শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৪ আগস্ট, ২০২১ ২২:৫৯

আফগান সরকার অবরুদ্ধ

কাবুলের ৫ কিলোমিটারের মধ্যে তালেবান

প্রতিদিন ডেস্ক

আফগান সরকার অবরুদ্ধ
Google News

তালেবানরা কাবুলের চারদিক দিয়ে আফগান সরকারকে ঘিরে ফেলেছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত গতকাল সন্ধ্যায় তালেবানরা অনেকটা বিনা বাধায় কাবুলের ৫ কিলোমিটার এলাকায় ঢুকে পড়ে। এরপর তারা কাবুল সরকারকে অবরুদ্ধ করে। সূত্র : বিবিসি, রয়টার্স, আলজাজিরা, পার্স টুডে।

এদিকে সরকার পতনকে ঘিরে নানা নাটকীয় খবর পাওয়া গেছে। যেমন অবরুদ্ধ অবস্থায় প্রেসিডেন্ট আশরাফ  গনি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে তালেবানদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। পাশাপাশি সরকারের তরফ থেকে আবারও তালেবানদের আলোচনার মাধ্যমে ক্ষমতা ভাগাভাগির প্রস্তাব দেওয়া হয়। আরেক খবরে বলা হয়, গতকাল যুক্তরাষ্ট্র তার দূতাবাসকর্মীদের নিরাপত্তা ও তাদের উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার জন্য তিন হাজার সদস্যের একদল মার্কিন মেরিন সেনা পাঠিয়েছে। এ সময়ই ‘অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আফগান সরকারকে উৎখাতের’ একটি খবর ফাঁস হয়েছে। আফগানিস্তানের গণমাধ্যম দৈনিক অ্যারিয়া নিউজ ফাঁস করা এ খবরে বলেছে, আমেরিকা আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে একটি নীরব অভ্যুত্থান ঘটানোর পরিকল্পনা করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, মার্কিন সেনারা প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি ও ভাইস প্রেসিডেন্ট আমরুল্লাহ সালেহসহ শীর্ষস্থানীয় আফগান কর্মকর্তাদের কাবুলস্থ মার্কিন দূতাবাসে নিয়ে আসবে। এ সময় তাদের রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থতার দায়ভার নিয়ে পদত্যাগ করার আহ্বান জানানো হবে। হুমকির মুখে তারা পদত্যাগ করলে আফগানিস্তানের জনপ্রিয় নেতাদের নিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি রাজনৈতিক পরিষদ গঠন করা হবে। ওই পরিষদের একজন নেতাকে অস্থায়ী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব দিয়ে তালেবানের হাতে আফগানিস্তানের রাষ্ট্রব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পতন ঠেকানোর চেষ্টা করা হবে। অ্যারিয়া নিউজ আরও জানিয়েছে, এরইমধ্যে অভ্যুত্থানের প্রাথমিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে এবং প্রেসিডেন্ট গনি মার্কিন সেনাদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানালে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের বিরুদ্ধে বল প্রয়োগেরও পরিকল্পনা করে রাখা হয়েছে। আরও খবর : তালেবান বিদ্রোহীরা গতকাল দুপুরে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের সাত মাইল দক্ষিণে চার আসিয়াব জেলায় পৌঁছে যায়। তারা কাবুলের ৪০ মাইল (৭০ কিলোমিটার) দক্ষিণের শহর লোগার প্রদেশের পুল-ই-আলম দখল করে নেওয়ার পর থেকেই রাজধানী দিকে অগ্রসর হয়। পুল-ই-আলমে তালেবানদের খুব বেশি প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়নি বলে জানা গেছে। এরপরই তারা বিদ্যুৎ গতিতে রাজধানীর উপকণ্ঠে পৌঁছে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত কয়েকদিন ধরে চারদিকে তালেবানের বিজয় উৎসব চলছে। আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে থেকে তারা দখল করে নেয় প্রাদেশিক রাজধানীসহ সীমান্ত এলাকা। এভাবে তালেবান ১৮টি প্রাদেশিক রাজধানী তাদের নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয়েছে। এদিকে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণের পর এক বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি বলেন, ‘আমরা সরকারের সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ এবং আমাদের আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সবার সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করছি। আলোচনা এখনো চলছে এবং খুব শিগগিরই এর ফল জানিয়ে দেওয়া হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি বুঝতে পারছি যে আপনারা আপনাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। আমি আপনাদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে আপনাদের আশ্বস্ত করতে চাই যে, অস্থিতিশীলতা, সহিংসতা এবং আমার দেশের জনগণের বাস্তুহারা হয়ে পড়া রোধ করার উপায় খুঁজে বের করব।’

 

তালেবানের ‘সহজ জয়’ মানতে পারছেন না আফগানরা :  হেরাত ও কান্দাহারের বাসিন্দারা এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না, তালেবান কীভাবে এত দ্রুত শহর দুটির নিয়ন্ত্রণ নিল। সেখানে বিদ্রোহীদের আক্রমণের বিপরীতে বলতে গেলে কোনো প্রতিরোধই গড়তে পারেনি বা গড়েনি সরকারি বাহিনী। এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। কান্দাহারের এক নারী  বলেন, ‘ওরা আসলে আমাদের বিক্রি করে দিয়েছে, সরকারের কোনো প্রতিরোধই ছিল না। কখনো ভাবিনি, কান্দাহার এত দ্রুত দখল হয়ে যাবে।’ একই সুর শোনা গেছে আরও অনেকের মুখে। হেরাতে তালেবানবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘আপরাইজিং ফোর্স’-এর এক সমর্থক বলেন, মূলত এসব জায়গা ওদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।

দূতাবাস থেকে কর্মী ফেরাচ্ছে ইউরোপের দেশ : ব্রিটেন, জার্মানি, ডেনমার্ক, স্পেনসহ একাধিক ইউরোপের দেশ কাবুলে তাদের দূতাবাসের কর্মীদের দেশে ফেরানো শুরু করেছে। এ কাজে সাহায্য করছে গতকাল কাবুলে আসা তিন হাজার আমেরিকান মেরিন সেনা।

এদিকে তালেবানদের ভয়ে লাখ লাখ মানুষ প্রাণ বাঁচাতে কাবুলে এসে আশ্রয় নিয়েছে। রাজধানী এখন কার্যত শরণার্থী শিবিরে পরিণত হয়েছে। ভবিষ্যতে কী হবে তা কেউ জানে না, বলছেন আতঙ্কিত সাধারণ আফগান মানুষ। অন্যদিকে পেন্টাগনের তরফ থেকে বলা হয়েছে- এখনই কাবুলে আক্রমণ হবে না। পেন্টাগনের মুখপাত্র জন কার্বি বলেন, ‘এখনই আক্রমণ করবে তালেবানরা, ওরা কাবুলকে এখন বিচ্ছিন্ন করছে। রাজধানী বাদ দিয়ে দেশের একের পর এক শহর, সেনাঘাঁটি দখল করে নিয়েছে জঙ্গি গোষ্ঠীটি। জায়গায় জায়গায় উড়ছে তাদের সাদা পতাকা।’ 

ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ভাষ্য : ব্রিটেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেন ওয়ালেস হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন যে, আফগানিস্তান একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে এবং দেশটিতে আল কায়েদার পুনরুত্থান হতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমি অত্যন্ত বিচলিত যে, ব্যর্থ রাষ্ট্রগুলো এ ধরনের লোকজনের জন্য চারণক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে।’

জাতিসংঘের আহ্বান : সরকারি বাহিনী ও তালেবান যোদ্ধাদের লড়াইয়ের বলি হচ্ছে সাধারণ মানুষ। সংঘাতে শুধু গত মাসেই ১ হাজারের বেশি বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছে। যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ বাড়িঘর হারিয়েছে। প্রাণ বাঁচাতে সংঘাতপূর্ণ এলাকা ও শহরগুলো থেকে হাজারও সাধারণ মানুষ নিরাপদে আশ্রয়ের আশায় রাজধানী কাবুলের দিকে ছুটছে। বাস্তুচ্যুত সাধারণ মানুষের জন্য আশপাশের দেশগুলোকে সীমান্ত খোলা রাখার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ।

তালেবানের দখল করা এলাকাগুলোয় নারীদের অধিকার চরমভাবে লঙ্ঘন করার ‘ভয়াবহ’ তথ্য এসেছে বলে জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। স্থানীয় সময় গত শুক্রবার সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান তিনি।

কূটনৈতিক বৈঠক : কাতারের রাজধানী দোহায় আফগান সরকার ও তালেবানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ কয়েকটি দেশের কূটনীতিকেরা। বৈঠকের পর বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে আফগানিস্তানে শান্তিপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি প্রাদেশিক রাজধানী ও অন্য শহরগুলোতে হামলা বন্ধ করার দাবি জানানো হয়। বৈঠকে পাকিস্তান, জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। আলোচনায় সব পক্ষই আফগান সংকটের কার্যকরী রাজনৈতিক সমাধানের দাবি জানায়।

ভারতকে হুঁশিয়ারি তালেবানের : ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তালেবানের মুখপাত্র মুহাম্মদ সোহেল শাহীন বলেছেন, আফগানিস্তানে ভারত যদি নিজেদের উপস্থিতির জানান দেয়, তবে তা তাদের জন্য ভালো হবে না। শাহীন বলেন, ‘যদি ওরা (ভারত) আফগানিস্তানে সৈন্য পাঠায় তাহলে তা তাদের জন্য ভালো হবে না। কারণ আগে যারা সামরিক শক্তি নিয়ে এখানে এসেছে, তাদের ভবিতব্য দেখেছে ভারত। তো এটা তাদের জন্য খোলা বই।’