শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ ২৩:২২

বঙ্গবন্ধু টানেল

বদলে যাবে পারকি সৈকতের চেহারা

ফারুক তাহের, চট্টগ্রাম

বদলে যাবে পারকি সৈকতের চেহারা

আনোয়ারার পারকি সমুদ্রসৈকত- এ যেন এক মিনি কক্সবাজার। স্থানীয়দের ভাষায় পারকির চর। পারকির চর বা পারকি সমুদ্রসৈকত কর্ণফুলীর মোহনায় হলেও এর বিস্তৃতি কর্ণফুলী নদীর মোহনা থেকে দক্ষিণে শঙ্খ নদীর মোহনা পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার। সৈকতের বালিয়াড়ি, ঝাউবাগান, লাল কাঁকড়ার ঝাঁক, বন্দরের বহির্নোঙরে সারি সারি জাহাজ, রাতের আলোকচ্ছটা যেন প্রতিনিয়তই আহ্বান করে পর্যটকদের। কক্সবাজারের মতো পারকি সমুদ্রসৈকতে বসেও দেখা যায় অপরূপ গোধূলিবেলা ও সূর্যাস্তের দৃশ্য। কক্সবাজারে হোটেল-মোটেল আছে, থাকা-খাওয়ার সুবিধা আছে। কিন্তু পারকিতে এর সীমাবদ্ধতা রয়েই গেছে। তবে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মীয়মাণ বঙ্গবন্ধু টানেলের কাজ শেষ হলেই প্রাকৃতিক এই সমুদ্রসৈকতের দৃশ্যপট পাল্টে যাবে, পর্যটনের অপার সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাবে বলে মনে করছেন পর্যটন করপোরেশন। ইতিমধ্যে পারকি সমুদ্রসৈকতকে এক্সক্লুসিভ পর্যটন জোন করার ঘোষণা দিয়ে প্রাথমিক কার্যক্রমও শুরু করেছে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন। বেসরকারি উদ্যোগে ব্যক্তিমালিকানাধীন পর্যায়েও এখানে গড়ে তোলা হচ্ছে বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনা।

চট্টগ্রাম শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরের পারকি সমুদ্রসৈকত ঘিরে আনোয়ারা তথা দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছে সরকার। এখানকার অবকাঠামোগত উন্নয়ন, রাস্তাঘাট, হোটেল-মোটেল নির্মাণসহ বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নও শুরু হয়েছে। বিশেষ করে কর্ণফুলীর তলদেশে যে টানেল নির্মাণ হচ্ছে এর মুখ বের হবে পারকির অদূরে সিইউএফএল এলাকায়। ফলে এখন পর্যটকদের যাতায়াতে যে ভোগান্তি পোহাতে হয় অদূর ভবিষ্যতে তা আর থাকবে না। টানেল ব্যবহার করে মাত্র ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে পর্যটকরা পৌঁছে যেতে পারবেন নান্দনিক পারকিতে।

স্থানীয় ৩ নম্বর রায়পুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. জানে আলম ও ২ নম্বর বারশত ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এবং পারকি বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্য কাইয়ূম শাহ বলেন, ২০২১ সালের মধ্যেই পারকি বিচে লক্ষণীয় ও দর্শনীয় পরিবর্তন হবে। পারকিকে এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন করার স্বপ্ন দেখেছিলেন প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে প্রস্তাব করেছিলেন। আজ থেকে আট বছর আগে প্রধানমন্ত্রী নিজেই চট্টগ্রামের একটি জনসভায় এসে আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর উপস্থিতিতে আনোয়ারার পারকিকে এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন ঘোষণা করেন। এলাকার অবকাঠামো উন্নয়নে সরকার এরই মধ্যে একনেকে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ এই লক্ষ্য নিয়েই গড়ে তোলা হচ্ছে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল। এর সুফল হিসেবেই আনোয়ারা ও পারকি হবে অন্যতম আরেকটি আধুনিক শহর। অপরূপ সৌন্দর্যের পারকি সৈকতে এক পাশে রয়েছে সুদীর্ঘ ঝাউয়ের সারি। এখানে রয়েছে ঘোড়ায় চড়াসহ হরেক রকমের রাইড, স্পিডবোট। সব মিলিয়ে অনিন্দ্য সুন্দর সৈকতটি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে যেন অন্য এক কক্সবাজার। সাগরের কোল ঘেঁষেই সৈকতে রয়েছে সবুজ শ্যামল লুসাই পার্ক, পার্ক-সংলগ্ন বেশ কয়েকটি পিকনিক স্পট, গাড়ি পার্কিংয়ের অবারিত সুযোগ। ইদানীং ট্যুরিস্ট পুলিশ মোতায়েন করায় এখানে প্রতিদিন ঢল নামে হাজারো পর্যটকের। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুবান্ধব নিয়ে এখানে ছুটে আসেন পর্যটকরা।

ক্রিস্টাল গোল্ড জাহাজ যেন বাড়তি আকর্ষণ : পারকি সৈকতে বেড়াতে আসা পর্যটকদের কাছে দানবাকার ক্রিস্টাল গোল্ড জাহাজ ঘিরে আগ্রহের কমতি নেই। ২০১৭ সালের ৩০ মে ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’র প্রভাবে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর থেকে এমভি ক্রিস্টাল গোল্ড নামের জাহাজটি আনোয়ারার পারকি সমুদ্রসৈকতে আটকা পড়ে। এর আগে বিভিন্ন মামলায় জড়িয়ে জাহাজটি জব্দ অবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে বহির্নোঙরে ছিল। এখানে গেলেই বাড়তি পাওয়া হিসেবে জাহাজটিতে চড়ার স্বাদ পান পর্যটকরা। অনেকেই দূর থেকে সাগরের বড় জাহাজগুলো দেখতে পেয়ে থাকেন। কিন্তু যারা দেখার সময়-সুযোগ পাননি তারা আস্ত একটি বড় আকারের জাহাজ দেখতে পাবেন পারকিতে গেলেই। এই জাহাজ ঘিরেই চলছে প্রতিদিন হাজারো পর্যটকের ছবি তোলা আর সেলফিবাজি।

বারবিকিউ, ফায়ারক্যাম্প ও তাঁবুবাস : পর্যটন স্পট হলেও পারিক সমুদ্রসৈকতে এখনো অনেক নিরবচ্ছিন্ন পরিবেশ বিরাজ করে। বারবিকিউ, ফায়ারক্যাম্প ও তাঁবুবাসের জন্য পারকি সৈকতের মতো নিরিবিলি ও মুগ্ধতা দেশের ভিতর অন্য কোনো সৈকতে হয়তো পাওয়া যাবে না। স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে এখানে ক্যাম্প করা যায়। তা না হলে লুসাই পার্ক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে তাদের সীমানাতেই ফায়ারিং ক্যাম্প করা যায়। লুসাই কর্তৃপক্ষ অনুমতি ও যাবতীয় কাজে সহায়তা দিয়ে থাকে।

যাওয়ার উপায় : চট্টগ্রাম শহরের যে কোনো স্থান থেকেই বাস অথবা অন্য যে কোনো বাহন করে চট্টগ্রাম শাহ আমানত সেতু পর্যন্ত গেলে সেখান থেকে আনোয়ারার বটতলী মোহছেন আউলিয়ার মাজারের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া বাসে ভাড়া ৩০ টাকা। মাজারগামী বাসে উঠে ‘সেন্টার’ নামক জায়গায় নেমে সিএনজি ট্যাক্সিযোগে যাওয়া পারকিসৈকতে। রিজার্ভ সিএনজি ভাড়া ১০০ থেকে ১২০ টাকা। আর লোকাল হলে ৩০ টাকা। আবার সরাসরি কর্ণফুলী সেতু সংযোগস্থল থেকে রিজার্ভ সিএনজি করে গেলে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায় যাওয়া যায়।

এ ছাড়া দ্বিতীয় উপায় হিসেবে প্রথমে চট্টগ্রাম শহর থেকে পতেঙ্গা ১৫ নম্বর ঘাট। ঘাট থেকে ১৫ টাকা ভাড়ায় বোটে করে কর্ণফুলী নদী পার হয়ে সিএনজি ভাড়া করে পারকি সৈকতে যাওয়া যায়। চট্টগ্রাম শহর থেকে সিএনজি করে ১৫ নম্বর ঘাট (নেভালের পাশে/এয়ারপোর্ট গেটের একটু সামনে) যেতে হবে। রিজার্ভ ২০০ টাকা। নদী পার হয়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা বা সিএনজি নিয়ে যাওয়া যাবে পারকি সৈকতে। ভাড়া ১০০ থেকে ১২০ টাকা। নগরপথ দিয়ে গেলে এক পাশে নদী-জাহাজ আর অন্য পাশে ইন্ডাস্ট্রি, সামরিক এলাকা আর চট্টগ্রাম এয়ারপোর্ট। পথে যমুনা, মেঘনা, মবিল, ওমেরা এসব ইন্ডাস্ট্রিও চোখে পড়বে। এসব দেখতে দেখতে চলে যাওয়া যাবে ঘাটে। তিন টাকা ঘাট ফি দিয়ে ১৫ টাকা খরচে পার হওয়া যাবে কর্ণফুলী নদী।

খাবারের ব্যবস্থা : পারকি সৈকতে খাবারের জন্য অনেক রেস্টুরেন্ট গড়ে উঠেছে। স্থানীয় ছোট ছোট হোটেল ছাড়াও আছে জনপ্রিয় কয়েকটি রেস্টুরেন্ট। সামুদ্রিক মাছ থেকে মুরগি ও গরুর মাংস মেলে দুই বেলাতেই। দাম পর্যটন স্পট হিসেবে গলাকাটা না হলেও একেবারে কমও নয়।

থাকার ব্যবস্থা : পারকি সৈকতে এখনো থাকার ব্যবস্থা অপ্রতুল। সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে রিসোর্ট নির্মাণের কার্যক্রম শুরু হলেও এখনো শেষ হয়নি। তাই এখানে রাত কাটানোর মতো সুব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। তবে এখানে ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে উঠছে পারকি রিসোর্টসহ গুটিকয় মোটেল। পারকিতে রাত কাটাতে চাইলে স্থানীয় রিসোর্টে উঠতে পারেন।


আপনার মন্তব্য