শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১০ ডিসেম্বর, ২০২০ ২৩:৩০

দুই তীর ঘিরেই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ

হংকংয়ের আদলে গড়ে উঠবে নগর - স্থাপন হবে অর্থনৈতিক জোন শিল্প-কারখানা - প্রতি বছর জিডিপিতে যোগ হবে ৩৫ হাজার কোটি টাকা

রুকনুজ্জামান অঞ্জন

সবশেষ স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে গতকাল প্রমত্তা পদ্মার দুই পারের মধ্যে এমন এক সংযোগ গড়ে তোলা হলো, যা নিয়ে এতদিন দেশের মানুষ শুধু আশায় বুক বেঁধেছে। সেই আশার বেলুনে এবার লেগেছে উত্তুঙ্গ হাওয়া। এবার মানুষের চোখে পিছিয়ে পড়া দক্ষিণাঞ্চল ও পদ্মার দুই পারের উন্নয়ন নিয়ে স্বপ্ন খেলা করছে। সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে, পদ্মা সেতুকে ঘিরে এর দুই পারে গড়ে তোলা হবে হংকংয়ের মতো উন্নত ও সমৃদ্ধ জনপদ। যার প্রভাবে পাল্টে যাবে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি। উন্নয়ন প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা বলছেন, পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে নদীর পাশেই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, অলিম্পিক ভিলেজ, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, নৌবন্দর, অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনাল,  বিশেষ অর্থনৈতিক জোন, ইকোনমিক করিডর, আধুনিক রেল, সড়ক ও নৌ- এই ত্রিমুখী যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। সড়ক, নৌ, আকাশপথের সঙ্গে সহজ ও সাশ্রয়ী যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠার পাশাপাশি স্থাপনা তৈরির জন্য প্রচুর জমি থাকায় পদ্মার দুই পার হয়ে উঠবে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের ‘কমার্শিয়াল ও বিজনেস হাব’।

সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালের ৬ জুলাই পদ্মা সেতুর কাজ শুরু হওয়ার পর প্রথমে পদ্মার পারে ‘হংকং’র আদলে নতুন শহর তৈরির পরিকল্পনা নিতে কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেন। পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন নিয়ে গতকাল সন্ধ্যায় এক প্রতিক্রিয়ায় পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এই সেতুকে ঘিরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের যে পরিকল্পনা রয়েছে, সেটি বাস্তবায়ন করতে পারলে পুরো দেশের অর্থনীতি বদলে যাবে। দক্ষিণাঞ্চল তথা বাংলাদেশের কৃষি-শিল্প-অর্থনীতি-শিক্ষা-বাণিজ্য সব ক্ষেত্রেই পদ্মা সেতুর বিশাল ভূমিকা থাকবে। পদ্মার দুই পারে অর্থনৈতিক জোন গড়ে উঠবে। নতুন নতুন বিনিয়োগ আসবে। বিশেষায়িত অর্থনৈতিক জোনে স্থাপন হবে নতুন নতুন শিল্প-কারখানা। উন্নয়ন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সেতু দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার সঙ্গে শুধু রাজধানী ঢাকার যোগসূত্র স্থাপন করবে তাই নয়, একে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের প্রথম কোনো সমন্বিত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে উঠবে। দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলায় ইতিমধ্যে শিল্পায়নের কাজ শুরু হয়েছে। বিশেষ করে মোংলা বন্দরে বেশ কয়েকটি সিমেন্ট ফ্যাক্টরি গড়ে উঠেছে। গার্মেন্টসহ রপ্তানিমুখী নানা ধরনের শিল্প-কারখানাগুলোও শিল্প স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। এ ছাড়া পদ্মা নদীর দুই পাশে এবং চরাঞ্চলেও বেসরকারি খাতের শিল্প স্থাপনের উৎসাহ দেওয়া হবে বলে সরকারের সংশ্লিষ্টরা বলছেন। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের কথা মাথায় রেখে দোতলা এ সেতুতে যানবাহনের পাশাপাশি রেল সংযোগ স্থাপন হচ্ছে। এ পথটি ট্রান্স-এশীয় রেলপথের অংশ হবে। যাত্রীবাহী ট্রেনের পাশাপাশি চলবে মালবোঝাই ট্রেন। মোংলা বন্দর ও বেনাপোল স্থলবন্দরের সঙ্গে রাজধানী এবং বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। পাশাপাশি পটুয়াখালীর পায়রায় প্রস্তাবিত গভীর সমুদ্রবন্দর ও দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ‘এনার্জি হাব’ তৈরির কাজ শেষ হয়ে গেলে পাল্টে যাবে দক্ষিণাঞ্চলের আর্থ-সামাজিক চিত্র। পুরো দেশের অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এই সেতু নিয়ে খুলনা চেম্বারের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পদ্মা সেতু নির্মাণের পর পায়রা বন্দরের গুরুত্বও বাড়বে। প্রয়োজনীয় আধুনিকায়ন করা হলে এই বন্দরও এক বৃহত্তম বন্দরে রূপান্তরিত হবে। এমনকি ভুটান, পূর্ব নেপাল ও ভারতের দক্ষিণ-পূর্ব প্রদেশের জন্য পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দর হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারবে।

প্রতি বছর যোগ হবে ৩৫ হাজার কোটি টাকা : বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর পর্যালোচনা বলছে, পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশে উন্নীত হবে। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর রিপোর্টে বলা হয়েছে, পদ্মা সেতু অর্থনীতিতে জিডিপির ১ শতাংশেরও বেশি যোগ করবে। বিশ্বব্যাংক বলেছে, পদ্মা সেতু চালু হলে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়বে ১ শতাংশ হারে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) মতে, এ সেতুর ফলে দেশের জিডিপি ১ দশমিক ২ ও আঞ্চলিক জিডিপি ৩ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। বিবিএসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এ পরিমাণ জিডিপি বাড়লে পদ্মা সেতু দেশের অর্থনীতিতে প্রতি বছর কমবেশি ৩৫ হাজার কোটি টাকা যোগ করবে।

সরাসরি উপকৃত হবে ৩ কোটি মানুষ : বিশ্বব্যাংকের এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ৩ কোটি মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে, যা মোট জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশ। এ সেতুর মাধ্যমে আঞ্চলিক বাণিজ্য সমৃদ্ধ হবে, পাশাপাশি দারিদ্র্য বিমোচন হবে এবং উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির গতি ত্বরান্বিত হবে। দেশের দক্ষিণাঞ্চল থেকে রাজধানী ঢাকার দূরত্ব গড়ে ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত কমবে। কমবে মানুষ ও পণ্য পরিবহনের সময় ও অর্থ। বদলে যাবে কৃষিতে উন্নত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জীবনমান। খুব সহজেই স্বল্পতম সময়ে তাদের কৃষিপণ্য রাজধানী ঢাকায় চলে আসবে। যানবাহন রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি ও আমদানি ব্যয় হ্রাস পাবে। এ সেতুর মাধ্যমে শিল্পায়ন ও বাণিজ্যিক কর্মকান্ড প্রসারের লক্ষ্যে পুঁজির প্রবাহ বাড়বে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের জন্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়ে যাবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

ভবিষ্যতের বাংলাদেশ : ১৯৭১ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথার ৫০তম বছরের দ্বারপ্রান্তে এসে তাঁর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের মানুষ আরও একটি বীরত্বগাথা রচিত হতে দেখল। তীব্র স্রোত নিয়ে বঙ্গোপসাগরের দিকে বয়ে যাওয়া প্রমত্তা পদ্মা, যার বুক দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে (মাওয়া পয়েন্টে) ১ লাখ ৪০ হাজার ঘনমিটার পানি প্রবাহিত হয় (বিশ্বে অ্যামাজন নদী ছাড়া আর কোনো নদী দিয়ে এত বেশি পানি প্রবাহিত হয় না); এমন একটি নদীর তলদেশে পিলারের পর পিলার তুলে, নিজস্ব অর্থায়নে দুই পারের মধ্যে যে সংযোগ গড়ে তোলা হলো- এটিকে কেবল একটি সেতু না বলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের সাহসী বীরত্বগাথা বলেই মন্তব্য করেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। তাঁর মতে, এই সেতু নির্মাণে যেসব চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, বারবার নানা ধরনের বাধা তৈরি হয়েছে-সেসব বাধা অতিক্রম করা মোটেও সহজ ছিল না। আর এতসব চ্যালেঞ্জের মধ্যে প্রমত্তা পদ্মার বুক চিরে দুই পারের মধ্যে যে সেতুবন্ধ রচিত হলো সেটি তো আসলে ভবিষ্যতের উন্নত বাংলাদেশকেই প্রতিফলিত করে। ইতিহাসের স্মরণীয় এই দিনটিকে মাথায় রেখে তিন বছর আগে এই কথাটিই এক লেখায় উল্লেখ করেছিলেন পদ্মা সেতু প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ দলের প্রধান জাতীয় অধ্যাপক ও প্রকৌশলী জামিলুর রেজা চৌধুরী। প্রয়াত এই শিক্ষাবিদ সেই সময় বলেছিলেন, ‘পদ্মা সেতুকে ঘিরে পদ্মার দুই পারে সিঙ্গাপুর ও চীনের সাংহাই নগরের আদলে শহর গড়ে তোলার কথাবার্তা হচ্ছে। নদীর দুই তীরে আসলেই আধুনিক নগর গড়ে তোলা সম্ভব। এই সেতুকে ঘিরে পর্যটনে যুক্ত হবে নতুন মাত্রা। অনেক আধুনিক মানের হোটেল-রিসোর্ট গড়ে উঠবে। এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই সেতু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ২০৩৫-৪০ সালে বাংলাদেশ যে উন্নত দেশ হবে, সে ক্ষেত্রেও এই সেতু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সব মিলিয়ে বলা যায়, স্বপ্নের এই সেতুকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ।’


আপনার মন্তব্য