শনিবার, ২০ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ টা

কোন পথে যাচ্ছে ই-কমার্স

নামে-বেনামে শত শত প্রতিষ্ঠান । কোনো তদারকি নেই সরকারের

রুকনুজ্জামান অঞ্জন

কোন পথে যাচ্ছে ই-কমার্স

দেশে ভুঁইফোঁড়ের মতো নামে-বেনামে শত শত ই-কমার্র্স প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও কার্যত এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর কোনো তদারকি নেই সরকারের। বিভিন্ন সংস্থা বিচ্ছিন্নভাবে কিছু তদারকি করলেও নেই সমন্বিত উদ্যোগ। একদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একটি পৃথক কর্তৃপক্ষ গঠনে কমিটি করে দিয়েছে, যে কমিটির কাজ শেষ হতে না হতেই আবার মন্ত্রিপরিষদ থেকে করে দেওয়া হয়েছে আরেক কমিটি। মন্ত্রীরা মিটিং করে বলছেন, টাকা ফেরত দেওয়া হবে; অপরদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মতামত দিচ্ছেন মামলার কারণে আটকে থাকা অর্থ ফেরত দেওয়া যাবে না। সব মিলিয়ে দেশের ই-কমার্র্স খাত কোন পথে যাচ্ছে কেউ বলতে পারছে না। প্রতারিত ভোক্তারা টাকা ফেরত পাবেন কি না সে নিশ্চয়তাও দিতে পারছেন না কেউ।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ই-কমার্র্স খাতে শৃঙ্খলা রক্ষায় করণীয় নির্ধারণে কাজ করছে একাধিক কমিটি। প্রতারণা ও গ্রাহক ঠকানোর ঘটনায় টালমাটাল ই-কমার্র্স খাতে সুশাসন আনার চেষ্টায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নবগঠিত ই-কমার্র্স সেল পুনর্গঠন করা হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে দফায় দফায় মিটিং করছেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীগণ। এমন কি ক্ষতিগ্রস্ত ভোক্তার টাকা ফেরত দিতে করণীয় নির্ধারণে সবশেষ মন্ত্রিপরিষদ থেকেও একটি শক্তিশালী কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। আদালত থেকেও সময় সময় নির্দেশনা ও সরকারের করণীয় জানতে চাওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি ই-কমার্র্স নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কারিগরি কমিটির কার্যক্রম জানতে চেয়ে আদেশ দেয় আদালত।

কারিগরি কমিটির প্রধান বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এএইচএম সফিকুজ্জামান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আদালতের আদেশ অনুযায়ী আমরা আজকেই (গতকাল) প্রতিবেদন পাঠিয়ে দিয়েছি। এর আগে মন্ত্রিপরিষদেও ই-কমার্স খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সুপারিশসহ একটি প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদে যে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে, আদালতকে তাই অবহিত করা হয়েছে।

ই কমার্স খাতে তদারকির পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের অর্থ ফেরতে করণীয় নির্ধারণে গত মাসে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এ এইচ এম সফিকুজ্জামানকে প্রধান করে কমিটি করে দেয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। ওই কমিটিকে টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়ে ১৫ দিনের মধ্যে একটি প্রতিবেদন দেওয়ার পাশাপাশি দুই মাসের মধ্যে একটি আইনের খসড়া করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। কমিটি তদারকির বিষয়ে বিভিন্ন সুপারিশ জমা দিলেও অর্থ ফেরতের বিষয়ে কোনো করণীয় জানাতে পারেননি। ফলে ই-কমার্সের ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহক টাকা ফেরত পাবে কিনা তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েই গেছে।

