শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ৩১ মে, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩০ মে, ২০২০ ২৩:৪২

মানব পাচার সিন্ডিকেট চালায় কারা

মরক্কোয় বসে লিবিয়ায় মাফিয়াদের ত্রাস

মাহবুব মমতাজী

মরক্কোর রাজধানীতে বসে লিবিয়ায় মানব পাচারে ত্রাসের রাজত্ব করছে মাফিয়ারা। এই মাফিয়া সিন্ডিকেটের হোতাদের বাড়ি সিলেট ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। গত বছর মার্চে পাচারের শিকার এক ব্যক্তির মাধ্যমে এই সিন্ডিকেটের তথ্য পায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। ২৮ মে লিবিয়ায় মানব পাচার সিন্ডিকেটের হাতে ২৬ বাংলাদেশি নিহতের ঘটনায় আবারও ছায়াতদন্তে নেমেছে সংস্থাটি। এদের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, সিলেট আর চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকেও লিবিয়ায় মানব পাচারের ওই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করা হয়। শুধু সিলেট থেকেই লিবিয়ায় তারা পাঁচ শতাধিক মানুষকে পাচার করেছে। পাচারের সময় ব্যবহার করা হয়েছে অন্তত ৩০০ ধরনের পথ। পাশাপাশি পাচারের ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের সদস্যরা আলজেরিয়ার ভিজিট ভিসা ব্যবহার করত। পরে পাচারের শিকার মানুষদের আলজেরিয়া থেকে লিবিয়া নেওয়া হতো বলে জানা গেছে। সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার ফারুক হোসেন এ প্রতিবেদককে জানান, ২৬ বাংলাদেশি নিহতের ঘটনায় ছায়াতদন্ত শুরু করেছে তাদের মানব পাচার ইউনিট। এ দেশ থেকে তারা কীভাবে, কাদের মাধ্যমে, কোন এজেন্সির হয়ে লিবিয়া পৌঁছেছে সে বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে। তবে এ বিষয়ে খুব দ্রুত জড়িতদের শনাক্ত করা যাবে।

