শিরোনাম
সোমবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ টা

বঙ্গবন্ধুর স্নেহের মহসিন মৃত্যুশয্যায়

ক্রীড়া প্রতিবেদক

বঙ্গবন্ধুর স্নেহের মহসিন মৃত্যুশয্যায়

হাসপাতালে হকি তারকা মো. মহসিনের পাশে ছেলে তাহসিন আহমেদ গালিব -জয়ীতা রায়

ক্রীড়াঙ্গনে তাদের পরিচয় ছিল ত্রিরত্ন বলেই। হকির কিংবদন্তি আবদুস সাদেক, মো. মহসিন ও ইব্রাহিম সাবের। তিনজনই ক্যারিয়ারে দীর্ঘ সময়টা কাটিয়েছেন জনপ্রিয় ঢাকা আবাহনীতে। হকিতে তাদের স্ট্রিকের জাদু দেখে দর্শকরা মুগ্ধ হয়ে যেতেন। হকি ১১ জনের খেলা হলেও বলা হতো, যেখানে সাদেক, মহসিন আর সাবের রয়েছেন বাকিদের আর প্রয়োজন পড়ে না। তিনজনই দলকে জেতানোর জন্য যথেষ্ট। ষাটের দশকেই তারা ত্রিরত্নের খ্যাতি পেয়ে যান।

সাদেক সেন্টার হাফ, মহসিন রাইট হাফ ও সাবেরের পজিশন ছিল লেফট হাফ। কী অসাধারণ বোঝাপড়াই না ছিল তাদের মধ্যে! একে অপরের মধ্যে বল আদান-প্রদান করে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতেন সহজেই, যা দেখে চোখ জুড়িয়ে যেত। হকিতে এ ত্রিরত্নের নৈপুণ্যের কথা লিখে শেষ করা যাবে না। বাংলাদেশের হকির সোনালি যুগের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছেন তারা।

সেই মাঠ কাঁপানো তিন খেলোয়াড়ের একজন মো. মহসিন আজ মৃত্যুশয্যায়। দীর্ঘদিন ধরে নানা জটিল রোগে ভুগছেন তিনি। ১৯৮৬ সালে মহসিনের একটি কিডনি অচল হয়ে গেলে অস্ত্রোপচার করে ফেলে দেওয়া হয়। এরপর দীর্ঘদিন সুস্থ থাকলেও ২০০২ সালে তার ওপেন হার্ট সার্জারি করা হয়। পরবর্তী সময়ে আবারও হৃদরোগে আক্রান্ত হন তিনি।

এমন শরীর নিয়েও হকির মায়া ছাড়তে পারেননি মহসিন। নানা কর্মকাণ্ডে  নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন সব সময়। ৭০ বছরের এই ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে ২৫ জানুয়ারি তাকে ভর্তি করা হয় বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। অবস্থা সংকটাপন্ন দেখে চিকিৎসকরা তাকে সরাসরি পাঠিয়ে দেন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে। গতকাল কিছুটা সুস্থ বোধ করলে স্বজন-শুভানুধ্যায়ীদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। সাংবাদিক পরিচয় দিতেই মহসিন হাত মেলানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু চিকিৎসকরা নিষেধ করায় তা আর সম্ভব হয়নি। অশ্রুচোখে তিনি একটাই কথা বললেন, ‘সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন।’

কিছুটা সুস্থ হলেও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের প্রধান প্রফেসর ডা. মো. আবদুর রহমান বললেন, ‘মহসিন সাহেব এখনো আশঙ্কামুক্ত নন। শরীরে নানা রোগ বাসা বেঁধেছে। হার্টবিট স্বাভাবিক নয়। ব্লাড প্রেসারও নিচের দিকে নামছে। আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি প্রেসার স্বাভাবিক রাখার।’ মহসিনের শরীরের যে পরিস্থিতি তাতে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে পারবেন কি না তা নিশ্চিত নয়। গতকাল হাসপাতালে তার ছেলে তাহসিন আহমেদ গালিব কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘সব কিছু এখন আমরা আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছি। দীর্ঘদিন হাসপাতালে থাকতে হবে। তাই বাবাকে আমরা এখান থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে যাচ্ছি। ওখানে সিট পাওয়াটা ভাগ্যের ব্যাপার। তবে হকি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক সাদেক চাচা সহযোগিতা করায় তা সম্ভব হচ্ছে। সাদেক চাচা কিছুক্ষণ পরপরই ফোন করে বাবার খোঁজখবর নিচ্ছেন।’ গালিবের সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল তখনই তার হাতে ধরিয়ে দেওয়া হলো বিল। অঙ্কটা দেখেই গালিব বড় একটা নিঃশ্বাস ফেললেন। বললেন, ‘দেখুন, প্রায় ৮০ হাজার টাকা শোধ করে বাবাকে নিয়ে যেতে হবে। এত ব্যয় আমরা সত্যি কুলাতে পারছি না। দাদার ভিটেবাড়ি ছাড়া বাবার তো কিছুই নেই। আমি বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি। কত টাকা আর বেতন পাই। এই সামান্য টাকা দিয়ে বাবার চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া কি সম্ভব?’ কথাটা বলেই কেঁদে ফেললেন গালিব। এরপর বললেন, ‘বাবা তো দেশের নামকরা খেলোয়াড় ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর খুব কাছের মানুষ ছিলেন। কেউ কি পারেন না আমাদের এই দুঃসময়ে পাশে দাঁড়াতে!’ কথাটি বলছিলেন আর চোখ মুছছিলেন গালিব।

হকির তারকা খেলোয়াড় ছাড়াও মহসিনের আরেকটি বড় পরিচয় ছিল। বন্ধু সাদেকই তথ্যটা তুলে ধরলেন, ‘মহসিন ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুব স্নেহভাজন। ছেলের মতোই তাকে স্নেহ করতেন। বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তা কর্মকর্তার দায়িত্বে ছিলেন মহসিন। শুধু তা-ই নয়, ও ভালো গাড়ি চালাতেন বলে বঙ্গবন্ধু যেখানেই যেতেন অধিকাংশ সময় মহসিনকে দিয়ে গাড়ি ড্রাইভ করাতেন। বঙ্গবন্ধু ও শেখ কামালের কাছের মানুষ ছিলেন বলে ১৯৭৫ সালের পর মহসিনকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ওই সময় বিদেশে গিয়ে প্রাণে বেঁচে যান মহসিন।’

মহসিনের পরিবারকে বলা হয় হকির পরিবার। বড় ভাই নাইম, ছোট ভাই এহসান নাম্মি ছিলেন তারকা খেলোয়াড়। নাম্মি এক সময় জাতীয় হকি দলকে নেতৃত্ব দেন। আবাহনীর অধিনায়কও ছিলেন তিনি। এ ছাড়া হকির জনপ্রিয় খেলোয়াড় আয়েশ, কায়েস, লুলু, চপল ও টুহু হলেন মহসিনের আপন মামাতো ভাই। মহসিন পূর্ব পাকিস্তান ছাড়াও বাংলাদেশ জাতীয় দলে খেলেন। ১৯৮৫ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপে মহসিন ছিলেন জাতীয় দলের প্রশিক্ষক।

হকির কারিগর প্রতিষ্ঠান বলে খ্যাত ঐতিহ্যবাহী আরমানিটোলা স্কুল থেকেই হকিতে যাত্রা মহসিনের। ক্রীড়াঙ্গনে বিশেষ অবদানের জন্য ২০০৯ সালে তিনি জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার পান।

সর্বশেষ খবর