শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২০ জানুয়ারি, ২০২০ ২৩:৩৯

শেখ হাসিনার জনসভায় গুলি করে ২৪ জনকে হত্যা

৩২ বছর পর পাঁচজনের ফাঁসি

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

৩২ বছর পর পাঁচজনের ফাঁসি
চট্টগ্রামের আদালতে গতকাল আসামিদের হাজির করা হয়

৩২ বছর আগে ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা ও ২৪ জনকে হত্যার ঘটনায় ‘চট্টগ্রাম গণহত্যা’ মামলা হয়েছিল। চট্টগ্রাম নগরীর লালদীঘি ময়দানে আওয়ামী লীগের জনসভায় পুলিশ গুলি চালিয়ে ওই ঘটনা ঘটিয়েছিল। গতকাল সেই গণহত্যা মামলার রায়ে তৎকালীন ৫ পুলিশ সদস্যের মৃত্যুদন্ড দিয়েছে আদালত। মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন- চট্টগ্রাম কোতোয়ালি থানার তৎকালীন প্যাট্রল ইন্সপেক্টর  গোবিন্দ চন্দ্র মন্ডল (মামলার বিচার শুরু থেকেই পলাতক), কনস্টেবল মোস্তাফিজুর রহমান, প্রদীপ বড়ুয়া, মো. আবদুল্লাহ এবং মমতাজ উদ্দিন। দন্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় মৃত্যুদন্ডের পাশাপাশি প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। এ ছাড়া দন্ডবিধির ৩২৬ ধারায় প্রত্যেকের আরও ১০ বছর করে কারাদন্ড দেওয়া হয়। বিভাগীয় বিশেষ জজের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা চট্টগ্রামের জেলা ও দায়রা জজ ইসমাইল হোসেন এ রায় দেন।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী পরে জানান, গত রবিবার রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে যুক্তি উপস্থাপন করে। গতকাল আসামিপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন করার কথা ছিল। কিন্তু আসামিপক্ষ যুক্তি উপস্থাপনে অসম্মতি জানালে আদালত তাৎক্ষণিক রায়ের সময় নির্ধারণ করে। তিনি আরও জানান, আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের পর ১৯৯৭ সালের ২২ অক্টোবর থেকে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। মামলার মোট সাক্ষী ১৬৭ জন। গত ১৪ জানুয়ারি ৫৩ জনের সাক্ষ্য গ্রহণের মধ্য দিয়ে সাক্ষ্য কার্যক্রম শেষ হয়। এ ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শী আওয়ামী লীগ নেতা তৎকালীন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ড. অনুপম সেন, সাংবাদিক অঞ্জন কুমার সেন ও হেলাল উদ্দিন চৌধুরীসহ বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী মামলায় সাক্ষ্য দেন। মামলার অন্যতম সাক্ষী অ্যাডভোকেট সম্ভুচন্দ্র নন্দী বলেন, এই রায় ঘোষণার পর পর্যবেক্ষণে বলেন ২৩ জানুয়ারি ১৯৮৮ সালের এই হত্যাকান্ডের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। খুনিদের লক্ষ্য ছিল বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা করা। এই রায়ের মাধ্যমে আমরা কলঙ্কমুক্ত হলাম। আসামিপক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার সাইয়্যেদ মঈনুল আহসান বলেন, এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করব। কারণ দন্ডাদেশপ্রাপ্তদের চারজন সেদিন কেউই ঘটনাস্থলে ছিলেন না। আদালতে তার প্রমাণও দিয়েছি। আদালত ও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি নগরীর লালদীঘি ময়দানে জনসভায় যাওয়ার পথে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার গাড়িবহরে পুলিশ এলোপাতাড়ি গুলি চালালে নিহত হন ২৪ জন। আহত হন কমপক্ষে দুই শতাধিক মানুষ। এটি সারা দেশে ‘চট্টগ্রাম গণহত্যা’ হিসেবে পরিচিতি পায়। এ ঘটনায় নিহতরা হলেন- হাসান মুরাদ, মহিউদ্দিন শামীম. স্বপন কুমার বিশ্বাস, এথলেবারট গোমেজ কিশোর, স্বপন চৌধুরী, অজিত সরকার, রমেশ বৈদ্য, বদরুল আলম, ডি কে চৌধুরী, সাজ্জাদ হোসেন, আবদুল মান্নান, সবুজ হোসেন, কামাল হোসেন, বি কে দাশ, পঙ্কজ বৈদ্য, বাহার উদ্দিন, চান মিয়া, মৈসর দত্ত, হাশেম মিয়া, মো. কাশেম, পলাশ দত্ত, আবদুল কুদ্দুস, গোবিন্দ দাশ, মো. শাহাদাত। এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯২ সালের ৫ মার্চ ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষ থেকে প্রয়াত আইনজীবী শহীদুল হুদা বাদী হয়ে চট্টগ্রাম মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় হত্যাকান্ডের সময় চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) কমিশনারের দায়িত্বে থাকা মীর্জা রকিবুল হুদাকে প্রধান আসামি করা হয়। এতে রকিবুল হুদাকে ‘হত্যার নির্দেশদাতা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে বহুল আলোচিত মামলাটি পুনরুজ্জীবিত হয়। আদালতের নির্দেশে সিআইডি দীর্ঘ তদন্ত শেষে প্রথম দফায় ১৯৯৭ সালের ১২ জানুয়ারি সিএমপির তৎকালীন কমিশনার মীর্জা রকিবুল হুদাকে এবং পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালের ৩ নভেম্বর দ্বিতীয় দফায় অধিকতর তদন্তের মাধ্যমে মীর্জা রকিবুল হুদাসহ ৮ পুলিশ সদস্যকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে। অভিযুক্ত অন্যরা হলেন- কোতোয়ালি জোনের তৎকালীন প্যাট্রল ইন্সপেক্টর (পিআই) জে সি মন্ডল, পুলিশ কনস্টেবল আবদুস সালাম, মোস্তাফিজুর রহমান, প্রদীপ বড়ুয়া, বশির উদ্দিন, মো. আবদুল্লাহ এবং মমতাজ উদ্দিন। আসামিদের মধ্যে রকিবুল হুদা, বশির উদ্দিন ও আবদুস সালাম মারা গেছেন। জে সি মন্ডল পলাতক আর বাকি চারজন আদালতে নিয়মিত হাজিরা দিয়ে আসছিলেন। আদালতে দুই দফায় আলোচিত এ মামলার চার্জ গঠন (দ্বিতীয় দফায় সংশোধিত আকারে) করা হয়। প্রথম দফায় ১৯৯৭ সালের ৫ আগস্ট এবং দ্বিতীয় দফায় ২০০০ সালের ৯ মে ৮ আসামির বিরুদ্ধে দন্ডবিধির ৩০২/২০১/১০৯/৩২৬/৩০৭/১১৪/৩৪ ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর