শিরোনাম
প্রকাশ : ৩০ মে, ২০২১ ১১:৩৮
আপডেট : ৩০ মে, ২০২১ ১৫:৩৫
প্রিন্ট করুন printer

করোনার পর নতুন আতঙ্ক : ফাঙ্গাসের সংক্রমণ

অধ্যাপক এবিএম আবদুল্লাহ

করোনার পর নতুন আতঙ্ক : ফাঙ্গাসের সংক্রমণ
অধ্যাপক এবিএম আবদুল্লাহ
Google News

করোনাভাইরাস পৃথিবীব্যাপী তার তাণ্ডবলীলা-ধ্বংসলীলা চালিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যেই বৈশ্বিক মহামারীর মধ্যে করোনার দ্বিতীয় ঝড়ে বিপর্যস্ত ভারতে মাথাচাড়া দেওয়া ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের পরপরই হোয়াইট এবং ইয়োলো ফাঙ্গাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে মহামারীর মতো। করোনা থেকে সেরে ওঠার পরও মানুষের মধ্যে স্বস্তি নেই। নতুন আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে বিভিন্ন ফাঙ্গাসজনিত বিরল রোগ ব্ল্যাক, হোয়াইট এবং ইয়োলো ফাঙ্গাসের উপস্থিতি।

ভারতে করোনা সংক্রমণের রোগীদের প্রায় ১২ হাজার মানুষের শরীরে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। ইতিমধ্যে এ ফাঙ্গাসে আক্রান্ত হয়ে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সম্প্রতি ভারতের রাজ্য সরকার একে মহামারী হিসেবে ঘোষণা করেছে। করোনার ভারতীয় ধরন বাংলাদেশে শনাক্তকরণ করা হয়েছে কয়েকজনের মধ্যে। ভারতের পর বাংলাদেশেও ব্ল্যাক ফাঙ্গাসও শনাক্ত হয়েছে। রোগ-শোক তো আর সীমানা মানে না, মানুষ এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে গিয়ে যে কোনো রোগজীবাণু ছড়িয়ে দেয়। তাই ভারতের অবস্থা বিবেচনা করে আমাদের সাবধান হতে হবে। দেশে সম্প্রতি করোনার ভারতীয় ধরনের সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে। ব্ল্যাক ফাঙ্গাসও শনাক্ত হয়েছে। কাজেই মানুষের জীবন তথা রাষ্ট্রের সুরক্ষার কথা চিন্তা করে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। তবে এ নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার কোনো বিকল্প নেই।

করোনার সংক্রমণের সুস্থতার সময় অথবা সুস্থ হয়ে ভালো হওয়ার ১২ থেকে ১৮ দিন পরে এ বিরল ফাঙ্গাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। করোনা থেকে সুস্থ হওয়া মানুষের মধ্যে এ রোগ যেভাবে সংক্রমিত হচ্ছে তা নিঃসন্দেহে আতঙ্কের। রোগটি হয় ছত্রাক বা ফাঙ্গাস দ্বারা, যার নাম হলো ‘মিউকরমাইকোসিস’। ছোঁয়াচে না হলেও মিউকর নামের এ ছত্রাকের সংস্পর্শে এলেই এ রোগের সংক্রমণের বিস্তার লাভ করে। তবে মিউকরমাইকোসিস কিন্তু নতুন কোনো ছত্রাক নয়, বহু আগে থেকেই প্রাকৃতিক পরিবেশে আছে ব্ল্যাক, হোয়াইট এবং ইয়োলো ফাঙ্গাসসহ অনেক ছত্রাকের উপস্থিতি। 

ব্ল্যাক, হোয়াইট ও ইয়োলো ফাঙ্গাস কী?
এগুলো এক ধরনের ছত্রাক বা মিউকর, যা সর্বব্যাপী, আমাদের চারপাশের আর্দ্র, অস্বাস্থ্যকর, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে এ ছত্রাক তৈরি হয়। এগুলো সাধারণত পাওয়া যায় মাটি, গাছপালা, গাছের নিচে পড়ে থাকা পচা পাতা, বিষ্ঠা বা পশুর গোবর, জৈবসার, পচে যাওয়া বা পচন ধরা যে কোনো ফলমূল বা খাদ্যদ্রব্যাদি ও শাকসবজির মধ্যে। এসব উৎস থেকে ছড়িয়ে পড়ে সংক্রমিত করতে পারে যে কাউকে। তবে ফাঙ্গাস সর্বব্যাপী থাকলেও এগুলোর সংক্রমণ ক্ষমতা খুবই কম, লাখে একজনের মধ্যে এ জীবাণু সংক্রমিত হতে পারে। অনেক মানুষের ক্ষেত্রে ততটা ক্ষতিকর নয়, সংক্রমণ হয় অপারচুনিসটিক ইনফেকশন বা সুবিধাবাদী হিসেবে। রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা কম এমন মানুষের ক্ষেত্রে এ ছত্রাকের সংক্রমণ বেশ গুরুতর এবং মৃত্যুর ঝুঁঁকিও বেশি। 

