৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ১৫:৫৪
সেপ্টেম্বর পিসিওএস সচেতনতা মাস

পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম

অধ্যাপক লায়লা আরজুমান্দ বানু, অধ্যাপক ডা. শেখ জিন্নাত আরা নাসরিন, ডা. শারমিন আব্বাসি

পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম

আপনি একা নন!
বিষয়টি কী? হরমোনের ভারসাম্যহীনতার কারণে একজন নারীর শারীরিক কিছু পরিবর্তন এবং ওভারিতে বিশেষ ধরনের কিছু সিস্ট তৈরি হওয়াকে একসঙ্গে বলে পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম। ‘পলি’ কথার অর্থ অনেক। অনেক সিস্ট ডিম্বাশয়ের ওপর জমলে এই অসুখ বেশি করে দেখা যায়।


কাদের হয় : রিপ্রোডাটিভ মহিলাদের ২%-২০% এই সমস্যায় ভুগছেন। বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে এই রোগে আক্রান্তর সংখ্যা। সদ্য পিরিয়ড শুরুর পর মেয়েদের মধ্যে এই সমস্যা দেখা দেয়। এ ক্ষেত্রে ভারী চেহারার মেয়েরাই বেশি আক্রান্ত হয়। এর পর ২০-৩০ বছরের সময়, অর্থাৎ যাদের বিয়ের পর থেকেই সন্তান ধারনের সমস্যা ও অনিয়মিত পিরিয়ড অথবা পিরিয়ডের সময় নানা জটিলতা লক্ষ্য করা গেলে এই অসুখে আক্রান্ত কি না তা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলে। তবে সব সময় যে পিরিয়ড অনিয়মিত হবে বা ব্যথা থাকবেই এমন কোনো কথা নেই। এ ছাড়া ৩৫-৪০ বছরের মধ্যে ওজন বেশি, খাওয়া-দাওয়ায় অনিয়ন্ত্রণ এই অসুখ ডেকে আনে।

কারণ কী : ব্যাখ্যা করা কঠিন। পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোমের সঠিক কারণ এখনো পাওয়া যায়নি। কিন্তু ইনসুলিন প্রতিরোধ এবং হরমোন ভারসাম্যহীনতার পাশাপাশি জেনেটিক্সকে অবশ্যই একটি ফ্যাক্টর বলে মনে করা হয়। একজন মহিলার পিসিওএস হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পায় যদি তার মা, বোন বা মাসীর মতো পরিবারের কারও পিসিওএস থাকে। মূলত মূলত শরীরে হরমোনের সমতা রক্ষা পায় না বলেই এই অসুখ হয়। শরীরে এন্ড্রোজেন হরমোন বাড়ে, ডিম্বাশয়ের মাঝে সমস্যা হয় এবং সিস্ট তৈরি হয়।

জেনোটিক্যাল এবং দুর্বল ও Immune System ছাড়াও আপনি হয়তো না জেনেই নিজের মধ্যে PCOD পরিবেশ তৈরি করছেন । যেমন : 
অতিরিক্ত সুলতা, ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত চর্বিজাতীয় খাবার গ্রহণ।

লক্ষণসমূহ : অনিয়মিত মাসিক অথবা মাসিক বন্ধ থাকা, ব্রন, অতিরিক্ত লোম হওয়া- মুখে, গলা, বুক ও পেটে, গলা বা হাত বা শরীরের বিভিন্ন ভাঁজে কালো ছোপ ছোপ দাগ হওয়া, মাথার চুল পাতলা হওয়া বা পড়ে যাওয়া, অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি, বন্ধ্যাত্ব, গর্ভপাত।


কীভাবে পিসিওএস নির্ণয় করা হয়?
পিসিওএস-এর জন্য কোনো একক নির্দিষ্ট পরীক্ষা নেই এবং ফলস্বরূপ, ডায়াগনোসিস পদ্ধতিটি ডাক্তার থেকে ডাক্তারের মধ্যে সামান্য পরিবর্তিত হতে পারে।
প্রথমত, ডাক্তার  ইতিহাস পর্যালোচনা করবেন এবং ওজন, বিএমআই, মাসিক চক্র, খাদ্য, এবং ব্যায়াম প্রণালির মতো তথ্য তালিকা পর্যালোচনা করবেন। পারিবারিক ইতিহাস, বিশেষত হরমোন সমস্যা এবং ডায়াবেটিস সংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হবে।
এর পর স্তন, থাইরয়েড গ্রন্থি, ত্বক, এবং পেটের একটি শারীরিক পরীক্ষা হতে পারে। একটি পেলভিক পরীক্ষা বা পিসিওএস আল্ট্রাসাউন্ড ডিম্বাশয়ের কোনো অস্বাভাবিকতা আছে কিনা দেখার জন্য করা হতে পারে। যদি সিস্ট এবং বেড়ে যাওয়া ডিম্বাশয়ের মতো পিসিওএস-এর লক্ষণগুলো উপস্থিত থাকে, সেগুলো পরীক্ষার সময় দেখা যাবে।
টেস্টোস্টেরন, প্রোল্যাক্টিন, ট্রাইগ্লিসারাইডস, কোলেস্টেরল, থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন (টিএসএইচ) এবং ইনসুলিনের মাত্রাসহ অন্যান্য পরীক্ষা করার জন্য রক্ত পরীক্ষার জন্য বলতে পারে। লিপিড মাত্রার পরীক্ষা, উপবাসে গ্লুকোজ পরীক্ষা এবং থাইরয়েড ফাংশন পরীক্ষা থেকে সমস্ত প্রয়োজনীয় তথ্য ডাক্তার পেয়ে যান।


