শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২১ অক্টোবর, ২০১৯ ২৩:১৯

সেফটি ফাস্র্ট

মোটরসাইকেলে নিরাপত্তা ঝুঁকি

শামীম আহমেদ

মোটরসাইকেলে নিরাপত্তা ঝুঁকি
জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস আজ। দেশে দুর্ঘটনায় মৃত্যুঝুঁকি সবচেয়ে বেশি মোটরসাইকেলে। নিরাপত্তা নীতিমালা ও গতিসীমা মেনে, সঠিক হেলমেট পরে এবং দুই পাশে পা ছড়িয়ে বসলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায় ছবি : জয়ীতা রায়

বাবার মোটরসাইকেলে চড়ে দুর্গাপূজা দেখতে যাচ্ছিল ছয় বছরের শিশু আরাধনা রায়। কিন্তু বাবাকে শক্ত করে ধরে বসার মতো শক্তি হয়তো ছিল না ছোট্ট হাত দুটিতে। ব্রেক কষতেই মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে পড়ে আরাধনা। আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষ রক্ষা হয়নি। সবাইকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে যায় শিশুটি। গত ৭ অক্টোবর দিনাজপুরের বিরলে এ দুর্ঘটনাটি ঘটে।

ঘটনা-২ : পটুয়াখালীর গলাচিপার চরআগস্তি এলাকা থেকে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলে চড়ে গন্তব্যে যাচ্ছিলেন গৃহবধূ রাবেয়া বেগম। গ্রামে হেলমেট নিয়ে পুলিশের কড়াকড়ি না থাকায় রাবেয়ার মাথায়ও ছিল না হেলমেট। কাজীরহাট এলাকায় বাইকটির চাকা ভাঙা সড়কের গর্তে পড়তেই একপাশে দুই পা দিয়ে বসা রাবেয়া ছিটকে পড়েন। মারা যান হাসপাতালে। দুর্ঘটনাটি ঘটে গত ১৬ সেপ্টেম্বর।

ঘটনা-৩ : প্রেমিকের মোটরসাইকেলে ঘুরতে বেরিয়েছিলেন নবম শ্রেণির ছাত্রী আশা আক্তার। পেছনে প্রেমিকাকে পেয়ে নিজের দক্ষতা জানান দেওয়ার ইচ্ছা জাগে প্রেমিক ডালিমের। বাইকের গতি কখনো ২০ কিমি, কখনো ১০০ ছাড়াতে থাকে। অন্য কোনো বাইক পাশ কাটালেই গতি বাড়াচ্ছিলেন ডালিম। গতির এই হ্রাস-বৃদ্ধিতে ভারসাম্য হারিয়ে সড়কে ছিটকে পড়েন আশা। হাসপাতালে নিলে মৃত্যু হয় তার। গত ১৯ আগস্ট ময়মনসিংহের পাগলা এলাকায় এ দুর্ঘটনাটি ঘটে। পুলিশ আটক করে ডালিমকে।

ঘটনা-৪ : গত ৫ এপ্রিল রাজধানীর খিলগাঁও ফ্লাইওভারের রেলিংয়ে ধাক্কা খায় বেপরোয়া গতির একটি মোটরসাইকেল। আরোহী দুই কিশোর নোমান (১৬) এবং তুহিন (১৭)-কে হাসপাতালে নিলে তাদের মৃত্যু হয়। জানা যায়, দুজনেরই মৃত্যু হয় মস্তিষ্কে আঘাত ও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে।

যানজট এড়িয়ে সহজে গন্তব্যে পৌঁছানোর বাহন হিসেবে দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে মোটরসাইকেল। অনেকের আয়ের পথও খুলে দিয়েছে দ্বিচক্রযানটি। মানুষের জীবনে এনেছে স্বাচ্ছন্দ্য। ফলে গ্রাম থেকে নগর- সর্বত্র বাড়ছে মোটরসাইকেল। মানুষের চাহিদার কারণে পাল্লা দিয়ে দাম কমানোর পাশাপাশি নানা অফার দিচ্ছে মোটরসাইকেল কোম্পানিগুলো। মোটরসাইকেল ক্রয়ে কিছু ব্যাংক ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ সুবিধা দিচ্ছে। ফলে বাড়ছে মোটরসাইকেল। ২০১৭ সালে পুরো দেশে যেখানে নতুন মোটরসাইকেল নিবন্ধন হয়েছে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৫০০টি, সেখানে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই নিবন্ধন হয়েছে দুই লাখ ৪৯ হাজার ৯৫০টি, যা বছর শেষে পাঁচ লাখ ছাড়াবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু মোটরসাইকেল মানুষের জীবনে যেমন স্বাচ্ছন্দ্য এনেছে; তেমনি বাড়িয়েছে দুর্ঘটনা ও হতাহতের ঘটনা।

বাইকারদের অন্যতম সংগঠন বাইকবিডিডটকমের প্রধান নির্বাহী শুভ্র সেন বলেন, বাইক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর শঙ্কা অন্য দুর্ঘটনার চেয়ে বেশি। তবে নিয়ম মেনে চালালে দুর্ঘটনা ও হতাহতের ঘটনা দুটোই কমানো সম্ভব। অনেকেই নিজের দক্ষতা বিবেচনা না করে বেশি গতিতে বাইক চালাতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পড়েন। ৬০ কিলোমিটার গতিতে চলার সময় একটা ছোট পাথরও বিপজ্জনক হতে পারে। তাই বাইকের গতি বাড়ানো উচিত সড়কের অবস্থা ও নিজের দক্ষতা বিবেচনা করে। তিনি বলেন, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় অধিকাংশ মৃত্যুই হয় মাথায় আঘাতের কারণে। এজন্য সঠিক মাপের ভালো হেলমেট পরা বাধ্যতামূলক। খুব টাইট বা ঢিলেঢালা হেলমেট পরা যাবে না।

কিন্তু অনেকেই দায়সারাগোছের হেলমেট পরেন শুধু মামলা এড়াতে। বাইকে একপাশে দুই পা দিয়ে বসায়ও অনেক দুর্ঘটনা ঘটে। এতে চালক যেমন ভারসাম্য হারায়, আরোহীও ছিটকে পড়তে পারেন। এছাড়া ড্রাইভিংয়ের সময় কোনো চিন্তা করা, মোবাইলে কথা বলা বা হেডফোন ব্যবহার করা উচিত নয়। এটা মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। ভেজা রাস্তায়ও বাইক চালানো উচিত নয়। একান্ত প্রয়োজন হলে ধীরে চালাতে হবে এবং বাইক থামানোর জন্য সামনে পর্যাপ্ত জায়গা রাখতে হবে। তবে বাইকে শিশু বহন ব্যক্তিগতভাবে আমি সঠিক মনে করি না।

রাজধানীর বাইক চালকদের অভিযোগ, মূল সড়কে বাসগুলো যত্রতত্র যাত্রী তুলতে হুটহাট লেন পরিবর্তন ও স্টপেজে দুই বাসের প্রতিযোগিতার কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে। পাশাপাশি প্রতিটি গলিতে অসংখ্য ঢাকনাবিহীন ম্যানহোল ও খাড়া স্পিড ব্রেকারের কারণে হরহামেশাই বাইক দুর্ঘটনা ঘটছে। প্রতিটি গলিতেই স্থানীয় প্রভাবশালীরা যার যার বাড়ির সামনে স্পিড ব্রেকার তৈরি করেছে। এগুলোতে কোনো রং দেওয়া নেই। এগুলোর কারণেও অনেক বাইক দুর্ঘটনা ঘটছে। দেশে মোটরসাইকেল বিস্তৃতির বড় কারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি ও দ্রুত গন্তব্যে যাওয়ার তাড়না। এজন্য এর ব্যবহারে চালকদের সচেতন হতে হবে। রাজধানীর যানবাহনঘন সড়কে একটি রিকশার জায়গায় দুটি বাইক চারজন যাত্রী বহন করে চলতে পারে। একটি প্রাইভেটকারের জায়গা নিয়ে অন্তত চারটি মোটরসাইকেল আটজন যাত্রী বহন করতে পারে। শুধু নিরাপত্তা নীতিমালা মেনে চললে মোটরসাইকেলই হতে পারে রাজধানীর যাতায়াতের অন্যতম নির্ভরযোগ্য মাধ্যম।  


আপনার মন্তব্য