শিরোনাম
২৪ মে, ২০২২ ১৫:৫৬

সিজোফ্রেনিয়া নিয়ে আশার কথা

অধ্যাপক ব্রি. জে. (অব.) ডা. মো. আজিজুল ইসলাম

সিজোফ্রেনিয়া নিয়ে আশার কথা

১। ২৪ মে বিশ্ব সিজোফ্রেনিয়া দিবস। সিজোফ্রেনিয়া সত্যিকারই একটি জটিল মানসিক রোগ। সিজোফ্রেনিয়া মানুষের মন-মনন, আবেগ-অনুভূতি, চিন্তা-চেতনা, কর্মস্পৃহা-উদ্দীপনা, কথাবার্তা অর্থাৎ মনোজগতের সব বিষয়ের ওপর প্রভাব ফেলে ও প্রত্যেক বিষয়ের স্বাভাবিকতার ব্যাঘাত ঘটায়। সিজোফ্রেনিয়া রোগটি সাধারণত জীবনের প্রথম দিক থেকেই শুরু হয় বিধায় তা ব্যক্তির সব পর্যায়কে প্রভাবিত করে। সাধারণত ১৫/২০ বছর বয়স থেকেই এটা শুরু হয় এবং ৫০/৫৫ বছর বয়সের পর নতুন করে সিজোফ্রেনিয়া হয় না। বাংলাদেশের প্রতি এক হাজার জনের মধ্যে ৬ জন (০.৬%) সিজোফ্রেনিয়ায় ভোগে। পৃথিবীতে ২১ থেকে ২৪ মিলিয়ন মানুষ এই রোগে ভুগছেন। 

২। সিজোফ্রেনিয়া রোগীর কর্মস্পৃহা ও কর্মউদ্দীপনা ব্যাহত বা নষ্ট হয়ে যায়। সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সমাজে একা হয়ে পড়ে। কিন্তু তারপরও সিজোফ্রেনিয়া নিয়ে আশার কথা শোনাতে চাই। আশার ওপর ভিত্তি করে এ বছর বিশ্ব সিজোফ্রেনিয়া দিবসের প্রতিপাদ্য হলো “নিরাশা নয়, সুচিকিৎসায় সিজোফ্রেনিয়া ভালো হয়” বা “আশায় হোক সংযোগ” (Connecting with Hope)।

৩। সিজোফ্রেনিয়া নিয়ে মোটেও হতাশা নয়। আমাদের কাছে অনেক আশার কথা কারণ :
ক। সিজোফ্রেনিয়ার আছে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা।
খ। বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডোপামিনসহ কয়েকটি ব্রেইন কেমিক্যালস এই রোগের জন্য দায়ী। সুতরাং সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে এই ব্রেইন কেমিক্যালসকে পুনঃস্থাপন/ঠিক করা গেলে সিজোফ্রেনিয়া ভালো হয়।
গ। প্রায় এক চতুর্থাংশ থেকে তৃতীয়াংশ সিজোফ্রেনিয়া রোগী চিকিৎসায় সম্পূর্ণ ভালো হয়।
ঘ। সিজোফ্রেনিয়ায় ভোগা রোগী চিকিৎসায় নিরাময়ের মাধ্যমে ভালো হয়ে সমাজের সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে সক্ষম হয়। আনন্দের ও আশার কথা, সিজোফ্রেনিয়া নিরাময়ের পর সেই ব্যক্তি এমন কী নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত হন।
ঙ। বাংলাদেশে প্রায় সব চিকিৎসকই এই রোগের চিকিৎসা দিতে জানেন। বিশেষ করে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞগণ এই সার্ভিস প্রদানে নিবেদিতপ্রাণ ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
চ। দেশের প্রায় সব সরকারি/বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য হাসপাতাল, পাবনা মানসিক হাসপাতালে এই রোগীর ভর্তিসহ চিকিৎসা করা হয়।
ছ। প্রায় সব জেলায় বেসরকারি পর্যায় বহির্বিভাগে এবং কোথাও কোথাও আন্তঃবিভাগে এই রোগের চিকিৎসা সম্ভব।

৪। সিজোফ্রেনিয়া প্রতিরোধে এবং নিরাময়ে পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ-
ক। যথাসময়ে এবং প্রথম দিকে রোগটি শনাক্ত করা গেলে তৎক্ষনাৎ চিকিৎসার ব্যবস্থা হলে দ্রুত ও পরিপূর্ণ নিরাময় সম্ভব। তাই অভিভাবক ও পরিবারের সদস্যদের আচার-আচরণ লক্ষ্য করে ব্যত্যয় হলে চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে।
খ। মানসিক রোগ তথা সিজোফ্রেনিয়াকে জিনে ধরা, ভূতে ধরা, আলগা লাগা না ভেবে বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা গ্রহণে এগিয়ে আসতে হবে।
গ। পরিবারের সদস্যদের তাদের ওষুধ খাইয়ে দেওয়া এবং এসব নজরদারি করতে হবে কারণ অনেক সময় রোগী বোঝেন না তিনি অসুস্থ।
ঘ। পরিবারের সদস্যদের সহানুভূতি, সহমর্মিতা, ভালোবাসা রোগ নিরাময়ের জন্য খুবই দরকার।
ঙ। রোগীর সঙ্গে রাগ করা, তাদের হেয় করা, রোগীকে রোগের জন্য দোষী করা নিরাময়ের অন্তরায়।
চ। পরিবারের সদস্যদের মাদক গ্রহণ থেকে ফেরাতে হবে/ বিরত রাখতে হবে, কারণ মাদক গ্রহণ এই রোগের কারণ হতে পারে।

আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা, উদ্যোগ ও সচেতনা সিজোফ্রেনিয়ার মতো কঠিন রোগকে নিরাময় করে সবার মুখে হাসি ফোটাতে পারে।


লেখক: মনোরোগ বিশেষজ্ঞ

 

বিডি প্রতিদিন/ ওয়াসিফ

এই রকম আরও টপিক

এই বিভাগের আরও খবর

সর্বশেষ খবর