হতে হবে।

বাজারে দ্রব্যমূল্য সহনীয় অবস্থায় আছে- এমন মন্তব্য করে মন্ত্রী বলেন, কিছু পণ্যের দাম যেমন ২-১ টাকা বেড়েছে তেমনি কিছু পণ্যের দাম কমেছে। ২০১৭ ও ’১৮ সালে রমজানের সময় পণ্যের যে দাম ছিল তার চেয়ে এখন অনেকটাই কমেছে। কোনো কোনো জায়গায় দাম বেড়েছে, কিন্তু সব জায়গায় নয়।

টিপু মুন্শি বলেন, ‘বর্তমানে বাজারে শাক-সবজির দামসহ পিয়াজ ও চিনির দাম কিছুটা বেড়েছে। তবে দেশের বাজারে একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তেলের দাম ২ টাকা কমিয়েছে। রোজা সামনে রেখে ছোলার দাম বাড়ার সুযোগ নেই। আমাদের মজুদ পরিস্থিতি ভালো রয়েছে। বাজারে পণ্যের দাম নিয়েও আমরা সার্বিকভাবে সন্তুষ্ট। এবার রমজানে মানুষের ওপর চাপ পড়বে না। রোজা সামনে রেখে আমাদের মনিটরিং টিম যথেষ্ট সচেতন রয়েছে।’

রমজানে গরুর মাংস ৫২৫, খাসি ৭৫০ টাকা : রমজানে রাজধানীর বাজারে মাংসের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। গতকাল নগর ভবনে মাংস ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক শেষে গরুর মাংস ৫২৫ ও খাসির মাংসের দাম ৭৫০ টাকা নির্ধারণ করেন মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন।

নির্ধারিত দাম অনুযায়ী এবার রমজানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় দেশি গরুর মাংস বিক্রি হবে প্রতি কেজি ৫২৫ টাকায়, যা গত বছর ছিল ৪৫০ টাকা। বিদেশি গরুর মাংস বিক্রি করতে হবে প্রতি কেজি ৫০০ টাকায়, যা গত বছর ছিল ৪২০ টাকা। মহিষের মাংস বিক্রি করতে হবে প্রতি কেজি ৪৮০ টাকায়, যা গত বছর ছিল ৪২০ টাকা। খাসির মাংস বিক্রি করতে হবে প্রতি কেজি ৭৫০ টাকায়, যা গত বছর ছিল ৭২০ টাকা। ভেড়া বা ছাগির মাংস নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি কেজি ৬৫০ টাকা, যা গত বছরও একই দামে ছিল। রমজানে সাধারণ মাংসের দোকানের পাশাপাশি বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট স্টোরেও সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত দামে মাংস বিক্রি করতে হবে। বৈঠকে উপস্থিত মাংস ব্যবসায়ীদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তেই এ দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। বৈঠক শেষে মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, ‘নির্ধারিত দামের চেয়ে কোথাও বেশি দামে মাংস বিক্রি করা হলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া ডিপার্টমেন্ট স্টোরগুলোয় গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী মাংস বিক্রি করা যাবে।’


আপনার মন্তব্য