রোগীর নিম্নোক্ত তিনটি মানদণ্ডের মধ্যে অন্তত দুটি সন্তুষ্ট হলে এই অবস্থার নির্ণয় করা হয়:
১. ঋতু অস্বাভাবিকতা যার মানে পিরিয়ডের অনিয়ম বা অনুপস্থিতি।
২. রক্তে পুরুষ হরমোনগুলোর উচ্চমাত্রায় উপস্থিতি যার ফলে ব্রণ বা অতিরিক্ত চুলের বৃদ্ধি দেখা দিতে পারে, বিশেষত শরীর এবং মুখে।
৩. ডিম্বাশয় পলিসিস্টিক হলে একটি বা উভয় ডিম্বাশয় আকারে বৃদ্ধি পায়; অথবা একটি একক ডিম্বাশয়ে ১২টি বা তার বেশি ফলিকল দেখা যায়।

প্রতিকার : চিকিৎসকের পরামর্শ নিন

পিসিওডি নিয়ে এ দেশে মহিলারা যথেষ্ট সচেতন নন। এই অসুখ বেশি হয় অসচেতনতা থেকে। কর্মব্যস্ত যুগের দোহাই দিয়ে নিজস্ব খাওয়া-দাওয়া ও ওজন কমানোর দিকটা মেয়েরা সব সময় মাথায় আনেন। তবে স্রেফ জিম করাই নয়, চাই ভিতর থেকে সুস্থতাও। তাই গর্ভধারণের সময় আজকাল এই সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় বেশিরভাগ মেয়েকেই। 

আপনার জন্য টিপস : রোগ ও রোগীর ধরন বুঝে চিকিৎসা শুরু করা হয়। সব সময় ওষুধ লাগে এমনটা নয়।
১. এ ধরনের রোগ থেকে রেহাই পাওয়ার মূল উপায় জীবনযাত্রার পরিবর্তন।
২. স্ট্রেস দূরে রাখা, অন্তত ছয়-সাত ঘণ্টা ঘুম, ওজন নিয়ন্ত্রণ, বাইরের খাওয়া-দাওয়া বন্ধ ও কোনো হরমোনাল অসুখের চিকিৎসা শুরু করলেই এই রোগ প্রায় নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। 
৩. পিসিওএস সামলে নিয়েই কনসিভ করার কথা ভাবা ভালো।
৩. যোগ, নানা অ্যাবডোমিনাল এক্সারসাইজ, জগিং, জোরে হাঁটা, ব্যয়াম যেগুলোতে পেটের মেদ ঝরে সে সব অভ্যাস করা, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে ডায়েট আর সঙ্গে হরমোনের অসুখ থাকলে তার চিকিৎসা করানো এগুলোই এই অসুখ সারানোর মূল মন্ত্র।

আপনি ওষুধ খান কিংবা সার্জারি করান, PCOD কন্ট্রোল করতে গেলে কিন্তু  নিজের ডায়েটের দিকেও নজর দিতে হবে। 
কী খাচ্ছেন, কতটা খাচ্ছেন, সেটা দেখা যেমন জরুরি, ঠিক সেরকমই পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম আটকাতে কী-কী খাবেন না, সেটা জানাও খুব জরুরি।
১. লো-কার্ব খাবার আপনার যদি PCOD-এর সমস্যা থাকে, তা হলে লো-কার্ব খাবার অর্থাৎ যে খাবারে কার্বোহাইড্রেট কম, সে ধরনের খাবার খান। ভাত, আলু, কর্নফ্লেক্স ইত্যাদি না খাওয়াই ভালো (PCOS Diet Chart In Bengali)। খাদ্য তালিকায় থাকতে পারে মাল্টিগ্রেন ব্রেড, সয়াবিনের দুধ, ওটস, আপেলের রস, আনারস, লো-ফ্যাট দই, মুয়েসলি, গাজর ইত্যদি।
২. দুগ্ধজাত খাবার বেশি নয় 
৩.  প্রসেসড ফুড একদম নয় 
PCOD অথবা পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোমে কিন্তু প্রসেসড ফুড যেমন হ্যাম, সসেজ, চিজ, যেকোনো ক্যানড খাবার একেবারেই চলবে না। এই খাবারগুলোতে চিনি, ফ্যাট, প্রেজারভেটিভ এবং অতিরিক্ত পরিমাণে সোডিয়াম থাকে যা সেই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
৪. মিষ্টি খাবেন না 
চিনি না খেলেই ভালো। মিষ্টি, আইসক্রিম, চকোলেট ও কোমল পানীয় যতটা পারেন এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন।