ফাঙ্গাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কাদের বেশি?
কোনো কারণে শরীরের ইমিউনিটি বা প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে বা যারা বিভিন্ন রোগে ভোগেন, তাদের এ রোগের সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। যেমন অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, ক্যান্সারের রোগী যারা কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপি নিচ্ছেন, এইচআইভি বা এইডসে আক্রান্ত রোগী, অনেকদিন যাবৎ অ্যান্টিবায়োটিক এবং স্টেরয়েডের ব্যবহার। এছাড়াও চামড়ায় বা শরীরের কোনো ক্ষত, কাটা জায়গা বা আগুনে পোড়া ক্ষতস্থানে, কিডনি বা অন্য কোো অঙ্গ প্রতিস্থাপন করা রোগী, চরম অপুষ্টিজনিত রোগী, এমনকি গর্ভবতী মহিলা এবং বাচ্চাদেরও এসব ফাঙ্গাসের সংক্রমণ হতে পারে। অনেকেই মনে করেন করোনা আক্রান্ত রোগীকে জীবন বাঁচানোর জন্য হাইডোজ স্টেরয়েড ব্যবহারের কারণে, বিশেষ করে আইসিইউতে ভর্তি রোগীদের সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। এমনকি রোগীর জীবন বাঁচাতে শিল্পের অক্সিজেন ব্যবহারের কারণেও এমন হতে পারে। তবে সংক্রমণের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কারণ হলো জামাকাপড়সহ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব, ধুলাবালির সংস্পর্শে বা অন্য কোনো নোংরা জিনিসপত্রের সংস্পর্শে আসা, ময়লা, আর্দ্র বা স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে বসবাস, পচে যাওয়া বা পচন ধরা যে কোনো ফলমূল বা খাদ্য গ্রহণ এ রোগের সংক্রমণ বাড়াতে পারে। 

কীভাবে ছড়ায়?
রোগটি মূলত বায়ুবাহিত। বাতাসে ছত্রাকের বীজগুটি বা স্পোর ভেসে বেড়ায়। শ্বাস গ্রহণের সময় এ ছত্রাকের জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে নাক, মুখ, সাইনাস, মস্তিষ্ক ও ফুসফুস আক্রান্ত করে। ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের চেয়ে হোয়াইট ফাঙ্গাস বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের সংক্রমণ মুখের আশপাশে হয়, পরে সাইনাস ও ফুসফুস আক্রান্ত হয়। কিন্তু হোয়াইট ফাঙ্গাসের সংক্রমণ দ্রুত শরীরের অন্যান্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। ফুসফুস, লিভার, কিডনি এবং যৌনাঙ্গে অতি দ্রুত সংক্রমিত হতে পারে এ ফাঙ্গাসে। নখের মাধ্যমে শরীরের নানা জায়গায় ছড়িয়ে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিকল করে দিতে পারে। ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে মৃত্যু বেশি হলেও হোয়াইট ফাঙ্গাসে মৃত্যু সম্পর্কে তেমন কোনো ধারণা পাওয়া যায়নি। অনেকেই মনে করেন হোয়াইট ফাঙ্গাসে গর্ভবতী এবং শিশুরাও আক্রান্ত হতে পারে। তবে ইয়েলো ফাঙ্গাসের লক্ষণগুলো হলো দুর্বলতা, ক্লান্তিবোধ, অরুচি এবং ওজন কম হওয়া। এমনকি সংক্রমণ মারাত্মক হলে সেক্ষেত্রে ক্ষতস্থান থেকে পুঁজ বের হওয়া, ক্ষত দীর্ঘস্থায়ী হওয়া, অপুষ্টি, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিকল এবং চোখ বুজে আসা ইত্যাদি। 

এ রোগের লক্ষণ কী?
যদিও এ রোগটি নতুন নয়, তবে বর্তমানে করোনার সংক্রমণ থেকে ভালো হওয়ার সময় অথবা সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার পরেই এ রোগের সংক্রমণ বেড়ে যাচ্ছে। শরীরের যে অংশে এ ছত্রাক আক্রান্ত করছে, তার ওপর ভিত্তি করে মূলত বিভিন্ন লক্ষণ প্রকাশ পায়। এ রোগের জীবাণু বাতাসের মাধ্যমে মানুষের দেহে প্রবেশ করে। এছাড়া শরীরের কোনো ক্ষত বা কাটা জায়গা বা পুড়ে যাওয়া ক্ষতস্থান দিয়ে বা পচা খাবারের মাধ্যমে এ রোগের দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। শরীরের যে কোনো স্থানে এর সংক্রমণ হতে পারে, তবে এ রোগের প্রথম সংক্রমণ হয় সাধারণত মুখে, নাকে, চোখের আশপাশে। এমনকি সাইনাস, মস্তিষ্ক ও ফুসফুসকে আক্রান্ত করে।

লক্ষণগুলো হলো জ্বর, সর্দি, মাথাব্যথা, চোখে ও নাকের চতুর্পাশে ব্যথা। এছাড়া মুখের এক পাশে ফুলে ওঠা, মুখে কালো ক্ষত, ত্বকে আলসার, নাক, কপাল, গালের হাড় ও দাঁতের গোড়ায় সংক্রমণ হয়। পরে এটি চোখ, ফুসফুস ও মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ে। 
আক্রান্তদের নাক বন্ধ, নাক থেকে রক্ত পড়া বা শ্লেষ্মামিশ্রিত কালো শক্ত পদার্থ বের হয়। এ রোগের কারণে নাকের ভিতরে কালচে হয়, ত্বক কালো বা বিবর্ণ হয়। তাই একে বলে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস।

চোখ লাল বা কালো, চোখে ব্যথা, ফুলে যাওয়া, রক্তক্ষরণ, ঝাপসা দেখা, কোনো জিনিস একের অধিক দেখা, চোখের পাতা বন্ধ হয়ে আসা, পাপড়ি ঝরে যাওয়া এবং দৃষ্টি হারানোর মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এমনকি কোনো কোনো রোগীর চোখ অপসারণ করতে হয়। ফুসফুসে সংক্রমণের কারণে বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, কাশি, কাশির সঙ্গে রক্তপাত হতে পারে।

সাইনাসের ব্যথা এবং মস্তিষ্কে সংক্রমণের ফলে প্রচণ্ড মাথাব্যথা, অসংলগ্ন কথাবার্তা, বিড়বিড় করা এমনকি জ্ঞান হারাতে পারে। পচা খাদ্যদ্রব্য খেয়ে পেটে ব্যথা, বমি, পাতলা পায়খানা ইত্যাদি হতে পারে। 
 
প্রতিরোধে করণীয়

যেহেতু রোগটি জটিল, তাই এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। যাদের ক্যানসার, ডায়াবেটিস, কিডনি ও হার্টের রোগ রয়েছে তাদের করোনা হলে ফাঙ্গাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এসব রোগে যারা ভোগেন, ডায়াবেটিস ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণসহ তাদের অবশ্যই যথাযথ চিকিৎসা এবং সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। করোনা থেকে বাঁচার জন্য যেভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হয় ঠিক একইভাবে এ রোগ থেকে বাঁচার জন্য কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে সঠিকভাবে মাস্ক পরা, হাত ধোয়ার চর্চা চালু রাখা এবং শারীরিক দূরত্ব মেনে চলা। মাস্ক ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা জরুরি। সার্জিক্যাল মাস্ক একবার ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া উচিত। তবে কাপড়ের মাস্ক ভালোভাবে ধুয়ে কয়েকবার পড়া যায়। অযথা বাইরে ঘোরাফেরা করবেন না, জনসমাগম এড়িয়ে চলবেন।

পরিষ্কার পরিছন্ন থাকার ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। ধুলাবালু, ভেজা স্যাঁতসেঁতে দেয়াল বা জায়গা এড়িয়ে চলতে হবে। মাটি, পচা ফলমূল বা বিষ্ঠা হাতে লাগলে সঙ্গে সঙ্গে হাত ধুয়ে ফেলতে হবে। চামড়ার মাধ্যমে যেন সংক্রমণ না হয় সেজন্য ক্ষতস্থান পরিষ্কার রাখতে হবে, ধুলাবালু লাগলে সঙ্গে সঙ্গে তা ধুয়ে ফেলতে হবে। পচা, আধাপচা খাদ্যদ্রব্য, ফলমূল খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। নিজের বাড়ির আঙ্গিনা, বাগানের কাজে বা মাটি খননের সময় জুতা ও গ্লাভস ব্যবহার করা ভালো। 
করোনায় আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসায় স্টেরয়েড ব্যবহার করা হয়। ফলে করোনা থেকে সেরে ওঠার পর ফাঙ্গাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই করোনা রোগে স্টেরয়েড ব্যবহারে একটা যোগসূত্র বা সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। এক্ষেত্রে স্টেরয়েড-জাতীয় ওষুধের ব্যবহারে সতর্ক হতে হবে।

বর্তমানে করোনা সংক্রমণের পরে সুস্থ হওয়ার সময়কালে কারও শারীরিক কোনো লক্ষণ দেখা দিলে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। রোগটি অত্যন্ত জটিল, আক্রান্ত হয়ে গেলে মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক বেশি, চিকিৎসাও ব্যয়বহুল এবং অনেকদিন যাবত চিকিৎসা নিতে হয়। সুতরাং যদি ভালোভাবে প্রতিকার প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায় তাহলে এর সংক্রমণ থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব হবে। রোগটি করোনার মতো সংক্রামক নয়, তাই আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকতে হবে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। 

লেখক : ইউজিসি অধ্যাপক ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ
প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক