শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:১৮

বাগদাদিকে ধরতে সেই এক ঘণ্টার অপারেশন

প্রতিদিন ডেস্ক

বাগদাদিকে ধরতে সেই এক ঘণ্টার অপারেশন

যেভাবে চলল মার্কিন সেনার অভিযান হোয়াইট হাউসের ‘সিচুয়েশন রুম’ বা ‘ওয়ার রুম’। যেটি হোয়াইট হাউসে তৈরি ‘যোগাযোগ কেন্দ্র’, যেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ অভিযান সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে পারেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। গত শনিবার বিকাল পাঁচটার দিকে প্রবেশ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, সঙ্গে জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টারা। সেখান থেকে আইএসপ্রধান আবু বকর আল বাগদাদির বিরুদ্ধে চালানো অভিযান সরাসরি প্রত্যক্ষ করেন। এর আগে ২০১১ সালের ২ মে ওসামা বিন লাদেনের বিরুদ্ধে যে অভিযান পরিচালনা করা হয়, সে সময়ও সিচুয়েশন রুমে বসে পুরো অভিযান পর্যবেক্ষণ করেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা।

গত পরশু দিনের ‘বাগদাদি বধ’ অভিযানের পর একটি নাম আবার ফিরে এসেছে। তার নাম কায়লা মুলার। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সিরিয়ায় খুন হয়েছিলেন এই মার্কিন  মানবাধিকার কর্মী। ওই সময় তাকে অপহরণ করে আইএস জঙ্গিরা। জানা যায়, তাকে বলাৎকার করার পর খুন করে খোদ আইএসপ্রধান বাগদাদি। শনিবারের মার্কিন অভিযান উৎসর্গ করা হয়েছে অ্যারিজোনার বাসিন্দা সেই কায়লা মুলারকেই। ওয়ার রুমে বসে বাগদাদি বধ প্রত্যক্ষ করার পর উচ্ছ্বাসিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সেই অভিজ্ঞতা কেমন তা-ও জানিয়েছেন তিনি। তার কথায়, ‘মনে হচ্ছিল যেন সিনেমা  দেখছি।’ যে উন্নত প্রযুক্তির সহায়তায় ওই অভিযান চালিয়েছে আমেরিকা, সেই প্রযুক্তির তারিফ করেন তিনি।

২০১৪ সালে নিজেকে ‘খলিফা’ হিসাবে ঘোষণা করেছিল আইএস-এর প্রধান বাগদাদি। সেই সময় থেকেই ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকায় ছিলেন তিনি। গত পাঁচ বছর ধরে তার পিছু পিছু ঘুরছেন মার্কিন বাহিনী ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দারা। দীর্ঘ চেষ্টার পর অবশেষে সাফল্য পেলেন তারা।

বাগদাদির সন্ধান মেলে ‘তার সহযোগীর মাধ্যমে’ : বেশ কয়েক বছর ধরেই বাগদাদির সন্ধান পেতে হন্যে হয়ে ছিল বেশ কয়েকটি দেশের গোয়েন্দা সংস্থা, পরে বাগদাদির শীর্ষ সহযোগীদের কাছে পাওয়া তথ্যেই তার অবস্থান চিহ্নিত করা গেছে বলে জানিয়েছেন ইরাকি গোয়েন্দারা। গতকাল ইরাকি ওই কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কীভাবে এত বছর ধরে বাগদাদি ধরা না পড়ে পালিয়ে বেড়িয়েছেন সে বিষয়ে আইএস নেতার এক শীর্ষ সহযোগী তথ্য দেওয়ার পর ২০১৮-এর ফেব্রুয়ারিতে ইরাকি গোয়েন্দারা প্রথম একটি সূত্রের সন্ধান পান। তুরস্কের কর্তৃপক্ষ বাগদাদির সহযোগী ইসমায়েল আল ইথাবিকে আটক করার পর তাকে ইরাকের হাতে তুলে দিয়েছিল। এই ইথাবিই ইরাকি কর্মকর্তাদের জানান, শনাক্তকরণ এড়াতে বাগদাদি অনেক সময় শাকসবজিভরা চলন্ত মিনিবাসে বসে তার কমান্ডারদের সঙ্গে কৌশল নিয়ে আলোচনায় বসতেন।