সফিকুজ্জামান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকের টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত চাওয়া হয়েছে। দুই-একদিনের  মধ্যে মতামত পাওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে এ বিষয়ে কিছু বলা যাবে না। আর টাকা ফেরতের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আপত্তি আছে। যেহেতু কিছু গ্রাহক অর্থ উদ্ধারে আদালতে মামলা করেছেন, সেই তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত টাকা ফেরত দেওয়া উচিত হবে না বলে মনে করছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সূত্রগুলো জানায়, ইভ্যালিকান্ডের পর একের পর এক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতারণার তথ্য বেরিয়ে আসতে থাকে। ইঅরেঞ্জ, কিউকমসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তারা গ্রাহকদের লোভের ফাঁদে ফেলে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়। এ অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকের টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়ে গত ২৫ অক্টোবর তিন মন্ত্রীর বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে। বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি জানান, ই-কমার্সে ক্ষতিগ্রস্ত ভোক্তাদের ২১৪ কোটি টাকা আমানত এসক্রো সার্ভিসে আটকে আছে। এই টাকা তিন মাসের মধ্যে ফেরত দেওয়া হবে। মন্ত্রিপরিষদ কমিটির প্রধান জানান, টাকা ফেরত ছাড়াও তাদের আরও কিছু দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেসব বিষয়ে তারা সুপারিশ জমা দিয়েছেন। যেমন- ই-কমার্র্স ব্যবসা পরিচালনা করতে হলে বাধ্যতামূলকভাবে নিবন্ধন নিতে হবে; প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন নম্বর নিতে হবে; ক্রেতা আকর্ষণে লটারি ও লোভনীয় অফার দেওয়ার সুযোগ দেওয়া যাবে না। ই-কমার্র্স পণ্যের মডেল হতে হলে তারকাদের সরকারি অনুমোদন নিতে হবে। এ ছাড়া ই-কমার্র্সগুলোর জন্য সেন্ট্রাল লগইন, চ্যাটিং প্ল্যাটফরম তৈরির পাশাপাশি অনলাইন সেন্ট্রাল কমপ্লেইন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম তৈরি করার সুপারিশও রয়েছে। ই-কমার্স নিয়ে তিন মন্ত্রীর বৈঠক শেষে এই খাতের শৃঙ্খলা আনতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও শাখার মহাপরিচালক মো. হাফিজুর রহমানকে প্রধান করে আরেকটি কমিটি করা হয়েছিল। ওই কমিটির কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে হাফিজুর রহমান বলেন, তিন মন্ত্রীর সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমাদের কমিটির কার্যক্রম প্রায় শেষের পথে। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোকে তদারকির আওতায় আনতে অনলাইন রেজিস্ট্রেশন নেওয়ার বিষয়ে সুপারিশ করেছি। এখন এই রেজিস্ট্রেশন কর্তৃপক্ষ কারা হবে সেটি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা চলছে। এ ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস (আরজেএসসি) থেকে নিবন্ধন নেওয়ার সুপারিশ করা হতে পারে। এ ছাড়া ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো কমপ্লায়েন্স পালন করছে কি না সেটি মনিটরিংয়ের দায়িত্ব দেওয়ার সুপারিশ করা হবে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরকে।

ই-কমার্স নিয়ে সরকারের এসব কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে দেশের আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সরকারের বিভিন্ন এজেন্সি যেগুলো রয়েছে, সমন্বিতভাবে তাদের মনিটরিং চালাতে পারলে ই-কমার্স খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা খুব কঠিন কিছু নয়। তিনি বলেন, এই যে গ্রাহকের শত শত কোটি টাকা নাই হয়ে গেছে- ই-কমার্স নিয়ে একের পর এক যে প্রতারণার ঘটনা ঘটছে, মূলত সঠিক মনিটরিংয়ের অভাবে এটি ঘটেছে। প্রাতিষ্ঠানিক তদরকির ক্ষেত্রে দুর্বলতা যেমন রয়েছে, তেমনি ক্রেতার লোভও একটি বড় কারণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আরও বলেন, যে কোনো খাতকে সামাল দেওয়ার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট বা স্বতন্ত্র কর্তৃপক্ষ দরকার। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে এ ধরনের একটি কর্তৃপক্ষ করার কথা থাকলেও সেটি হয়নি। এ ছাড়া ভোক্তার ক্ষয়ক্ষতি দেখার জন্য ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর আছে, তারা কতটা মনিটরিং করেছে সেটা খতিয়ে দেখতে হবে। কোনো পণ্যের দাম যেমন অযৌক্তিক বাড়ানোর সুযোগ নেই, তেমনি খুব বেশি কমানোর সুযোগও  নেই। ই-কমার্সে যখন ৬০ হাজার টাকার ফ্রিজ ৩০ হাজারে দিচ্ছিল তখন প্রতিযোগিতা কমিশনের উচিত ছিল এ বিষয়গুলোতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার। এ ছাড়া ই-কমার্স ওয়ালেট চালু করতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হয়। সে ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরও মনিটরিংয়ের সুযোগ আছে। ভারতে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর ভ্যাট ট্যাক্সের নিবন্ধন নিতে হয়; বাংলাদেশে সে সুযোগ থাকলে সরকারের রাজস্ব আদায়কারী সংস্থাগুলোও মনিটরিং করতে পারত।

এই রকম আরও টপিক

সর্বশেষ খবর