শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ১৯ জুন, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৯ জুন, ২০২১ ০০:০৫

এই অ্যান্টিবায়োটিক জীবন বাঁচাবে অসংখ্য মরণাপন্ন মানুষের

নতুন অ্যান্টিবায়োটিকের পাশে বাংলাদেশের নাম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

নতুন অ্যান্টিবায়োটিকের পাশে বাংলাদেশের নাম
Google News

বর্তমানে সংক্রামক নানা ধরনের অসুখে ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের কাজ না করার বিষয়টি বিশ্বজুড়েই চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিচ্ছে। সর্বশেষ আবিষ্কৃত মেরোপিনামেরও অনেক ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে অকার্যকারিতার তথ্য পাওয়া গেছে। এমন অবস্থায় আশার আলো দেখাচ্ছে বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের আবিষ্কৃত নতুন অ্যান্টিবায়োটিক ‘হোমিকরসিন’। অ্যানিমেল (প্রাণী) ও মানবদেহে এটি প্রয়োগের পর সফলতা পাওয়া গেলে নতুন এই অ্যান্টিবায়োটিক জীবন বাঁচাবে অসংখ্য মরণাপন্ন মানুষের।

পাট নিয়ে গবেষণা করতে গিয়েই এমন সফলতা পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী। এ গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. হাসিনা খান। যৌথভাবে কাজ করেছেন একই বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রিয়াজুল ইসলাম ও জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আফতাব উদ্দিন। গবেষণা কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন শাম্মী আক্তার, মাহবুবা ফেরদৌস, বদরুল হায়দার চৌধুরী ও আল আমিন নামের চার শিক্ষার্থী।

আবিষ্কারের পুরো গল্পটা বলেছেন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রিয়াজুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমরা আসলে পাটের বিভিন্ন মলিকিউলার বিশ্লেষণ নিয়ে কাজ করছিলাম। কাজটি করতে গিয়ে আমরা পাটের বীজ, পাতা, শিকড় ও বাকলের মধ্যে থাকা বেশ কিছু ব্যাকটেরিয়া বা ফাঙ্গাসের সন্ধান পাই। এসব নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে বেশ কিছু কাজের ক্ষেত্র তৈরি হয়। আমরা আসলে দেখতে চাচ্ছিলাম, এসব ব্যাকটেরিয়া কোনো অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল কম্পাউন্ড বা অ্যানজাইম তৈরি করে কি না, ক্যান্সারবিরোধী যৌগ তৈরি করে কি না।

তিনি জানান, এটা দেখতে গিয়েই আমরা ‘স্টেফাইলোকক্কাস হোমিনিস’ নামে নতুন একটি ব্যাকটেরিয়া পাই, যা ভালো একটি অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি করে। প্রাথমিক পরীক্ষায় এটা আমরা শনাক্ত করি। আরও ভালোভাবে জানার জন্য আমরা এটার জিনোম সিকোয়েন্স তৈরি করলাম। জিনোম সিকোয়েন্স বিশ্লেষণে দেখা গেল, এই স্টেফাইলোকক্কাস হোমিনিস তার জিনোমের মধ্যে একটি নতুন অ্যান্টিবায়োটিক তৈরির সব তথ্য সংরক্ষণ করে রেখেছে। মানে নিজ শরীর থেকে তারা অ্যান্টিবায়োটিকটি তৈরি করে, যা দিয়ে অন্য ব্যাকটেরিয়া মারা যায়।

অধ্যাপক রিয়াজুল বলেন, এ কাজগুলো কিন্তু আমরা কম্পিউটারের সামনে বসে করেছি। কিন্তু তখনও আমরা জানতাম না, এটা কীভাবে কম্পাউন্ড তৈরি করে, কী পরিমাণে তৈরি করে বা এর গাঠনিক বৈশিষ্ট্য কেমন। এগুলো জানার জন্য আমরা এর পিউরিফিকেশন বা বিশুদ্ধিকরণের কাজে মনোযোগ দিই। এজন্য কঠোর শ্রম দিয়েছেন আমাদের জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আফতাব উদ্দিন স্যার। এ ছাড়াও আমরা বিসিএসআইআরের ল্যাবরেটরি ব্যবহার করেছি। এটা প্রায় দুই বছর ব্যবহার করতে হয়েছে।

তিনি জানান, এটার কাজ শুরু করেছিলাম ২০১৫ সালে। এরপর যখন পিউরিফিকেশনের কাজ শেষ হলো তখন আমরা এর গঠন-কাঠামো, এটা কোন কোন প্যাথোজেনকে মেরে ফেলতে পারে, এর বিভিন্ন ধরনের বায়োকেমিক্যাল প্যারামিটারগুলো বোঝার চেষ্টা করি। এগুলো জানার পর আমরা বুঝতে পারি যে, এটি একটি নতুন অ্যান্টিবায়োটিক, যা এর আগে কেউ আবিষ্কার করেনি।

প্রায় ছয় বছরের চেষ্টায় সফলতার অমসৃণ পথটা মাড়িয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা। অধ্যাপক রিয়াজুল বলেন, এ ধরনের কাজ করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা নেই। বিসিএসআইআরে কিছুটা আছে। বিভিন্ন জায়গায় দৌড়াদৌড়ি করে কাজ করতে গিয়ে সময় বেশি লেগে গেছে।

উল্লেখ্য, অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ‘এমআরএসএ’-এর (মেটিসিলিন রেজিটেন্স স্টেফাইলোকক্কাস অরিয়াস) বিরুদ্ধে ভালো কাজ করেছে নতুন এই আবিষ্কার। ফলে অদূর ভবিষ্যতে জীবন রক্ষাকারী অমূল্য ওষুধ হয়ে উঠতে পারে এই অ্যান্টিবায়োটিক। তবে ওষুধ হিসেবে ব্যবহারের আগে এটিকে পার হতে হবে প্রি-ক্লিনিক্যাল ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল অর্থাৎ শুরুতে এটি কোনো প্রাণী যেমন- ইঁদুরের ওপর প্রয়োগ করা হবে। তাতে সফলতা পেলে মানবদেহে এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হবে। এ জন্য শিল্প পর্যায়ে ব্যাপকভাবে এই অ্যান্টিবায়োটিকের উৎপাদন করতে হবে। তবে এই অপেক্ষাও সময়সাপেক্ষ,  প্রয়োজন পর্যাপ্ত অর্থের জোগান।