 ‘বাগদাদির চলাফেরা ও লুকিয়ে থাকার জন্য যেসব জায়গা সে ব্যবহার করে ইথাবি তার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়, এসব তথ্যই ইরাকের বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত টিমকে ধাঁধার সমাধান পেতে সাহায্য করে,’ বলেছেন এক ইরাকি নিরাপত্তা কর্মকর্তা। ‘ইথাবি তার নিজের কথাসহ পাঁচজন লোকের বিস্তারিত তথ্য আমাদের জানায়, এরা সবাই বাগদাদির সঙ্গে সিরিয়া ও বিভিন্ন স্থানে (যেগুলো তারা ব্যবহার করেছে) বৈঠক করেছিল, রয়টার্সকে বলেন ওই কর্মকর্তা। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও কয়েকজন আইএস কমান্ডার ধরা পড়ে। তাদের দেওয়া তথ্যে মাস পাঁচেক আগে জানা যায়, ইদলিবের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে বাগদাদি তার পরিবার ও তিন ঘনিষ্ঠ সহযোগী বসবাস করছেন। তবে তারা অনবরত এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে চলে যাচ্ছিলেন,’ বলেন তিনি। পরে এসব তথ্য মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএকে দেওয়া। হয়। আর তারা স্যাটেলাইট ও ড্রোন ব্যবহার করে পাঁচ মাস ধরে ওই এলাকার ওপর নজরদারি করে। সিআইএ সর্বশেষ নিশ্চিত তথ্যটি পায় ইরাক ও সিরিয়াজুড়ে থাকা কুর্দি বাহিনী থেকেই। বৃহস্পতিবার মার্কিন গোয়েন্দারা খবর পান বাগদাদিকে উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ার ইদলিবে পাওয়ার ‘প্রবল সম্ভাবনা’ রয়েছে। শুক্রবার পুরো প্রস্তুতি সেরে ফেলে মার্কিন প্রশাসন। শনিবার সকালে ইদলিবে অভিযান চালানোর মতো ‘নির্ভরযোগ্য তথ্য’ পান মার্কিন গোয়েন্দারা। জানা যায়, ইদলিবের বারিশা এলাকায় আইএসের একটি সুড়ঙ্গে সপরিবারে রয়েছে বাগদাদি। তার সঙ্গে রয়েছে একদল আইএস জঙ্গিও। মার্কিন প্রশাসনের ভিতর যে এমন ‘ঝড়ের প্রস্তুতি’ চলছে তা কোনোভাবেই আগাম টের পাওয়া যায়নি। শুক্রবার রাতে ট্রাম্পকন্যা ইভাঙ্কা ট্রাম্প ও জামাই জারেদ কুশনেরের দশম বিবাহবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে যোগ দেন ট্রাম্প। শনিবার সকালে ভার্জিনিয়ায় গলফ খেলতেও যান তিনি। সেখান থেকে বিকালের দিকে সরাসরি ওয়ার রুমে ঢুকে পড়েন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। আর ওয়াশিংটন থেকে ছয় হাজার মাইল দূরে বাগদাদি বধের যুদ্ধে যোগ দেয় আমেরিকার বিখ্যাত ডেল্টা ফোর্সও। সেনাকর্তাদের সবুজ সংকেত পেতেই রবিবার ভোর রাতে পশ্চিম ইরাকের আল আসাদ বিমানবন্দর থেকে উড়ান শুরু করে আটটি আধুনিক হেলিকপ্টার। এই অভিযানের সময় সিরিয়া ও রুশ আকাশসীমার ওপর দিয়ে যেতে হয়েছে মার্কিন কপ্টারগুলোকে। তবে সেই আকাশপথ ব্যবহারের অনুমতিও পেয়েছেন তারা। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বলছে, ঘণ্টা খানেকের অভিযানেই শেষ হয়ে যায় গোটা দুনিয়ার ত্রাস, আইএস জঙ্গিপ্রধান আবু বকর আল বাগদাদি। মার্কিন বাহিনীর হামলার তীব্রতার সামনে ভেঙে পড়ে আইএসপ্রধানের প্রতিরোধ। আক্রমণের তীব্রতা কেমন ছিল তা উঠে এসেছে বারিশা এলাকার প্রত্যক্ষদর্শীদের কথায়। ওই গ্রামবাসী বলেন, ‘আমরা ব্যালকনিতে গিয়ে দেখলাম গুলিবৃষ্টি চলছে। তাই আমরা ভিতরে গিয়ে লুকিয়ে পড়লাম।’ এর পরেই বাগদাদির ডেরায় একের পর এক বিস্ফোরণ ঘটতে থাকে। আর ট্রাম্প জানান, শেষ পর্যন্ত পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করে বাগদাদি। কম্পাউন্ডে থাকা লুকানো সুড়ঙ্গ পথ ধরে পালানোর চেষ্টা করে সে। তিন সন্তানকেও টেনে-হিঁচড়ে সঙ্গে নিয়ে যায় আইএসপ্রধান। সর্পিল সেই সুড়ঙ্গ পথে তার পেছনে ধাওয়া করে মার্কিন সেনাও। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, গোটা রাস্তাটাই গোঙাচ্ছিল বাগদাদি। সে মাঝে মাঝে চিৎকার করছিল এবং কাঁদছিলও। কিন্তু এক সময় সুড়ঙ্গও শেষ হয়ে যায়। সে সময় সুইসাইড ভেস্ট (বোমা বাঁধা পোশাক)-এর মাধ্যমে বিস্ফোরণ ঘটায় সে। মুহূর্তেই বাগদাদি ও তার সন্তানদের দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। মার্কিন প্রেসিডেন্টের কথায়, শেষ পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে বাগদাদির সামান্য দেহাংশ খুঁজে পায় মার্কিন বাহিনী। কিন্তু এর পরেও বাগদাদির মৃত্যু নিয়ে সন্দিহান ছিল মার্কিন বাহিনী। শেষ পর্যন্ত ঘটনাস্থল থেকে মেলা দেহাংশের ডিএনএ পরীক্ষা করে বাগদাদির মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত হন তারা। জানা গেছে, গোটা অপারেশন শেষ হওয়ার পর অন্তত দুই ঘণ্টা বাগদাদির গুপ্ত আস্তানায় তল্লাশি চালায় মার্কিন বাহিনী। সেখান থেকে আইএস-এর প্রচুর নথি উদ্ধার হয়েছে। তাতে জঙ্গি সংগঠনটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কিত নানা নথিপত্র রয়েছে বলে মার্কিন প্রেসিডেন্টের দাবি। বাগদাদির ওই আস্তানা থেকে কয়েকজন শিশুকেও উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে বাহিনী ফিরে আসতেই তা পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়। মার্কিন প্রশাসন সূত্রে খবর, বাগদাদির দেহ প্রথা মেনেই সমাধি দেওয়া হবে, ঠিক যেমনভাবে সলিল সমাধি দেওয়া হয়েছিল আল কায়দাপ্রধান ওসামা বিন লাদেনের দেহ। বিবিসি, সিএনএন, এএফপি


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর