শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩০ মার্চ, ২০২০ ২৩:৫৫

করোনায় ঝুঁকি বেশি বস্তিবাসীর

জিন্নাতুন নূর

করোনায় ঝুঁকি বেশি বস্তিবাসীর

কুলসুম বেগম। এক দশক ধরে মানুষের বাসাবাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করছেন। ঈদের ছুটি কিংবা অসুস্থ হলে তবেই কাজ থেকে ছুটি নেন। কিন্তু করোনাভাইরাসের আতঙ্কে এখন বেশ দুশ্চিন্তায় আছেন কুলসুম। রাজধানীর রূপনগর আবাসিক এলাকার এক বস্তিতে দুই ছেলে ও স্বামীকে নিয়ে থাকেন এই গৃহকর্মী। যে বস্তিতে কুলসুম থাকেন সেখানকার বেশির ভাগ মানুষের মধ্যেই করোনা নিয়ে তেমন সচেতনতা নেই। আবার অপরিষ্কার বস্তির একেকটি ঘরে একসঙ্গে গাদাগাদি করে অনেক মানুষ বসবাস করায় কুলসুমদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বেশি। উদ্বেগ প্রকাশ করে কুলসুম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমরা বস্তির অনেক মানুষ একসঙ্গে একটি বাথরুম ও টয়লেট ব্যবহার করতাছি। শুনছি করোনা রোগ ছোঁয়াচে আর বস্তিতে কারও এই রোগ হইলে তা অন্যদের মধ্যে ছড়াইতে বেশিক্ষণ লাগব না।’ কুলসুমের মতো ঢাকার অন্য বস্তিবাসীরাও এখন ঝুঁকি নিয়ে বাস করছেন। সাধারণত রিকশাচালক, গৃহকর্মী, গার্মেন্ট কর্মী, ভ্যানচালক ও হকারের মতো নি¤œ আয়ের মানুষ বস্তির অস্বাস্থ্যকর ঘিঞ্জি পরিবেশে থাকতে বাধ্য হন। আর এ ধরনের পরিবেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়। বস্তিবাসীরা জানান, জীবন ও জীবিকার তাগিদে প্রতিদিনই ঝুঁকি নিয়ে জনসমাগম বেশি হয় এমন স্থানে তাদের যেতে হচ্ছে। আবার পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করতে না পারার সীমাবদ্ধতা বস্তিবাসীর করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার আরেকটি কারণ। অথচ রাজধানীবাসী যেখানে এই ভয়ঙ্কর ভাইরাস থেকে নিরাপদে থাকতে মুখে মাস্ক এবং হাতে স্যানিটাইজার ব্যবহার করছেন, সেখানে ঢাকার বস্তিবাসীর মধ্যে হাতে গোনা কয়েকজনকে মাস্ক ব্যবহার করতে দেখা যায়। আর হ্যান্ড স্যানিটাইজার তো তাদের কাছে এক ধরনের বিলাসী পণ্য। বস্তির অনেকেই আছেন, যাদের ভালোমতো সাবান দিয়ে হাত ধোয়ারও সুযোগ নেই। এরই মধ্যে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করায় ঢাকাবাসী বাড়ি ছেড়ে গ্রামে চলে যেতে শুরু করেছেন। এতে নি¤œ আয়ের এই মানুষদের আয়-রোজগার কমে এসেছে। অনেককেই দুই বেলা খাবার জোগাড় করতে গিয়ে এখন হিমশিম খেতে হচ্ছে। আবার কেউ কেউ করোনাভাইরাস প্রতিরোধে গুজবের ফাঁদে পড়ে থানকুনি পাতা খাচ্ছেন, কেউ আবার ঝাড়ফুঁক করাচ্ছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ বস্তিশুমারি ও ভাসমান লোক গণনার তথ্যমতে, দেশে মোট বস্তির সংখ্যা ১৩ হাজার ৯৩৫টি। বস্তিবাসী ও ভাসমান খানা রয়েছে ৫ লাখ ৯৪ হাজার ৮৬১টি। এর মধ্যে সিটি করপোরেশন এলাকায় রয়েছে ৪ লাখ ৩১ হাজার ৭৫৬টি। এ শুমারিতে বস্তিবাসীর সংখ্যা ৬ লাখ উল্লেখ করা হয়। তবে বর্তমানে এ সংখ্যা অনেক বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা প্রতিরোধে বস্তিবাসীকে বাদ দিয়েই কাজ করা হচ্ছে। ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তাদের জন্য এখনো দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অথচ সাধারণের চেয়ে বস্তিবাসী ও ছিন্নমূল মানুষের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি। রামপুরার বউবাজার এলাকার বাদাম বিক্রেতা সজীব বলেন, ‘মানুষ কইমা যাওয়ায় বেচাবিক্রি এক্কেবারে কম। সারা দিন ঝুঁকি নিয়া রাস্তায় রাস্তায় ঘুইরা বাদাম ফেরি করলেও বিক্রি না থাকায় বিপদে পড়ছি।’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য নজরুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘করোনা সম্পর্কে সচেতন হওয়ার জন্য যে ন্যূনতম শিক্ষা প্রয়োজন, তা বস্তিবাসীর নেই। আবার গণমাধ্যমগুলোয় করোনাভাইরাসের জন্য প্রচারিত সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন যে বস্তিবাসীর মধ্যে সবাই দেখেন, এমন নয়। এখনো বস্তিবাসীকে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাচ্ছে বেসরকারি এনজিও সংস্থাগুলো। আশঙ্কাজনক হলেও এটি সত্য, বস্তিবাসীর মধ্যে করোনার উপসর্গ দেখা দিলেও তারা এ ভাইরাস পরীক্ষার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানকে ফোন দেবেন না। আবার বস্তিবাসীর নমুনা সংগ্রহ করতে কেউ বস্তিতেও যাবেন না। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরই বস্তিগুলোয় গিয়ে কেউ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কি না তা দেখতে হবে। প্রয়োজনে আক্রান্ত ব্যক্তির নমুনা সংগ্রহ করে আনতে হবে।’


আপনার মন্তব্য