হেলদি লাইফস্টাইল 


১ এক্সারসাইজ 
নিয়মিত এক্সারসাইজ করুন। জিমে গিয়ে এক্সারসাইজ না করতে পারলে ক্ষতি নেই, বাড়িতেই যোগব্যায়াম করুন। আর কিছু না হলে সকাল-বিকেল হাঁটুন।
২ ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন 
ওজন যদি বাড়তে থাকে তা হলে কিন্তু সিস্ট হতে বাধ্য। কারণ, জরায়ুতে মেদ জমে-জমেই ঋতুস্রাব অনিয়মিত হয় এবং সিস্টের সমস্যা দেখা দেয়। কাজেই ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
৩ নিয়মিত চেক-আপ করান 
পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম  বা পলিসিস্টিক ওভারিয়ান ডিজঅর্ডার কিন্তু কখনো সম্পূর্ণভাবে নির্মূল হয় না। যতদিন নিজের শরীরের দিকে খেয়াল রাখবেন এবং নিয়মিত ওষুধ খাবেন, ততদিনই PCOD নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এই সমস্যা একবার কমে গেলেও কয়েকবছর পর আবার ফিরে আসতে পারে, একথাটা মাথায় রাখবেন। তাই নিয়মিত চেক-আপ করানো এক্ষেত্রে খুবই জরুরি।

৪. চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করুন (OCP, antiandrogen), যাদের বন্ধ্যাত্বের সমস্যা আছে তাদের  চিকিৎসা নিতে হবে ।


মা হতে চাইলে : প্রেগন্যান্সি চাইলে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ওরাল মেডিসিন নেওয়া বন্ধ করতে হবে। এরপর যদি অন্তঃসত্ত্বা হতে কোনো অসুবিধা হয় তাহলে ডাক্তারের কাছে গিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করে নিলেই সমস্যার সমাধান হবে। অনিয়মিত ডিম্বাণু বেরনোকে নিয়মিত করে দিলেই ভবিষ্যতে মা হতে আর কোনো অসুবিধা থাকবে না। তবে পলিসিস্টিকের সঙ্গে ওবেসিটি থাকলে বিষয়টি জটিল হতে পারে। তাই মা হতে চাইলে আগে ওজন কমাতে হবে। এই রোগীদের প্রেগন্যান্সির সময় ব্লাড সুগার ও ব্লাড প্রেশার বাড়তে পারে। এছাড়া অন্য সমস্যা হলে সিস্টগুলোকে পাংচার (ড্রিলিং) করে দেওয়া হয়। তাতে সাময়িকভাবে ডিম্বাণু নিঃসৃত হতে পারে। তবে এখন এত আধুনিক ওষুধ বেরিয়েছে যে ড্রিলিং করার দরকার হয় না।
সন্তানের জন্মের পর অনেকেই পিসিওএস-এর চিকিৎসা ছেড়ে দেন। তখন অনেক ক্ষেত্রেই ফের পলিসিস্টিক ওভারি ফেরত আসে। অনেকে মোটা হয়ে যান, ব্লাড সুগার লেভেল বর্ডার লাইনে এসে যায়। 

জটিলতা : সময়মতো চিকিৎসা না করালে হতে পারে :  ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হ্রদরোগ বা হার্ট অ্যাটাক, রক্তে চর্বির পরিমাণ বেড়ে যাওয়া । হতাশা, দুশ্চিন্তা, স্লিপ অ্যাপনিয়া, অ্যাবরসন, বন্ধ্যাত্ব ও জরায়ু ক্যানসার।

শেষ কথা : আপনি একা এই সমস্যায় ভুগছেন না, এমন হাজারো রোগী আছে। হতাশা আর লজ্জা দূর করে অন্য রোগীদের সঙ্গে শেয়ার করুন। নিজের মধ্যে পজিটিভটি বাড়িয়ে তুলুন। আপনার যেকোনো প্রশ্ন বা সহযোগিতার জন্য চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।