শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ২৩:২৯

সাঁতারের বাতিঘর আমলা

জহুরুল ইসলাম, কুষ্টিয়া

সাঁতারের বাতিঘর আমলা
আমলায় সুইমিং পুল নেই। খুদে সাঁতারুরা তাই পুকুরেই অনুশীলনে ব্যস্ত -বাংলাদেশ প্রতিদিন

কুষ্টিয়া শহর থেকে মেহেরপুর সড়ক ধরে ২২ কিলোমিটার গেলেই মিরপুর উপজেলার আমলা গ্রাম। তবে এ অঞ্চলের মানুষ  আমলাকে ‘সাঁতার গ্রাম’ নামেই বেশি চেনে। কারণ দেশের যে প্রান্তেই সাঁতার প্রতিযোগিতা হোক না কেন কোনো না কোনো সংগঠনের হয়ে অংশ নেন এই গ্রামের ছেলেমেয়েরা। আমলা সরকারি কলেজের হাজামজা পুকুরে অনুশীলন করেই তারা সুনাম কুড়াচ্ছেন সাঁতারে।

ঢাকায় অনুষ্ঠিত আন্তঃজেলা বয়সভিত্তিক মহিলা সাঁতার প্রতিযোগিতায় সর্বোচ্চ ৮টি স্বর্ণ পদক পেয়ে দেশসেরা হয়েছে আমলার মেয়েরা।

সবুরা খাতুন, মমতাজ শিরিন ও লাভলী খাতুন। তিন জনের বাড়ি কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার আমলায়। দরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠা এই তিন কন্যা এখন দেশের সেরা তিন সাতারু।  কেবল এরাই নয় আমলার বাড়ি এমন অর্ধশত তরুণ-তরুণী দেশের সেরা সাতারুদের তালিকায় নাম লেখাতে সক্ষম হয়েছেন। কুষ্টিয়ার এই আমলায় সাঁতারের গোড়াপত্তন হয় প্রায় তিন যুগ আগে। ১৯৮১ সালে প্রথম সুইমিং ক্লাব গড়ে উঠে এখানে। বর্তমানে আমলায় একাধিক সুইমিং ক্লাব রয়েছে। এর মধ্যে আমলা সুইমিং ক্লাব, সাগরখালী সুইমিং ক্লাব, গড়াই সুইমিং ক্লাব, পপুলার সুইমিং ক্লাব ও সেন্টমার্টিন সুইমিং ক্লাব নামে ৫টি সংগঠনের ব্যানারে সাঁতার শিখছে বিভিন্ন বয়সের সাঁতারু। আমলার একাধিক সাঁতার সংগঠন জানান, সবুরা, মমতাজ ও লাভলীই নয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সাঁতারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা রুবেল রানা ও লাবনী আক্তার জুঁইসহ আরও অনেক খ্যাতিমান সাঁতারুর জন্ম এ মাটিতে। এ কারণে আমলা সাঁতারুদের সূতিকাগার হিসেবে দেশব্যাপী পরিচিতি লাভ করেছে।

১৯৯০ সালের পর থেকে এখানকার সাঁতারুরা বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি এবং বিজেএমসির পক্ষে জাতীয় পর্যায়ে সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে অভাবনীয সাফল্য লাভ করে দেশের সাঁতার বোদ্ধাদের নজর কাড়তে সক্ষম হন। কয়েক বছর আগে  ঢাকায় অনুষ্ঠিত কেয়া কসমেটিকস জাতীয় বয়সভিত্তিক সাঁতার প্রতিযোগিতায় আমলার সাঁতারুদের উপর নির্ভর করেই বিজেএমসি ও বাংলাদেশ আনসার-ভিডিপি সাঁতারদল পদক তালিকায় প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এখানকার সাঁতারুদের অবদান কম নয়। সাফ গেমসে আমলার সাঁতারু রুবেল রানা স্বর্ণ পদক পান। ২০০১ সালে ইরানে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ইসলামিক মহিলা সাঁতারে সবুরা স্বর্ণ পদক এবং মমতাজ শিরিন রৌপ্য পদক জিতে নেন। বয়সভিত্তিক সাঁতার প্রতিযোগিতায় আমলার খুদে সাতারুরা অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়ে জিতে নেন অর্ধ শতাধিক স্বর্ণ পদক।

অগ্রজদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে স্থানীয় সাঁতার ক্লাবগুলোর অধীনে শতাধিক শিশু-কিশোর এখানে সাঁতার অনুশীলন করে প্রায় সারা বছর ধরে।

তবে সাঁতারে যেমন সাফল্য আছে তেমনি আছে নানা সমস্যা ও  সীমাবদ্ধতা। বড় সমস্যা আর্থিক ও সুইমিং পুলের অভাব। আমলা সুইমিং পুলের সাধারণ সম্পাদক মাসুম-আল-মাজি বলেন, যে সব বাচ্চা ছেলে মেয়েরা সাঁতার শিখতে আসে তারা সবাই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। আমার ক্লাবে সারা বছরই ৪০ থেকে ৫০ জন শিক্ষার্থী থাকে। যারা বিভিন্ন জেলার হয়ে সাঁতারে অংশ নেয়। আর্থিক সমস্যার কারণে ক্যাম্প চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া সুইমিং পুল না থাকায় সবাই পুকুরে সাঁতার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। মাজি আরও বলেন, আমলার সাতারুরা সারা দেশের বিভিন্ন ক্লাব ও বাহিনীতে সুনামের সঙ্গে খেলছে। দেশ ও দেশের বাইরে থেকে আমলার ছেলে-মেয়েরাই পদক ছিনিয়ে আনছে। কোনো প্রতিযোগিতায় যদি ১০০ পদক থাকে তার ৮০ ভাগ পদক আমলার সাঁতারুদের দখলে থাকে।

সাতারুদের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, সুইমিং পুল সাঁতার শেখার জন্য বড় বাধা। সুইমিং পুল না থাকায় আমলা সরকারি ডিগ্রি কলেজের কয়েকটি পুকুরই তাদের বড় ভরসা। বর্ষার সময় সাঁতার শেখা সমস্যা না হলে শীতকালে পানি শুকিয়ে যাওয়ায় সাঁতার প্রশিক্ষণে সমস্যা দেখা দেয়।

সাঁতার কোচ মর্জিনা খাতুন জানান, সাঁতারে যাদের এতো অবদান তাদের প্রশিক্ষণ নিতে হয় একটি ছোট্ট পুকুরে। দীর্ঘ দিন থেকে এখানে একটি সুইমিংপুল স্থাপনের দাবি জানিয়ে আসলেও সম্প্রতি কুষ্টিয়া শহরে একটি আধুনিক মানের করেছে সরকার। তবে আমলার ক্লাবগুলোর আর্থিক সঙ্গতি না থাকায় ২২ কিলোমিটার দূরে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিতে পারছে না।

স্থানীয় সংগঠকরা জানান, আমলার বেশিভাগ সাতারু আনসারের হয়ে লড়ে থাকেন। তাই আমলায় একটি সুইমিং পুল গড়ে তোলার আগ্রহ দেখান আনসার ও ভিডিপি মহাপরিচালক। সুইমিং পুল নির্মাণের জন্য কয়েক বছর আগে আমলায় হাই স্কুলের নিকট থেকে দুই বিঘা জমি নামমাত্র মূল্যে কেনা হয়। জমি কেনা হলেও সুইমিং পুল বাস্তবায়নে আর কোনো অগ্রগতি হয়নি।


আপনার মন্তব্য