শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ৪ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩ জানুয়ারি, ২০২১ ২৩:০৬

তিন বিষয়ে গুরুত্ব দিতে পুলিশকে নির্দেশনা প্রধানমন্ত্রীর

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী

তিন বিষয়ে গুরুত্ব দিতে পুলিশকে নির্দেশনা প্রধানমন্ত্রীর

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুলিশ বাহিনীকে জনগণের মৌলিক অধিকার, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

গতকাল গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রাজশাহীর সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিতে ৩৭তম বিসিএস-পুলিশ ব্যাচের শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপারদের প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে তিনি এ আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে              জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘তোমরা জনগণের পুলিশ’ বক্তব্যের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনী পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় জনগণের মৌলিক অধিকার, মানবাধিকার ও আইনের শাসনকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেবে। আমরা গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে দেশের মানুষের জীবনের শান্তি, নিরাপত্তা নিশ্চিত করব।’ জাতির পিতার চিন্তার বাস্তবায়ন করতে হলে পুলিশ বাহিনীর অনেক দায়িত্ব রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি আশা করি এই দায়িত্বটা তোমরা পালন করবে। তোমাদের শৃঙ্খলা, পেশাদারিত্ব, সততা এবং নৈতিক মূল্যবোধ নিয়ে চলতে হবে। সব সময় দেশের মানুষের পাশে থাকতে হবে। মানুষের সেবা করতে হবে। মানুষের সেবা করাটাই তোমাদের কর্তব্য। সেটা মনে রাখতে হবে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মোস্তফা কামাল উদ্দীন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। পুলিশের আইজি ড. বেনজীর আহমেদ স্বাগত বক্তৃতা করেন।

অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম, পুলিশ একাডেমির প্রিন্সিপাল খন্দকার গোলাম ফারুক, স্থানীয় সংসদ সদস্যবৃন্দ এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান অনুষ্ঠানে প্রশিক্ষণ গ্রহণকালে কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপারদের মাঝে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে পুরস্কার বিতরণ করেন। সব বিষয়ে কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য সহকারী পুলিশ সুপার স্নেহাশিষ কুমার দাস ‘বেস্ট প্রবেশনার’ পুরস্কার লাভ করেন। অনুষ্ঠানে শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপারদের শপথবাক্য পাঠ করানো হয়। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্রীয় সালাম জানানো হয় এবং তিনি মনোজ্ঞ কুচকাওয়াজ প্রত্যক্ষ করেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, গতানুগতিক অপরাধের পাশাপাশি সাইবার ক্রাইম, মানি লন্ডারিং, মানব পাচার ইত্যাদি বৈশ্বিক অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও মাদকের মতো মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি এবং নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা-নির্যাতনসহ নিত্যনতুন সামাজিক অপরাধ। এসব অপরাধকে আরও দক্ষতার সঙ্গে দমন করতে হবে। পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করে শেখ হাসিনা বলেন, কেবল দেশে নয়, এজন্য বিদেশে পাঠিয়ে উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এটা অব্যাহত রাখা দরকার। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, একটা সময় অন্তর অন্তর প্রশিক্ষণ দিলে তারা যতক্ষণ কাজে থাকবেন, তাদের কর্মদক্ষতা আরও বৃদ্ধি পাবে। সে ব্যবস্থাও করতে হবে।’ ফেসবুক, অ্যাপস বা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে গুজব ছড়ানো বা মিথা তথ্য প্রদানসহ কিশোর ও উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা নানা অপরাধে যুক্ত হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সেখান থেকে তাদের বের করে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নিতে হবে। সাধারণভাবে গুজব রটানো বা এ ধরনের কাজ যেন করতে না পারে সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের মনে রাখতে হবে যে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা, মানুষের সেবা দেওয়া, তাদের জীবনমান উন্নত করা-এটাই হচ্ছে আমাদের সব থেকে বেশি প্রয়োজন।’ প্রধানমন্ত্রী নবীন পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘বাংলাদেশকে সবাই মিলে আমাদের এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।’ তিনি বলেন, বাংলাদেশ যদি উন্নত হয়, তবে, গ্রাম-গঞ্জে ছড়িয়ে থাকা আপনাদের আত্মীয়-স্বজন এবং পরিবারের সদস্যরাই উপকৃত হবে। তাদের জীবন সুন্দর হবে, তারাই নিরাপদে বাঁচতে পারবেন বা ভবিষ্যৎ বংশধরদের জীবনটা সুন্দর হবে। সেদিকে লক্ষ্য রেখেই জাতির পিতার স্বপ্নের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত অসাম্প্রদায়িক উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের সরকারেরও সেটাই দায়িত্ব।

পুলিশের বাজেট ২০০৯ সালের ৩ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২০-২০২১ অর্থবছরে ১৬ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে উল্লেখ করে সরকারপ্রধান অপরাধ দমনে পুলিশের নতুন ইউনিট প্রতিষ্ঠায়ও তাঁর সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরেন।

পিবিআই, ট্যুরিস্ট পুলিশ, নৌ-পুলিশ, স্পেশাল সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রটেকশন ব্যাটালিয়ন, ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ, নারী আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন, এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন ও কক্সবাজার এলাকার নিরাপত্তার জন্য দুটি আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন গঠন করার তথ্যও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে পুলিশ অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ) এবং কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি) গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া অপরাধী শনাক্তকরণ এবং তদন্তে প্রকৃত তথ্য উদঘাটনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ পুলিশের সাইবার পুলিশ সেন্টার, ডিএনএ ল্যাব, অটোমেটেড ফিঙ্গারপ্রিন্ট আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম এবং আধুনিক রাসায়নিক পরীক্ষাগার স্থাপন করা হয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ পুলিশে সংযোজিত হতে যাচ্ছে সর্বাধুনিক অপারেশনাল গিয়ার ‘টেকটিক্যাল বেল্ট’ যাতে অপারেশনাল ডিউটিতে অফিসার এবং ফোর্সগণ হ্যান্ডফ্রি রেখে অধিকতর দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

পুলিশের জন্য কমিউনিটি ব্যাংক, আটটি বিভাগীয় শহরে বাংলাদেশ পুলিশ পরিচালিত আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের উদ্যোগ এবং বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিকে ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ হিসেবে গড়ে তোলায় তাঁর সরকারের পদক্ষেপসমূহও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

করোনার কারণে ‘মুজিববর্ষে’ পুলিশের জন্য গৃহীত ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা সম্ভবপর না হওয়ায় সেখানকার বাজেট গৃহহীনদের জন্য তাঁর সরকারের গৃহনির্মাণ কর্মসূচিতে ব্যয়ের পদক্ষেপ গ্রহণ করায় প্রধানমন্ত্রী সব পুলিশ সদস্যকে ধন্যবাদ জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘করোনার কারণে বিশ্বব্যাপী একটি স্থবির অবস্থার সৃষ্টি হলেও বাংলাদেশ পুলিশ অত্যন্ত সাহসী ভূমিকা পালন করেছে।’ মৃতের সৎকার বা রোগাক্রান্তকে চিকিৎসা কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া বা ঘরে ঘরে রিলিফ পৌঁছে দেওয়ায় পুলিশের ভূমিকার প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী কর্তব্য পালনকালে মৃত্যুবরণকারী পুলিশ সদস্যদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান।

তিনি আরও বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে আত্মীয়-স্বজন লাশ ফেলে চলে গেছে কিন্তু আমার পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা সেখানে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন।’ সে কারণে পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের চিকিৎসার জন্য রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালের পাশাপাশি তিনি একটি হাসপাতাল ভাড়া করে তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের পুলিশে পৃথক একটি মেডিকেল ইউনিট গঠন করাটা একান্তভাবে দরকার বলে আমি মনে করি। তাদের নিজস্ব একটি মেডিকেল ইউনিট থাকুক যারা এই চিকিৎসাসেবা দেখবে।’ তা ছাড়া ঢাকার বাইরে বিভিন্ন বিভাগ ও জেলাগুলোতে পুলিশ হাসপাতালগুলোর উন্নয়ন ও আধুনিকায়নে সরকার যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ পুলিশের সার্বিক তত্ত্বাবধানে পরিচালিত জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’ এর মাধ্যমে কেউ ফোন করলে তাৎক্ষণিক মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে পুলিশ এবং তাদের সেবা প্রদান করছে।


আপনার মন্তব্য