জানা যায়, লিবিয়ায় মানব পাচার রোধে কয়েক বছর ধরে তদন্ত করে আসছে সিআইডি। গত বছর মার্চে পাচারের শিকার সুমন নামে একজনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সে সময় সুমন তাদের বলেন, ‘স্যার, আমি যদি পরবর্তী সময়ে আপনাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারি তাহলে ধরে নেবেন পাচারকারীরা আমাকে মেরে ফেলেছে, নয় তো ইতালিতে পাচার করে দিয়েছে।’ এসব কথোপকথনের মাস দেড়েকের মধ্যে সুমনের সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে পারেননি তারা। সিআইডি কর্মকর্তাদের গোপনে অনলাইনের মাধ্যমে সুমন জানিয়েছিলেন, লিবিয়ায় মানব পাচারের মাফিয়া আতিক আহমদ। তার গ্রামের বাড়ি সিলেটের বিশ্বনাথে। সে সময় সুমনসহ অন্তত ৩৬ জন আতিকের দুই বাসায় জিম্মি হয়ে ছিলেন। আতিক এবং তার পরিবারের যে-কেউ একটি মোবাইল নম্বরের বিকাশ অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে। সে নম্বরটি হলো ০১৭৩৮২৩৪৯১৯। জিম্মি দশা থেকে মুক্তি পেতে এ নম্বরের টাকা পাঠাতে হতো। এ ছাড়া আতিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট কিংবা হুন্ডির মাধ্যমে লেনদেন করে থাকে। ইসলামী ব্যাংকের সিলেট বিশ্বনাথ শাখার মেসার্স ফারুক অ্যান্ড ব্রাদার্স-২ (অ্যাকাউন্ট নম্বর-৫৪৭৫) নামের অ্যাকাউন্টে লেনদেন করত মাফিয়ারা। পূবালী ব্যাংকের সিলেট শাখায়ও তার অ্যাকাউন্ট আছে। ওই অ্যাকাউন্টটি হলো- ১১২০৯০১০১০৮৪৯। এ ছাড়া আতিকের আরও একাধিক হুন্ডি রয়েছে। মরক্কোর রাজধানীর রাবাতে আতিকের দুটি বাসা আছে। এখানেই সে বিভিন্নজনকে জিম্মি করে রাখে। তার সিন্ডিকেটে আছে বদরুল ওরফে বদরুল আলম নামে আরও একজন। তার বাড়ি সিলেটের বিয়ানীবাজারে। তাকে ‘ইউরোপ দালাল’ হিসেবে বিয়ানীবাজারে সবাই ভালো চেনেন। জিম্মি দশায় থাকা যাত্রীদের কাছ থেকে সে ১২ থেকে ১৪ লাখ টাকা জমা নিয়ে থাকে। বিয়ানীবাজারে জামান প্লাজা নামে একটি মার্কেটে রূপসী ক্লথ হাউস নামে একটি কাপড়ের দোকান আছে। সেই দোকানে লিবিয়া থেকে ইউরোপে পাঠানোর কথা বলে যাত্রীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা জমা নেওয়া হতো। যখন ইউরোপে পৌঁছে যেত তখন রূপসী ক্লথ হাউস তার কমিশন রেখে বদরুলকে বাকি টাকা দিয়ে দিত। লিবিয়ার মানব পাচার সিন্ডিকেটের তৃতীয় মাফিয়া আলম ওরফে সাইফুল আলম। তারও বাড়ি সিলেটে। মরক্কোর রাজধানীর রাবাতে তার চারটি বাসা আছে। সে তার বাসায় ইউরোপে পাঠানোর কথা বলে ২০০ জন লোককে জিম্মি করে রাখে। তার মোবাইল ও ইমো, হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর +৮৮০১৮৮২-৪৩১০৫৬। সে দুবাই, দিল্লি, বিয়ানীবাজারে নিয়মিত চলাফেরা করে। এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা দুবাই, দিল্লি আর তুরস্ক মিলে পাচারের সময় ৩০০ ধরনের পথ অবলম্বন করে থাকে। এই সিন্ডিকেটের চতুর্থ ব্যক্তি সাজিদুর রহমান সাজিদ ওরফে রাজন। তার চলাফেরা ঢাকার মতিঝিল, ফকিরাপুল, পল্টনে। তার গ্রামের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জে। তার মোবাইল ও ইমো নম্বর ০১৭০৩৫০৫৫৩৮। সাজিদ ঢাকা টু দিল্লি, দিল্লি টু রাবাত ভিসা করে থাকে। এই সাজিদের মাধ্যমেই সিলেট থেকে কমপক্ষে ৫০০ জনকে লিবিয়া পাঠানো হয়। ২০১৮ সালের আগস্ট মাসে ভারতের বিভিন্ন বিমানবন্দরে আলজেরিয়ার ভিসা দেখে বাঙালিদের যখন ফিরিয়ে দেওয়া হতো, তখন সাজিদ ঢাকার হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে যোগাযোগ করে সিলেটে বাড়ি ওই সব যাত্রীকে ঢাকা-দুবাই, ঢাকা-দোহা রুটে ফ্লাইট দিত। সেখান থেকে তাদের আলজেরিয়া নিত। ভিসাগুলো হতো দিল্লিতে আলজেরিয়ার দূতাবাস থেকে। জানা যায়, ভাগ্য বদলের আশায় বিদেশ পাড়ি জমাতে গিয়ে লিবিয়ায় নির্যাতিত হন অসংখ্য বাংলাদেশি। এদের একজন হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের সাবাজুল ইসলাম। তাকে দক্ষিণ আফ্রিকায় নেওয়ার কথা বলে লিবিয়ায় আটকে রেখে দালাল চক্র নির্যাতন করছিল বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। চক্রটি সাবাজুলের মুক্তিপণ বাবদ ১০ লাখ টাকা দাবি করে। টাকা না দিলে তাকে মেরে ফেলার হুমকিও দিয়েছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীর পরিবার ও স্বজনরা। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ছয় মাস আগে দালাল নূর আলীর প্রলোভনে পড়ে দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্দেশে দেশ ছাড়েন চুনারুঘাটের তারাশুল গ্রামের সাবাজুল। দালালরা তাকে দক্ষিণ আফ্রিকার বদলে লিবিয়ায় নিয়ে আটকে রেখে নির্যাতন করে। মানব পাচার তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা থেকে মানব পাচারকারী চক্রের সদস্যরা প্রথমে ভিজিট ভিসায় বাংলাদেশিদের শ্রীলঙ্কায় পাঠায়। সেখান থেকে দুবাই নেয়। আবার কখনো কখনো মিসরের আলেকজান্দ্রিয়া নিয়ে যায়। সেখান থেকে দুবাই হয়ে লিবিয়ার বেনগাজিতে নিয়ে আসে। এরপর সুযোগ বুঝে তারা ইউরোপে পাঠায়। এর আগে একটি ঘরে যাত্রীদের জিম্মি করে রাখে। ২৮ মে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত ২৬ জন বাংলাদেশির অধিকাংশই দিল্লি-দুবাই হয়ে বেনগাজি এসেছিলেন।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর