শিরোনাম
বুধবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০২৩ ০০:০০ টা

তুচ্ছ ঘটনায় খুনোখুনি

আলী আজম

তুচ্ছ ঘটনায় খুনোখুনি

১ ডিসেম্বর সকালে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার পুঁটিবিলা এলাকায় পারিবারিক কলহের জেরে মেয়ের দায়ের কোপে এক বাবার মৃত্যু হয়েছে। তার নাম আবদুর রহমান (৫১)। এ ঘটনায় অভিযুক্ত মেয়ে হুমাইরা আক্তারকে আটক করেছে পুলিশ। ওই মেয়ে বিবাহিত হলেও তিনি বাবার বাড়িতে থাকতেন। পুলিশ বলছে, গরুকে ভুসি খাওয়ানোকে কেন্দ্র করে হুমাইয়ার সঙ্গে বাবা আবদুর রহমানের কথা কাটাকাটি হয়। এরপর হুমাইরাকে থাপ্পড় মারেন তিনি। এতে রেগে গিয়ে ধারালো দা দিয়ে বাবার ঘাড়ে কোপ দেয় সে। ঘটনাস্থলেই মারা যান আবদুর রহমান।

গত ২৯ নভেম্বর রাতে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার মিঠানলা এলাকায় জিয়াউল হাসানকে (২০) কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। কোনো পদে না থাকলেও তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তিনি মাটি, ইট ও বালু সরবরাহের কাজ করতেন। ঘটনার সময় স্থানীয় দারোগারহাট বাজার থেকে বাড়ি ফিরছিলেন জিয়াউল। বাড়ির পাশে নতুন রাস্তা এলাকায় এলে স্থানীয় ছাত্রলীগ কর্মীদের সঙ্গে এলাকার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তার কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে তাকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। পুলিশ বলছে, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে জিয়াউলকে খুন করা হয়।

গত ১০ নভেম্বর সকালে রাজধানীর মুগদা থানার মান্ডা এলাকায় পরকীয়া সন্দেহে মসলা বাটার শিল দিয়ে মাথা থেঁতলে স্ত্রী পিংকিকে (৩০) খুন করে স্বামী শহিদুল ইসলাম ওরফে রিয়াজ। পুলিশ বলছে, পিংকি হত্যার ঘটনায় তার স্বামী রিয়াজকে আটক করা হয়েছে। প্রাথমিক     জিজ্ঞাসাবাদে রিয়াজ দাবি করেছে, রুবেল নামে একজনের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে তার স্ত্রী পিংকি পরকীয়া করে আসছিলেন। এরই জের ধরে ঘটনার দিন সকালে ঘুমের মধ্যে মসলা বাটার পুতা দিয়ে তার স্ত্রীর মাথা থেঁতলে মৃত্যু নিশ্চিত করেন। এ ঘটনায় কথিত প্রেমিক রুবেলকেও আটক করা হয়েছে।

এ শুধু তিনটি ঘটনার বর্ণনা। সারা দেশে এমন ঘটনা অহরহ ঘটছে। পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত সারা দেশে ৭০৯টি খুনোখুনির ঘটনা ঘটেছে। ২০১০ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সারা দেশে খুনের ঘটনা ঘটেছে ৪৮ হাজার ২৭২টি। ২০২২ সালে সারা দেশে হত্যাকাে র ঘটনা ঘটে ৩ হাজার ১২৬টি। এর আগের বছর ২০২১ সালে হত্যাকে র ঘটনা ঘটে ৩ হাজার ৪৫৮টি।

ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত রাজধানীতে ৮৪টি হত্যাকান্ড ঘটেছে। ২০২২ সালে ১৭৭টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। আর ২০২১ সালে খুনের ঘটনা ঘটেছিল ১৬৬টি। অপরাধের তথ্য বিশ্লেষণ করে পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, সারা দেশে তিন কারণে খুনের ঘটনা বেশি। এর মধ্যে পারিবারিক কলহ, সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধ ও পূর্বশত্রুতা অন্যতম। এ ছাড়া যেসব এলাকায় নিম্ন আয় ও ভাসমান মানুষের বসবাস বেশি, সেখানে অপরাধের ঘটনাও বেশি। কিশোর গ্যাংও অপরাধ প্রবণতা থেকে পিছিয়ে নেই। তারাও কথায় কথায় হামলা, মারধর, ছুরিকাঘাতে অপরাধের জন্ম দিচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল?্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, মনোমালিন্য, ঝগড়া, মারামারি, পারিবারিক কলহ, বন্ধুত্বকে কেন্দ্র করে খুনোখুনির ঘটনা ঘটে। তুচ্ছ কারণে যেসব মারামারি হচ্ছে সেগুলোও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আমলে নেওয়া উচিত। এসব ঘটনায় যারা জড়িত তাদের দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করা উচিত। এসব কেন ঘটছে- সেগুলো নিয়েও গবেষণা দরকার। আর সম্পর্কে অবনতির কারণে একপক্ষ আরেক পক্ষের ওপর হামলা করছে। কোনো এলাকায় এটা বাড়ছে, আবার কোনো এলাকায় এটা কমছে। আগের সংগঠিত কোনো অপরাধের বিচার যদি দ্রুত সময়ে না হয়, তাহলে এ ধরনের অপরাধ বেড়ে যায়। ডিএমপির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলছেন, রাজধানীতে বিভিন্ন সময়ে অপরাধের চিত্র বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। কোনো মাসে অপরাধ কমে, কোনো মাসে আবার বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ডিএমপির সবগুলো থানাকে নিয়ে মাসিক অপরাধ সভার মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধের চিত্র তুলে ধরা হয়। যেসব এলাকায় অপরাধের মাত্রা বেশি হয় সংশ্লিষ্ট ওই থানায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বারোপ করা হয়। সেখানে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। পুলিশ সদর দফতরের পুলিশ সুপার (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) ইনামুল হক সাগর বলেন, খুনের ঘটনাসহ বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সারা দেশে বিট পুলিশিং ও কমিউনিটি পুলিশ কাজ করছে। আইনবিরোধী কোনো কাজে কেউ যেন না জড়ায় সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষের মেলবন্ধন তৈরি করতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে পুলিশের প্রতিটি সদস্য। এরপরও কেউ যদি অপরাধ করেই ফেলে তার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা হচ্ছে। সেটি তদন্ত করে দ্রুততম সময়ে অপরাধীকে গ্রেফতার করা হচ্ছে। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) ড. খ. মহিদ উদ্দিন বলেন, যেখানে খুনের ঘটনা ঘটে সেখানে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে যাই। একই সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককেই গ্রেফতার করা হচ্ছে। অপরাধের সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হয় না। অপরাধ দমন পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। প্রত্যেক নগরবাসীর উচিত খুনসহ বিভিন্ন অপরাধ কমাতে আরও সচেতন হওয়া।

সর্বশেষ খবর