শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ২৩:২৯

দ্বিতীয় বিলোনিয়া যুদ্ধ ছিল সুইসাইডাল অপারেশন

লে. কর্নেল (অব.) জাফর ইমাম বীরবিক্রম

দ্বিতীয় বিলোনিয়া যুদ্ধ ছিল সুইসাইডাল অপারেশন

২৫ মার্চ রাতে ছিলাম পাকিস্তান আর্মিতে। আমাদেরকে পশ্চিম পাকিস্তানে পোস্টিং দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছিল। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কৌশলে পর্যায়ক্রমে পালিয়ে আসি ৯৮ জন অফিসার। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। আমাকে পাঠানো হয় ফেনীতে। মে-জুনের মাঝামাঝির ঘটনা। পাকিস্তানের এক ব্রিগেড আর্মি ট্যাংক, এয়ারফোর্স সাপোর্ট নিয়ে ফেনীতে অবস্থান করছিল। বৃহত্তর নোয়াখালীর সাব-সেক্টর কমান্ডার হওয়ায় তিনটি প্লাটুনের মতো প্রশিক্ষিত ফোর্স ছিল আমার অধীনে। আমরা ফেনী শহরকে মুখ করে চার মাইল লম্বা ডিফেন্স নেই। পুরো এলাকায় মাইন স্থাপন করি। পাকিস্তানিরা সাত-আটবার আক্রমণ করেছিল। কিন্তু মাইন ফিল্ডের দু-তিনশ গজের মধ্যে আসলেই খইয়ের মতো ফুটত মাইন। অসংখ্য পাকিস্তানি সেনাকে ছিটকে পড়ে কাতরাতে দেখেছি। যখনই তারা আক্রমণ করত, বাঙ্কারের মধ্য থেকে জয় বাংলা স্লোগানে মুখরিত হতো। সেই সঙ্গে শুরু হতো গুলি। ফলে তারা কখনো আমাদের পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি। আড়াই মাসের এই সম্মুখযুদ্ধে তাদের তিন শতাধিক সৈন্য হতাহত হয়। এটা ছিল প্রথম বিলোনিয়া সম্মুখযুদ্ধে গণযোদ্ধা ও নিউক্লিয়াস অব ১০ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ঐতিহাসিক সামরিক অভিযান। ফেনী ও চৌমুহুনী ছিল চট্টগ্রাম থেকে পাকিস্তানিদের অস্ত্র ও সেনা পাঠানোর গেটওয়ে। এ জন্যই ফেনীকে মুখ করে ডিফেন্স নিয়েছিলাম। পর পর আটটি হামলায় বিফল হয়ে নবম হামলায় আমাদের পেছনে হেলিকপ্টার দিয়ে কমান্ডো নামায়। সামনে ট্যাংকসহ ভারী অস্ত্র। আমাদের ঘেরাও করে ফেলে। আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলাম মাঠ ছাড়ব না। তখন ইন্ডিয়ান আর্মির জেনারেল সিন্ধু আমাকে মেসেজ দিয়ে বললেন, পিছিয়ে যাওয়াও সেনা কৌশল। মুহুরী নদীর পাড়ে চলে আস। পাকিস্তানিরা আসলে আক্রমণ কর। আমরা তাই করলাম। মুহুরী নদীর পাড়ে পরশুরাম, চিতলিয়া, ফুলগাজীকে মুখ করে ডিফেন্স নিলাম। জুলাই থেকে শুরু করলাম রেইড অ্যামবুশ। বিভিন্ন রেল ব্রিজ উড়িয়ে দিলাম। চৌদ্দগ্রাম হাইওয়ে যেন ব্যবহার করতে না পারে সেজন্য ইমাম-উজ জামানের নেতৃত্বে অনেকগুলো রেইড হয়েছে। এভাবে পাকিস্তানিদের ব্যতিব্যস্ত রাখলাম। এর মাঝে আমরা তাদের অবস্থানে আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফের নির্দেশে অক্টোবরে সহযোদ্ধাদের নিয়ে ১০ম বেঙ্গল গঠন করি। এটা বাংলাদেশে এখনো দুর্ধর্ষ টেন নামে পরিচিত। আমাকে ক্যাপ্টেন থেকে মেজর পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। প্রস্তুতি নিতে শুরু করি দ্বিতীয় বিলোনিয়া যুদ্ধের। এটা ছিল সুইসাইডাল অপারেশন। রাতের অন্ধকারে তাদের দুটি শক্ত ঘাঁটি ঘেরাও করব। প্রতি ঘাঁটিতে প্রায় দেড়-দুই কোম্পানি ফোর্স। আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

সেকেন্ড ব্যাটল অব বিলোনিয়া হয় ৫ নভেম্বর। শত্রুর ঘরে অনুপ্রবেশ করতে যাচ্ছি। হয়তো ফিরব না। আমি ১০ম বেঙ্গলকে আরও শক্তিশালী করতে বেঙ্গল রেজিমেন্ট থেকে একটি কোম্পানি চাই। তখন শফিউল্লাহ ফোর্স থেকে ক্যাপ্টেন হেলাল মোর্শেদকে (পরে মেজর জেনারেল) পাঠানো হয়। এবার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পালা। শীতের রাত। টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। গাছের পাতাগুলো শিরশির করে আওয়াজ করছে। আমরা মুহুরী নদী ক্রস করে দেড় কিলোমিটার অন্ধকার পিচ্ছিল রাস্তায় হেঁটে দুটি ঘাঁটির মাঝ দিয়ে গিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাই। যুদ্ধ সরঞ্জামসহ প্রায় দেড় হাজার যোদ্ধা। বিদ্যুৎ চমকালেই স্থির দাঁড়িয়ে পড়তাম। ফের চলা শুরু। অন্ধকারে দুই গজের মধ্যেও কাউকে চেনা যাচ্ছিল না। কাশি দেওয়া বা কথা বলা নিষেধ। রাতেই আমরা বাঙ্কার করে শত্রুদের ঘিরে ফেলি। ভোরে চিথলিয়া ঘাঁটি থেকে পরশুরাম ঘাঁটির দিকে আসছিল একটা রেলের ট্রলি। তাতে একজন ক্যাপ্টেন লোধিসহ আরও চারজন। ফায়ার করতে নিষেধ করি সবাইকে। কিন্তু আমাদের হাবিলদার (পরে নায়েক সুবেদার) ইয়ার আহম্মেদ উত্তেজনা ধরে রাখতে পারেননি। গুলি করে ট্রলির সবাইকে শেষ করে দেন। এরপর লোধির দেহটাকে টেনে বাঙ্কারে আনতে গেলে গুলিতে শহীদ হন। তাকে বীরবিক্রম উপাধি দেওয়া হয়। পাকিস্তানিরা বুঝে যায় তাদেরকে ঘেরাও করা হয়েছে। তুমুল ফায়ারিং শুরু হলো। কিছুক্ষণ পর পাকিস্তানি মিগ ফাইটার এসে গুলিবর্ষণ করে। আমাদের ১১ জন শহীদ হন।

লেখক : বীরবিক্রম, সাব-সেক্টর কমান্ডার, বৃহত্তর নোয়াখালী এবং অধিনায়ক ১০ম ইস্ট বেঙ্গল (যুদ্ধকালীন) সাবেক সংসদ সদস্য, মন্ত্রী। অনুলেখক : শামীম আহমেদ।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর