শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ২৩:১২

বঙ্গোপসাগরের মৎস্যসম্পদ লুট হয়ে যাচ্ছে

দেশের জলসীমায় বিদেশি ট্রলারের দৌরাত্ম্য

রুকনুজ্জামান অঞ্জন

বঙ্গোপসাগরে মৎস্যসম্পদ সুরক্ষায় দেশীয় ফিশিং বোট ও ট্রলারের ওপর নানা বিধিনিষেধ থাকলেও বিদেশি ট্রলারগুলো দেশের জলসীমায় অনুপ্রবেশ করে লুট করে নিয়ে যাচ্ছে সেই সম্পদ। জানা গেছে, নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের টহল ফাঁকি দিয়ে বঙ্গোপসাগরের মহীসোপান এলাকায় দুর্দ  প্রতাপে বিচরণ করে বিদেশি ফিশিং ট্রলার। তারা সেখান থেকে অবাধে ধরে নিয়ে যায় বাংলাদেশের মাছ। পরিস্থিতি সামলাতে গভীর সমুদ্রে বাণিজ্যিকভাবে মাছ ধরার সব ট্রলার রেজিস্ট্রেশনের আওতায় আনার পাশাপাশি এসব ট্রলারে ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস বা অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম (এআইএস) স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, দেশের জলসীমায় বিদেশি ট্রলারের অনুপ্রবেশ রোধে করণীয় নির্ধারণ করতে ২৭ জানুয়ারি এক সভা হয় নৌ বাণিজ্য অধিদফতর, চট্টগ্রামের প্রিন্সিপাল অফিসারের কার্যালয়ে। ওই সভার সিদ্ধান্ত জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হলে প্রিন্সিপাল অফিসার মো. শফিকুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বিদেশি ফিশিং ট্রলারের অনুপ্রবেশ রোধ করতে উপকূলজুড়ে টহল ও নজরদারি রয়েছে নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের। দেশের মৎস্যসম্পদ রক্ষায় তাদের টহল আরও জোরদার করতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া অনেক সময় গভীর সমুদ্রে মাছ ধরায় নিয়োজিত দেশীয় ও বিদেশি ট্রলারের কোনো পার্থক্য বোঝা যায় না। কারণ নিবন্ধনবিহীন ফিশিং ট্রলার নিয়ে দেশীয় জেলেরাও অনেক সময় গভীর সমুদ্রে মাছ ধরে থাকে। নৌবাহিনী বা কোস্টগার্ড চ্যালেঞ্জ জানানোর পর দেখা যায় সেগুলো দেশীয় ফিশিং বোট। এজন্য নিবন্ধনহীন ফিশিং বোট রেজিস্ট্রেশনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া গভীর সমুদ্রে যাতে সহজেই দেশীয় ফিশিং ট্রলার চিহ্নিত করা যায় সে লক্ষ্যে মাছ ধরা ট্রলারে অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম (এআইএস) স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এটি স্থাপন করা গেলে দেশীয় ট্রলারগুলো থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোস্টগার্ড বা নৌবাহিনীর টহল জাহাজে সিগন্যাল পাওয়া যাবে। এতে বিদেশি অনুপ্রবেশকারী ফিশিং ট্রলারগুলো দ্রুত শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে। মোট মৎস্য উৎপাদনের শতকরা ১৬ ভাগ আসে সামুদ্রিক খাত থেকে। প্রায় ৫ লাখ লোক সামুদ্রিক মৎস্য খাতের সঙ্গে জড়িত। বঙ্গোপসাগর এলাকায় প্রতি বছর ৮০ কোটি টন মাছ ধরা পড়ছে। এর মধ্যে মাত্র দশমিক ৭ লাখ টন মাছ ধরে থাকে বাংলাদেশের জেলেরা। অর্থাৎ বঙ্গোপসাগরের বিশাল মৎস্যসম্পদের ১ শতাংশও বাংলাদেশের জেলেরা ধরতে পারছে না শুধু উন্নত ধরনের জাহাজ ও প্রযুক্তির অভাবে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের সমুদ্রে যারা মাছ ধরেন তাদের প্রায় ৮৭ ভাগই বিভিন্ন সনাতনী পদ্ধতিতে মাছ ধরে থাকেন। উপকূলীয় জেলেদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, মিয়ানমার, ভারত ও থাইল্যান্ডের অনুমোদনহীন অত্যাধুনিক জাহাজগুলো প্রায়ই বাংলাদেশের জলসীমায় ঢুকে পড়ে। অনেক ছোট ছোট মাছ ধরার ট্রলারও জলসীমায় প্রবেশ করে জেলেদের মাছ ও মালপত্র লুটে নিয়ে যায়। এসব বিদেশি জাহাজ দেশীয় মাছ ধরা ট্রলারের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত। সে কারণে বিদেশি ট্রলারের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে দেশীয় জেলেরা। শুধু তাই নয়, উপকূলের নদ-নদীতে আট মাস (নভেম্বর থেকে জুন) জাটকা শিকারে নিষেধাজ্ঞা জারি থাকে। ওই সময় ইলিশ শিকার থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হয় জেলেরা। কিন্তু সেই নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ে বাংলাদেশের সীমানায় ঢুকে ইলিশ ধরার মহোৎসব শুরু করে বিদেশি ফিশিং ট্রলারগুলো। জানা গেছে, বিদেশি ট্রলারগুলো প্রতিরোধে নৌবাহিনীর জাহাজ ও কোস্টগার্ড নিয়মিত টহল দিলেও সেই টহলের মাঝেই তারা অনুপ্রবেশ করে বাংলাদেশের সীমানায়। গভীর সমুদ্রের বিশাল এলাকায় একসঙ্গে টহল দেওয়া সম্ভব হয় না নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের। ফলে যেদিকে যে সময় টহল থাকে তার উল্টো দিকে মাছ ধরার কাজ করে বিদেশি ট্রলারগুলো। এ ছাড়া তারা উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বাইনোকুলার দিয়ে নৌবাহিনীর তৎপরতা পর্যবেক্ষণে রাখে। টহল দেখলেই তারা দ্রুত পালিয়ে যায়। সরকারি সূত্রগুলো জানায়, বিদেশি ট্রলারগুলোর অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে লাইসেন্সের বিনিময়ে বাণিজ্যিকভাবে মাছ ধরার সুযোগ দেওয়া হয় আইনের মাধ্যমে। তবে সেটিতেও কাজ হয়নি। উপরন্তু সমুদ্রসীমা নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে ২০১২ সালে। ভারতের সঙ্গে বিরোধ মিটেছে ২০১৪ সালে। নেদারল্যান্ডসের স্থায়ী শালিসি আদালতের রায়ে ওই বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়ায় বঙ্গোপসাগরে বিশাল অঞ্চলের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়েছে বাংলাদেশের। এতে বাংলাদেশ ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি টেরিটোরিয়ালসি, ২০০ নটিক্যাল মাইল একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশের সব ধরনের প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর অধিকার পেয়েছে। এই বিশাল সমুদ্র অঞ্চলে মৎস্যসম্পদ ছাড়াও বিভিন্ন খনিজসম্পদের অস্তিত্ব রয়েছে। কিন্তু সমুদ্র অঞ্চল নিয়ে বাংলাদেশ এখনো বড় ধরনের কোনো কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি।

ফলে সম্ভাবনাময় ব্লু-ইকোনমি বা সমুদ্র অর্থনীতির সুফল এখনো পাওয়া যাচ্ছে না। ইক্যুইটি বিডির কো-অর্ডিনেটর মজিবুল হক মনির বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সরকার ১৯৮৩ সালের সামুদ্রিক মৎস্য অধ্যাদেশের মাধ্যমে লাইসেন্সের বিনিময়ে বিদেশি মাছ ধরার ট্রলারগুলোকে বাংলাদেশের জলসীমায় মাছ ধরার সুযোগ দেয়। পরে একই সুযোগ রেখে ২০১৭ সালে সামুদ্রিক মৎস্য আইনের খসড়ার অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। আমরা এ বিষয়ে তখনই প্রতিবাদ জানিয়েছি। কারণ বঙ্গোপসাগরে দেশের জলসীমায় কী পরিমাণ মৎস্যসম্পদ রয়েছে তার কোনো পরিসংখ্যান নেই। এ ছাড়া বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার সম্পদের ওপর অনেকের নজর রয়েছে। তাই বৈধ বা অবৈধভাবে যে কোনোভাবেই হোক না কেন বিদেশি ট্রলারের বাংলাদেশি জলসীমায় অনুপ্রবেশ পুরো দেশের জন্যই বড় ধরনের হুমকি তৈরি করতে পারে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর