রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অনিশ্চয়তায় দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছে। অবশ্য এ স্থবিরতা শুরু হয়েছে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ই। সে স্থবিরতা গত বছরের ৫ আগস্টের পর আরও বেড়েছে।
এ অবস্থা শিগগিরই কেটে যাওয়ার মতো তেমন কোনো উদ্যোগও চোখে পড়ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যবসায়ীদের কোনো ধরনের সহযোগিতা করছে না। সরকার শত চেষ্টা করেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। মানুষ জীবন ও মালের নিরাপত্তা নিয়ে চরমভাবে শঙ্কিত। ফলে বিনিয়োগ নেই।
কর্মসংস্থান হচ্ছে না। জিনিসপত্রের দাম কমানো যাচ্ছে না। মূল্যস্ফীতিও চড়া। রাজস্ব আদায়ে ভাটা পড়েছে। সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রেও লাগাম টানা হয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ১ শতাংশের কম এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে। মানুষের জীবনমানও নেমে যাচ্ছে। এদিকে ঢাকাসহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাশাপাশি জাতীয় রাজনীতিতে প্রতিনিয়ত গতিপ্রকৃতি পাল্টাচ্ছে। সারা দেশে চলমান মব ভায়োলেন্স কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না। মানুষের আয় কমে গেছে আশঙ্কাজনকভাবে। ফলে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে স্থবিরতা কাটেনি বছর পেরোনো সত্ত্বেও। গত এক বছরে বন্ধ হয়ে গেছে অসংখ্য কলকারখানা। বেকার হয়েছে লাখ লাখ মানুষ। এর প্রভাবে দারিদ্র্যের হার ২৮ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। মানুষ আশঙ্কাজনকভাবে ভোগের মাত্রা কমিয়ে এনেছে। অনেক মানুষ প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবারও গ্রহণ করতে পারছে না। এদিকে দেশের ব্যাংক খাতের অচলাবস্থা তো আছেই। ব্যবসায়ীরা কোনোভাবেই নতুন বিনিয়োগে আস্থা পাচ্ছেন না। বাংলাদেশ ব্যাংকের অসহযোগিতায় বহু ব্যবসায়ী ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। এক বছরে অনেক কারখানা বন্ধ হওয়ার কারণে যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ গত ২০ বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ে এসেছে। অবশ্য ডলারের সংকট কিছুটা কমেছে। ডলারবাজারের অস্থিরতাও কমেছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ রেমিট্যান্স বৃদ্ধি, ডলারের চাহিদা হ্রাস। কেননা মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির সূচক নেতিবাচক পর্যায়ে চলে গেছে আরও আগেই। এর ফলে কর্মসংস্থানও নেই। ব্যবসাবাণিজ্যে মন্দা পরিস্থিতি। মানুষ কোনোরকমে জীবনযাপন করছে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান বলেন, ‘বিনিয়োগ ও ব্যবসাবাণিজ্যের পরিবেশের উন্নতি হয়নি। কেননা বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন বিনিয়োগ করার মতো যথেষ্ট আস্থা নেই; বরং কোথাও কোথাও অবনতি হয়েছে। ফলে উৎপাদন খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাংলাদেশে কর ও রাজস্ব নীতিগুলো প্রতি বছর পরিবর্তিত হয়। এর ফলে বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকেন। তাই অনেকেই উৎপাদন খাতে মূলধন ঝুঁকির চেয়ে বাণিজ্য ও সেবা খাতে বিনিয়োগ করাকে বেশি নিরাপদ মনে করেন। সামনে যে বাজেট আসছে সে বাজেটে ব্যবসাসহায়ক নীতি গ্রহণ করা গেলে ও রাজনৈতিক পরিবেশ স্বাভাবিক হলে ব্যবসাবাণিজ্যে গতি ফিরতে পারে।’ অন্যথায় অর্থনীতি আরও সংকটের দিকেই যাবে বলে তিনি মনে করেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, দ্রুত নির্বাচন না হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা কঠিন হয়ে যাবে। এতে অর্থনৈতিক সংকট আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। খোদ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিনিধিরাও স্বীকার করেছেন দেশের অর্থনীতির অবস্থা খুবই ভঙ্গুর। এ কারণে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের জন্য সময়সীমা বৃদ্ধির আবেদন করা হচ্ছে। অন্যদিকে আর্থিক সংকটের কারণে ব্যয়ের লাগাম টানছে সরকার। শুধু তাই নয়, বাজেট ব্যয়ের পরিধিও কমিয়ে আনা হচ্ছে। আসছে ২০২৫-২৬ বাজেটের আকার কমিয়ে আনা হয়েছে। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) বলছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে এসেছে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান স্থবির হয়ে পড়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে এমন অবস্থার উন্নতি করা সম্ভব নয়।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলছে, দেশের অর্থনীতি আরও অন্তত দুই বছর শ্লথ থাকবে। এরপর গতি বাড়তে পারে। চলতি অর্থবছর শেষে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশে নেমে আসার আশঙ্কাও করা হচ্ছে। সরকারও বলছে, অর্থনীতি ও ব্যবসাবাণিজ্যের গতি কমায় কর্মসংস্থান কমেছে। ফলে বেড়েছে বেকারত্ব।