মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর তার ব্যক্তিগত সম্পদের পাশাপাশি ফ্লোরিডায় অবস্থিত দুটি বিলাসবহুল রিসোর্ট- মার-আ-লাগো এবং ট্রাম্প ন্যাশনাল ডোরালের আয়ও রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে।
সদ্য প্রকাশিত আর্থিক তথ্য প্রকাশনায় উঠে এসেছে, প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
মার্কিন সরকারি নৈতিকতা দফতর প্রকাশিত বার্ষিক আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ২০২৫ সালে শুধু মার-আ-লাগো থেকেই ট্রাম্প প্রায় ৭ কোটি ৭৫ লাখ ডলার আয় করেছেন। এটি আগের বছরের তুলনায় ৫০ শতাংশেরও বেশি এবং ২০২০ সালের আয়ের প্রায় তিন গুণ।
অন্যদিকে, ট্রাম্প ন্যাশনাল ডোরাল থেকেও তার আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালে যেখানে এই রিসোর্ট থেকে আয় ছিল প্রায় ১১ কোটি ডলার, সেখানে ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২ কোটি ২০ লাখ ডলারে।
প্রেসিডেন্সি ও ব্যবসার সংযোগ
২০২৫ সালের শুরু থেকে ট্রাম্প দুই ডজনেরও বেশি বার মার-আ-লাগো ও ডোরাল সফর করেছেন। এসব সফরে তিনি মিলিয়ন ডলার মূল্যের তহবিল সংগ্রহের নৈশভোজ, রিপাবলিকান পার্টির বিভিন্ন অনুষ্ঠান, বিদেশি অতিথিদের আপ্যায়ন এবং রাজনৈতিক বৈঠকে অংশ নেন।
ট্রাম্পের উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, রাজনৈতিক সংগঠন এবং বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী এসব রিসোর্টে অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য ব্যাপক আগ্রহ দেখিয়েছে। ফলে রিসোর্টগুলোর আয়ও দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।
ক্ষমতায় ফেরার আগে ট্রাম্প মার-আ-লাগোর সদস্যপদ গ্রহণের প্রাথমিক ফি বাড়িয়ে ১০ লাখ ডলার নির্ধারণ করেন। আগে এই ফি ছিল মাত্র এক লাখ ডলার। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ক্লাবে সদস্যরা প্রায়ই প্রেসিডেন্টের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিকভাবে সাক্ষাৎ ও আলাপের সুযোগ পান, যা অনেকের কাছেই অত্যন্ত মূল্যবান বলে বিবেচিত হয়।
স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ
নৈতিকতা বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ট্রাম্পের রাজনৈতিক ক্ষমতা ও ব্যক্তিগত ব্যবসা একইসঙ্গে পরিচালিত হওয়ায় বিশেষ স্বার্থগোষ্ঠীর জন্য প্রেসিডেন্টের কাছে সরাসরি পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ভোক্তা অধিকারবিষয়ক সংগঠন পাবলিক সিটিজেনের সহ-সভাপতি রবার্ট ওয়েইসম্যান বলেন, “মানুষ মার-আ-লাগোতে যাচ্ছে কারণ তারা প্রেসিডেন্টের কাছাকাছি থাকতে চায়। প্রেসিডেন্টের কানে কয়েকটি কথা পৌঁছে দেওয়ার মূল্য প্রবেশমূল্যের চেয়েও অনেক বেশি।”
তবে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে হোয়াইট হাউস। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি এক বিবৃতিতে বলেন, “প্রেসিডেন্ট বা তার পরিবারের কেউ কখনও স্বার্থের সংঘাতে জড়াননি এবং ভবিষ্যতেও জড়াবেন না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের প্রতিটি সিদ্ধান্তই মার্কিন জনগণের সর্বোচ্চ স্বার্থ বিবেচনা করেই নেওয়া হয়।”
তিনি আরও বলেন, দ্বিতীয়বার দায়িত্ব গ্রহণের আগে ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তিনি নিজের কোম্পানির দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনায় যুক্ত থাকবেন না। তার সম্পদ বর্তমানে সন্তানদের পরিচালিত একটি ট্রাস্টের অধীনে রয়েছে, যেমনটি তার প্রথম মেয়াদেও ছিল।
ক্রিপ্টোকারেন্সি থেকে সর্বোচ্চ আয়
আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় আয়ের উৎস এখন আর গলফ ক্লাব বা রিসোর্ট নয়; বরং ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসা।
তার নতুন ক্রিপ্টো উদ্যোগ- বিশেষ করে $TRUMP মিমকয়েন এবং তার ছেলেদের সহ-প্রতিষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল থেকে ট্রাম্পের আয় ১৪০ কোটি ডলারেরও বেশি।
গত বছরে তিনি ক্রিপ্টোকারেন্সি থেকে যে আয় করেছেন, তা তার গলফ ক্লাব, হোটেল ও রিসোর্ট ব্যবসা থেকে পাওয়া মোট আয়ের প্রায় তিন গুণ।
এছাড়া ভিয়েতনাম, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে ট্রাম্প নাম ব্যবহারের লাইসেন্স দিয়ে পরিচালিত হোটেল, গলফ কোর্স ও রিয়েল এস্টেট প্রকল্প থেকে তিনি প্রায় ৬ কোটি ডলার আয় করেছেন।
আয় বৃদ্ধির ব্যাখ্যা
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, তার আয় বৃদ্ধির একটি বড় কারণ শেয়ারবাজারের ঊর্ধ্বগতি।
তিনি বলেন, “আপনারা জানেন কেন আমি লাভ করছি? কারণ শেয়ারবাজার বাড়ছে। সবাই লাভ করছে।”
একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, তার অর্থ পরিচালনাকারীদের সঙ্গে তিনি ব্যক্তিগতভাবে কোনও আলোচনা করেন না।
রাজনৈতিক তহবিল সংগ্রহের কেন্দ্র মার-আ-লাগো
ট্রাম্প পুনরায় প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তার বিভিন্ন সম্পত্তি রিপাবলিকান পার্টির তহবিল সংগ্রহের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
২০২৫ সালে মার-আ-লাগোতে প্রেসিডেন্ট-সমর্থক সুপার প্যাক মাগা ইনকরপোরেটেড-এর উদ্যোগে জনপ্রতি ১০ লাখ ডলারের একাধিক ‘ক্যান্ডেললাইট ডিনার’ অনুষ্ঠিত হয়। এসব অনুষ্ঠানে বিশ্বের শীর্ষ ধনকুবের ইলন মাস্কসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি অংশ নেন।
একই সময়ে রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটিও মার-আ-লাগো ও ডোরালে একাধিক তহবিল সংগ্রহ অনুষ্ঠান আয়োজন করে। ২০২৫ ও ২০২৬ সালে এই দুটি রিসোর্টে অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য সংগঠনটি ১০ লাখ ডলারেরও বেশি ব্যয় করেছে।
করপোরেট ও আন্তর্জাতিক অতিথিদের সমাগম
ফেডারেল সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকা বিভিন্ন কোম্পানিও মার-আ-লাগোতে অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে।
ভার্টিক্যাল ফ্লাইট প্রযুক্তি উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠান এক্সটিআই অ্যারোস্পেস ২০২৫ সালের নভেম্বরে সেখানে নৈশভোজের আয়োজন করে। একই বছরের জানুয়ারিতে, ট্রাম্প দ্বিতীয়বার শপথ নেওয়ার আগে, ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ফাইজারের শীর্ষ নির্বাহীরাও মার-আ-লাগোতে বৈঠক করেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদম প্রকাশিত হয়েছে।
এছাড়া নিজের নতুন ক্রিপ্টো উদ্যোগের প্রচারেও মার-আ-লাগো ব্যবহার করেছেন ট্রাম্প। ২০২৬ সালের এপ্রিলে তার $TRUMP মিমকয়েনের শীর্ষ ক্রেতাদের জন্য সেখানে বিশেষ গালা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, যেখানে ট্রাম্প মূল বক্তব্য দেন এবং শ্যাম্পেইন সংবর্ধনায় অংশ নেন।
আন্তর্জাতিক কূটনীতিরও কেন্দ্র
শুধু রাজনৈতিক তহবিল সংগ্রহ নয়, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বৈঠকের ক্ষেত্রেও মার-আ-লাগো গুরুত্বপূর্ণ ভেন্যুতে পরিণত হয়েছে।
সেখানে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিসহ বিভিন্ন বিদেশি নেতা ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এছাড়া বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লাটনিক এবং অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টসহ তার মন্ত্রিসভার সদস্যরাও নিয়মিত এই রিসোর্টে সফর করেছেন।
পর্যবেক্ষকদের মতে, ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ব্যবসা, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব একই পরিসরে পরিচালিত হওয়ায় স্বচ্ছতা ও নৈতিকতা নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সূত্র: সিএনএন
বিডি প্রতিদিন/একেএ