শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২২ এপ্রিল, ২০২১ ২৩:২০

কাছের খুনিকে চিনতে লাগল পাঁচ বছর

মির্জা মেহেদী তমাল

কাছের খুনিকে চিনতে লাগল পাঁচ বছর

চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার ঢেমশা রোডের চিকন খালের পাড়ে যুবকের লাশ। পুলিশ তার প্যান্টের পকেট হাতড়িয়ে খুঁজে পায় একটি মানিব্যাগ। টাকা ছিল না। ছিল কিছু কাগজপত্র। গাজীপুরের টঙ্গীর একটি গার্মেন্টের কার্ড। সেখানে তার নাম ঠিকানা পাওয়া যায়। পুলিশ জানতে পারে, খুলনা বাগেরহাট সদর এলাকার বাসিন্দা গফুর শেখের ছেলে এই যুবক। নাম তার শহীদুল ইসলাম। বয়স ২৩। ব্যাস এটুকুই। পুলিশ লাশ উদ্ধার করে মর্গে পাঠায়। কিন্তু পুলিশের মাথায় ঢুকে না, বাগেরহাটের এই ছেলে চট্টগ্রাম কেন এসেছে। থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করে পুলিশ। ঘটনা ২০১৩ সালের ৮ আগস্টের। পুলিশ ঠিকানা মতে বাগেরহাটে খবর দেয়। শহীদুলের আত্মীয়স্বজন খবর পেলেও তারা চট্টগ্রাম আসতে চায় না। তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা এতটাই নাজুক ছিল যে, লাশ চট্টগ্রাম থেকে বাগেরহাট নেওয়ার মতো টাকাও তাদের ছিল না। পুলিশ তিন দিন পর বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে দাফনের ব্যবস্থা করে। চট্টগ্রামেই শহীদুলের লাশ দাফন করা হয়। শহীদুলের প্যান্টের পকেট থেকে পাওয়া মানিব্যাগ আর কাগজপত্র থানাতেই রেখে দেওয়া হয়। পুলিশ মানিব্যাগে একটি সাদা কাগজের টুকরা খুঁজে পায়। সেখানে হাতে লেখা ছিল তিনটি ফোন নম্বর। কিন্তু পুলিশ শহীদুল মৃত্যুর বিষয়ে তদন্তে খুব একটা আগ্রহী না হওয়ায় ফোন নম্বর যেখানকারটা সেখানেই রেখে দেয়। থানা পুলিশ অপমৃত্যু মামলা করেই তাদের দায়িত্ব শেষ করে। এক বছর পর শহীদুলের মৃত্যুর বিষয়টি আবার সামনে চলে আসে। ফরেনসিক বিভাগ থেকে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন আসে থানায়। তাতে উল্লেখ রয়েছে, ভারী কিছু দিয়ে শহীদুলের মাথায় দুইবার আঘাত করা হয়েছে। রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়। পুলিশ এবার থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। কিন্তু এক বছর আগেকার ঘটনা। পুলিশ এই খুনের রহস্য উদঘাটন কীভাবে করবে! পুলিশ থানার ড্রয়ার হাতড়ে খুঁজে পায় সেই মানিব্যাগ। মানিব্যাগের ভিতর থাকা কাগজপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে থাকে। তদন্তকারী কর্মকর্তা সেই তিনটি নম্বরের ব্যবহারকারীকে খোঁজ করে। দুটি নম্বর বন্ধ পায়। এরপর শেষের নম্বরটি পাওয়া যায় খোলা। পুলিশ কল দেয় সেই নম্বরে। বেশ কিছুক্ষণ রিং হওয়ার পর একজন ফোন ধরলেন। মহিলার কণ্ঠ। পুলিশ সেই মহিলাকে থানায় যোগাযোগ করতে বলে।

ফোনের ব্যবহারকারী এক মহিলা আসে থানায়। তদন্তকারী কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করেন। তিনি চট্টগ্রামের স্বর্ণকার মিহির বণিক প্রকাশের স্ত্রী প্রীতি বণিক প্রকাশ। মধ্য বয়সী এই মহিলাকে পুলিশ জেরা করে। তার তিনটা ফোন নম্বর শহীদুলের কাছে কেন? প্রীতি আকাশ থেকে পড়েন। তিনি বলেন, ‘এক বছর আগে মারা যাওয়া যুবকের কাছে আমার ফোন নম্বর কেন ছিল, তা আমি জানি না। মানুষের নম্বর মানুষের কাছে থাকতেই পারে। সেটা আমি কী করে বলব?’ পুলিশ প্রীতির কাছ থেকে কোনো তথ্য পায় না। হত্যার রহস্য উদঘাটনে কোনো সূত্র খুঁজে পায় না পুলিশ। শহীদুলকে ওই এলাকার লোকজনও আগে কখনো দেখেনি। যে কারণে তার বিষয়ে কোনো তথ্য পায়নি পুলিশ। প্রায় বছরখানেক পর পুলিশ আদালতে চার্জশিট দিলেও তাতে আসামি শনাক্ত হয়নি বলে উল্লেখ করে। মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় সিআইডির কাছে। সিআইডি নতুন করে তদন্ত শুরু করে। সিআইডি তদন্তে রহস্য উদঘাটন হয় না। সাতকানিয়ায় শহীদুল খুনের ঘটনাটি মানুষ ভুলেই যায়। মামলাটিও ধামাচাপা পড়ে থাকে। সিআইডি আদালতে থানা পুলিশের মতোই রিপোর্ট জমা দেয়। রহস্য অনুদঘাটিত।

আদালতের সন্দেহ হয়। এই সন্দেহ থেকেই ঘটনার ৫ বছর পর এ মামলার তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। মামলাটিতে যে ক্লু ছিল তা দিয়ে দুই দফায় তদন্ত করেও কোনো রহস্য উদঘাটনে ব্যর্থ হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অথচ একই ক্লু দিয়ে মাত্র ২৮ দিনেই ঘটনার রহস্য উন্মোচন করে পিবিআই। ঘটনার সঙ্গে জড়িত মূল দুজন আসামি প্রীতি বণিক (৪৫) এবং তার ভাই রাজু ধর (২৫)-কে গ্রেফতার করে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন পুলিশ পরিদর্শক মো. আবদুর রাজ্জাক।

তদন্তের দায়িত্ব পেয়ে পিবিআই প্রথমেই তলব করে প্রীতিকে। পুলিশের ফোন পেয়েই অনেকটা স্বাভাবিক মনেই পিবিআই অফিসে আসেন প্রীতি। তার আচরণ ছিল অনেকটা স্বাভাবিক। প্রথমে এ হত্যাকান্ডের বিষয়ে কিছু না বললেও পরবর্তীতে পিবিআইর বুদ্ধিমত্তার কাছে হার মানতে হয় প্রীতিকে। একপর্যায়ে সব স্বীকার করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে। এর পর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট জয়ন্তী রানী রায়ের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে নিজের অপরাধের কথা তুলে ধরেন প্রীতি।

ঘটনা যেভাবে : ২০১৩ সালে মোবাইলে ক্রস কানেকশনে শহীদুলের সঙ্গে তার পরিচয় হয় তিন সন্তানের জননী প্রীতির। নিজেকে মুক্তা পরিচয়ে কথা চালিয়ে যায় শহীদুলের সঙ্গে। এক সময়ে তাদের গভীর প্রেম হয়। শহীদুল চট্টগ্রাম এসে তার সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করে। সব ধরনের সম্পর্কে তারা জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু মাঝে মধ্যেই প্রীতির কাছ থেকে বিকাশে টাকা নিত শহীদুল। প্রীতি তার স্বামীর স্বর্ণ বন্ধক রেখে তাকে টাকা দিত। ইতিমধ্যে প্রীতির মেয়ের সঙ্গেও ফোনে কথা বলত শহীদুল। তার সঙ্গেও ভাব হয় শহীদুলের।

শহীদুল টাকা ফেরত না দিয়ে আবারও প্রীতিকে টাকার জন্য চাপ দেয়। এতে প্রীতি অস্বীকৃতি জানালে শহীদুল তাদের দুজনের সম্পর্কের কথা তার স্বামীকে জানিয়ে দেবে বলে হুমকি দেয়। এ ছাড়া শহীদুলের কাছে তাদের পরকীয়া সম্পর্কের ভিডিও এবং অডিও ফাঁস করে দেওয়ারও হুমকি দেয়। তাতেও প্রীতি রাজি না হলে সর্বশেষ প্রীতির ছোট মেয়ের সঙ্গে শহীদুল অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলবে এবং মেয়ের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেবে বলে হুমকি দিতে থাকে। প্রীতির মনে ভীতির সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে প্রীতি তার ভাই রাজুর সঙ্গে পরামর্শ করে শহীদুলকে ২০১৩ সালের আগস্টে কৌশলে চট্টগ্রামে আনে।

প্রীতি জানায় প্রথমে শহীদুলকে হত্যার পরিকল্পনা না থাকলেও পরে তা পরিবর্তন করে। তাদের পরিকল্পনা ছিল শহীদুলকে শেষবারের মতো বুঝিয়ে এ সম্পর্কের যবনিকা টানবেন। কিন্তু শহীদুল যখন চট্টগ্রাম আসে নগরীর অলঙ্কার মোড়ে তাকে এ নিয়ে অনেক বোঝানো হয়। তখন প্রীতি বলেন, আসলে মুক্তা নামে কেউ নেই। প্রীতিই মুক্তা নামে তার সঙ্গে অভিনয় করেছিল। শহীদুল এসব মানতে রাজি হয়নি। তখন প্রীতি তার পরিকল্পনা পরিবর্তন করেন। এরপর নগরীর বহদ্দার হয়ে সাতকানিয়ায় প্রীতির বাপের বাড়ি যাওয়ার জন্য রওনা দেন তারা। কেরানিহাট গিয়ে হোটেলে খাওয়া-দাওয়া করে। এ ফাঁকে প্রীতির ভাই রাজু দোকান থেকে একটি রডের মাথা কিনে তা পেপারে মুড়িয়ে নেয়। শুরু হয় প্রীতির বাপের বাড়ির উদ্দেশে হেঁটে পথ চলা। একপর্যায়ে চিকন খাল কবরস্থান এলাকায় গেলে প্রীতির ভাই রাজু শহীদুলকে পেছন থেকে রড দিয়ে মাথায় পর পর দুটি আঘাত করে। এতে মাটিতে লুটে পড়ে শহীদুল। তখন প্রীতি তাকে চেপে ধরে মৃত্যু নিশ্চিত করে। শহীদুলের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পরই তারা সেখান থেকে চলে আসে।

এই বিভাগের আরও খবর