শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১ মার্চ, ২০২১ ২৩:৪২

বাঙালির জাতিরাষ্ট্র সুদীর্ঘকালের শ্রেষ্ঠ অর্জন

আ স ম রব

বাঙালির জাতিরাষ্ট্র সুদীর্ঘকালের শ্রেষ্ঠ অর্জন

আমাদের জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ সুদীর্ঘকালের শ্রেষ্ঠ অর্জন। অগণিত মানুষের আত্মদানের ফসল আমাদের স্বাধীনতা। আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি কিন্তু মুক্তির জন্য এখনো চলছে অসমাপ্ত সংগ্রাম। আমাদের সশস্ত্র সংগ্রামে বাঙালির অনমনীয় সংকল্প ও অদমনীয় বীরত্ব বিশ্ব ইতিহাসের অংশ।

এ অঞ্চলের রাজনীতিতে আমরা বাঙালিরাই ইতিহাস তৈরি করেছি, এখন হয়তো অন্যরা ইতিহাস লিখবে। বাঙালি জাতিরাষ্ট্রের আকাক্সক্ষার প্রতিনিধি হয়ে আমি ১৯৭১ সালের ২ মার্চ স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলনের দায়িত্ব                 পালনের সৌভাগ্য অর্জন করেছিলাম। ‘পতাকা উত্তোলন’-এর ঐতিহাসিক ক্ষণের অংশীদার স্বাধীনতাকামী ছাত্রনেতা নূরে আলম সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজ এবং আবদুল কুদ্দুস মাখনসহ অন্য ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ। এ গৌরব আমাদের সবার। ৩ মার্চ শাজাহান সিরাজ ‘স্বাধীনতার ইশতেহার’ পাঠ করেন। আমরা চারজন শপথবাক্য পাঠ করি। কামরুল আলম খান খসরু আনুষ্ঠানিক গান ফায়ার করে সশস্ত্র যুদ্ধের বার্তা দেন। স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আমরা চারজন ক্ষুদ্র জীবনে বড় সম্পদ অর্জন করেছি। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এক প্রবন্ধে লিখেছিলেন, তারকার মতো আমার আজ ঐশ্বর্য। তাই আমি সকল যন্ত্রণা ক্লেশ সহ্য করব, সব দুঃখ কষ্ট আমার বুকের মধ্যে টেনে নেব, কারণ আমি অন্তরে যে আনন্দ পেয়েছি তাকে পার্থিব কোনো বস্তুই চেপে রাখতে পারে না! এ আনন্দই অনন্ত শক্তির আকর। স্বাধীনতা অর্জনে আমাদের ক্ষুদ্র ভূমিকা কোনো কিছুর বিনিময়ে কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না। আমরা ছিলাম বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত সহচর।

আমাদের স্বপ্ন, ধ্যান-ধারণা-চিন্তা, কর্ম সব ছিল স্বাধীনতাকে কেন্দ্র করে। আমরা বুঝতে পেরেছিলাম ‘জীবন-মৃত্যু পায়ের ভৃত্য করে’ স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষা নিতে হবে। বহু আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় অগ্নিঝরা মার্চে পতাকা উত্তোলন, ইশতেহার পাঠ, ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, ২৬ ও ২৭ মার্চ সশস্ত্র বাহিনীর অভাবনীয় বিদ্রোহ এবং গণমানুষের অসীম উৎসাহ, অপরিমেয় তেজ এবং অদম্য সাহসে সশস্ত্র সংগ্রামের যে অগ্নিশিখা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল তার পরিণতিতে একাত্তরের পট পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে। কারও অবদান অস্বীকার করে আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র বিনির্মাণ করা যায় না। স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র অর্জনের যে অহংকার পৃথিবীর আর কিছুই তার সমতুল্য হতে পারে না। কিন্তু গত ৫০ বছরে প্রজাতন্ত্রকে যে চেতনায় বিনির্মাণ করার কথা ছিল আমরা ক্ষমতার স্বার্থে সে চেতনাকে বিলুপ্ত করে দিয়েছি। ফলে স্বাধীনতা যে বিপুল আত্মসম্মানের, অপরিমেয় অহংকারের তা আমাদের অনেকের বিবেচনায়ই নেই। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে মনে পড়ে জাতির স্থপতি বঙ্গবন্ধুর কথা। যিনি বাঙালির হাজার বছরের শৃঙ্খল ভেঙে দৈন্য, গ্লানি অতিক্রম করে স্বাধীনতার সূর্য ছিনিয়ে আনতে সব বিরোধ ছাপিয়ে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা হয়ে উঠেছিলেন। ফলে তাঁর অনুপস্থিতিতে তাজউদ্দীন আহমদ মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের নেতৃত্ব দিলেও আমরা যুদ্ধ করেছি বঙ্গবন্ধুর নামে। আমাদের স্বাধীনতার জন্য অন্যতম নিবেদিত প্রাণপুরুষ সিরাজুল আলম খান। যিনি আমাদের কাছে স্বাধীনতার স্বপ্নের সারথি। যিনি তরুণ ছাত্র যুব সমাজকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করার প্রেরণাদাতা। স্বাধীনতা অন্তঃপ্রাণ সিরাজুল আলম খান ছিলেন বঙ্গবন্ধুর একান্ত ও খুবই আস্থাভাজন। বঙ্গবন্ধু ও সিরাজুল আলম খানের রাজনৈতিক নৈকট্য, পারস্পরিক গভীর আস্থা এবং অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক ভবিষ্যৎ ইতিহাসের এক অত্যাবশ্যক শর্ত হবে।

সিরাজুল আলম খান অনন্যসাধারণ বাঙালি। পরিচিতি, খ্যাতি, অর্থ ছাড়া যে সমাজে অন্য কোনো চাওয়া নেই, সেই সমাজের বাসিন্দা হয়েও পদ-পদবি অর্থ ক্ষমতা কোনো কিছুই তাঁকে স্পর্শ করেনি। ইতিহাসে জায়গা নেওয়ার প্রশ্নেও তিনি উদাসীন। তিনি বিশ্বাস করেন পৃথিবীতে জাহির করার কিছু নেই। সিরাজুল আলম খানকে কেউ অস্বীকার করে ইতিহাস থেকে মুছে দিলেও তিনি কাউকে বিন্দুমাত্র অভিযুক্ত করবেন না। এমন মানুষ সমাজে বিরল। বিজ্ঞানী নিউটন বলেছিলেন অকূল সমুদ্রের উপকূলে তিনি কয়েকখানা নুড়ি সংগ্রহ করেছেন মাত্র। সিরাজুল আলম খান সেই চেতনার প্রেরণা নিয়েই দেশের জন্য এখনো বিরামহীন কাজ করে যাচ্ছেন। ইতিহাসের দায় শোধ করবার জন্য, ইতিহাসে থাকার জন্য নয়। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর এই লগ্নে ব্যক্তিজীবনে যাঁদের নেতৃত্ব, যাঁদের সাহচর্য এবং যাঁদের নির্দেশনা পেয়ে জাতিরাষ্ট্র নির্মাণের অংশীদার হয়েছিলাম তাঁদের আজ গভীরভাবে উপলব্ধি করছি। তাঁদের প্রতি সীমাহীন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। এ স্বল্প পরিসরে সবর নাম উচ্চারণ করারও সুযোগ নেই। বঙ্গবন্ধুর কাছে আমাদের অপরিসীম ঋণ। অন্যদিকে সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মণি, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদের কাছে আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা। রাষ্ট্র নির্মাণে তাঁদের অবিস্মরণীয় অবদান বাঙালির অন্তস্তলকে আলোড়িত করেছে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে আমাদের জাতিগতভাবে আত্মসমীক্ষার প্রয়োজন। স্বাধীনতার অর্থ রাজনৈতিক স্বাধীনতা, সামাজিক সাম্য আর অর্থনৈতিক মুক্তি। জীবনের এ ক্রান্তিলগ্নে এসে একটাই প্রত্যাশা- বাংলাদেশ যেন গণতান্ত্রিক, নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের বুকে দৃষ্টান্তসহ স্থায়িত্ব লাভ করে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর